(বইঃকুরান অবিকৃ্ত থাকার রহস্য,মুলঃ হযরত আল্লামা হাদী মারেফাত)
অত্যন্ত নিম্নমানের শব্দাবলীর সমন্বয়ে গঠিত বানোয়াট ও কল্পিত 'সুরা বেলায়েত' অন্যতম একটি বিষয়,যা “দাবিস্তানুল মাযাহেব” গ্রন্থের রচয়িতা একটি অজ্ঞাত শিয়া গোষ্ঠির (যারা তাদের ভিত্তিহিন ধারনা মতে কুরানের তাহরীফে বিশ্বাসী) নামে প্রচার করেছে।সে তার গ্রন্থে লিখেছেঃএকশ্রেনির শিয়ারা বলে থাকে যে,খলিফা উসমানের মুসহাফসমুহ অগ্নিদগ্ব করে এবং যে সুরাসমুহ আহলে বাইতের(আঃ) ফজিলতে নাজিল হয়েছে বিশেষতঃ নিম্নের সুরাটি বাদ দিয়ে দেয়ঃ
“ হে ঈমানদারগন !দু’টি নুরের প্রতি তোমরা ঈমান আনয়ন কর।সে দু’টিকে নাযিল করেছি,যাতে তারা আমার আয়াত(নিদরশন) তোমাদের সম্মুখে পাঠ করে এবং তোমাদের কঠিন দিনের আযাব হতে বিরত রাখে।…….যারা আল্লাহ ও রাসুলকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে আয়াতে তাদের জন্য রয়েছে বেহেস্ত।আর নিরবাচন করেছেন ফেরেশ্তা ও নারীদের মধ্য হতে এবং তাকে সৃষ্টির মধ্য হতে মুমিনগনের অন্তরভুক্ত করেছেন।আল্লাহর যা ইচ্ছা তা সম্পাদন করেন।তারাই ক্ষতিগ্রস্ত যারা আমার আয়াত ও হুকুম ভঙ্গ করেছে।আলী মুত্তাকীনদের মধ্যে……..হে রাসুল !আমরা তোমার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীরন করেছি।যে কেউ তাকে ঈমানদার অবস্থায় গ্রহন করবে এবং তার বেলায়েত(নেতৃ্ত্ব) মেনে নেবে,তোমার পরে প্রকাশিত হবে।…….তোমাকে তোমার প্রতি হুকুম করেছি।যেমনভাবে তোমার পুরবে নবীদের মধ্যে ছিল।আর তোমার জন্য তাদেরকে স্থলাভিষিক্ত নিরধারন করেছি,যাতে তারা প্রত্যাবরতন করে।নিশ্চয়ই আলী রাতে কুনুত পাথ করে,সিজদাবনত হয়,পরকালের ভয় করে এবং প্রতিপালকের প্রদত্ত সওয়াবের প্রতি আশা পোষন করে।বল ! তারা কি সমান যারা আমার আযাব সম্পরকে জ্ঞান থাকা সত্বেও জুলুম করেছে ”( দাবেস্তানে মাযাহেব,১ম খন্ড,পৃঃ২৪৬ ও ২৪৭) ।
মুহাদ্দেস নুরী উল্লেখ করেছেনঃপ্রসিদ্ব শিয়া গ্রন্থাবলীতে এ সুরাটির নাম-নিশানা খুজে পাইনি।কেবল মাত্র ইবনে শাহরে আশুবের “মাসালেব” গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা সুরা বেলায়েতকে বাদ দিয়েছে।কাজেই হয়তো এমন একটি সুরা ছিল ( ফাসলুল খিতাব,পৃঃ১৭৯ ও ১৮০)।
বিশিষ্ট গবেষক উস্তাদ আশ্তিয়ানী(শেইখ মুরতাজা আন্সারীর ‘রাসায়েল’গ্রন্থে টীকা সংযোজঙ্কারী) এ বানোয়াট সুরা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃইবনে শাহরে আশুবের মাসালেব গ্রন্থ ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থেই এ কল্পিত সুরাটির সন্ধান পাইনি।সবারই জানা আছে যে,এহেন বাক্যাবলীর সাথে পবিত্র কুরানের (যা চিরন্তন মো’জেযা হিসাবে সরবশ্রেষ্ট ও সরবশেষ রাসুলের(সাঃ) উপর অবতীরন হয়েছে ) বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্য নেই।কেননা এটা খুব স্বাভাবিক যে,যে কেউ এ ধরনের অসংলগ্ন,পরস্পর সম্পরকবিহীন ও অরথহীন শব্দাবলীতে সাজাতে পারে।তাছাড়া উক্ত বাক্যাবলীতে পুরনাঙ্গ কোন অরথ প্রকাশ পায় না।
আল্লাহ পবিত্র কুরানের মরযাদা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ “বল !যদি মানব ও জ্বীন জাতি সকলে মিলেও যদি এই কুরানের মত কোন জিনিস আনবার চেষ্টা করে,তবে তা আনতে পারবে না-তারা পরস্পরের যতই সাহায্যকারী হোক না কেন”(সুরা বনি ইস্রাইলঃ৮৮)।
পরযালোচনা
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো মাসালেব গ্রন্থটি,যেটিতে এ বানোয়াট বাহ্যাবলী উদ্বৃত হয়েছে,সেটি আজ পরযন্ত কেউ দেখেনি।এমনকি যারা বিভিন্ন লেখকের জীবন বৃত্তান্ত পরযালোচনা করেছেন,তারাও এই গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেননি।কেবলমাত্র ইবনে শাহরে আশুব যখন স্বীয় গ্রন্থ মায়ালেমুল উলামাতে নিজ জীবনের ইতিকথা নিয়ে আলোচনা করেছেন,তখন তার রচিত গ্রন্থসমুহের মধ্যে এ গ্রন্থের নামও উল্লেখ করেছেন।
আয যারিয়াহ গ্রন্থের লেখক শিয়া আলেমদের প্রনীত গ্রন্থসমুহের উপর ব্যাপক অনুসন্দ্বান চালিয়েও কোন গ্রন্থাগারে এ নাম ও নিশানার কোন গ্রন্থের সন্ধান পাননি।হয়তো এ নামে কোন গ্রন্থ ছিল,যা এ নামে চালানো হয়েছে।
অনুরুপভাবে কেউ উপরোক্ত বানোয়াট বাক্যাবলী দেখে নি।বরং সবাই বরনিত হয়েছে বা অজ্ঞাত পরিচয়ে বর্ণনা করেছেন।যেমনভাবে মুহাদ্দিস নুরী ও উস্তাদ আশ্তিয়ানীর বক্তব্যে লক্ষ্য করেছি।
খোদ এই বানোয়াটি সুরাটির বাক্যগূলো অরথহীন ও অশোভন,যেগুলোর আদৌ কোন ভিত্তি নেই।এমনকি এ বাক্যগুলোর সাধারন আরবি ভাষার ব্যাকরনগত নিয়মের সাথেও কোন সামঞ্জস্যতা নেই,সেখানে কুরানের ন্যায় মহিমান্বিত সাহিত্য ভান্ডারের কথা তো অনেক দুরে।মোটকথা,এ প্রলাপপুরন বাক্যগুলোর সাথে শিয়া মাযহাবের কোন দলেরই বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই।কেননা তারা শত মতভেদ থাকা সত্বেও সব সময়ই ভাষা ও সাহিত্য কাফেলার অগ্রগামী এবং আরবি ব্যাকরনের উপর তাদের ছিল পুরন দখল।
নিঃসন্দেহে এমন অরথহীন ও কুৎসিত শব্দাবলীর সমন্বয় ও বিন্যাসের ফলে গঠিত বানোয়াট সুরাটি কোন অপরিপক্ক মস্তিস্ক পেওসুত ও জাহেলীয়াতের বিদ্বেষপুরন মানসিকতার ফসল,যে কারনে এভাবে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতে পেরেছে।
আল্লাহ কুরানে বলেনঃ “মিথ্যা কেবল তারাই রচনা করে,যারা আল্লাহর আয়াতের (নিদরশনের) উপর বিশ্বাস্পোষন করে না”।(সুরা নাহলঃ১০৫)
হ্যাঁ, এগুলো একদিকে অজ্ঞতা ও নিরবুদ্বিতার সংমিশ্রন আর অপর দিকে অন্তরের কলষতা ও নোংরামির প্রতিফলন,যা দাবিস্তানুল মাযাহেব গ্রন্থের লেখকদের ন্যায় অপদারথ ব্যাক্তিদের মারাত্নক ভুলের কারনে সম্পন্ন হয়।
কে এই লেখক?
স্যার জন ম্যাল্কম ‘তারীখে আদাবিইয়্যাতে ইরান’(ইরানের সাহিত্য ইতিহাস-উস্তাদ রেযা যাদেহ’র গবেষনা,খন্ড ১,পৃঃ ৫৭) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেনঃসে হচ্ছে মুহসিন কাশ্মিরি “ফানী” উপাধিতে পরিচিত।আর ইযাহুল মাকনুন ফীদ দালিল আলা কাশফিয যুনুন (উস্তাদ রেযা যাদেহ’র গবেষনা,খন্ড ৩,পৃঃ ৪৪২) গ্রন্থে বলা হয়েছেঃসে হচ্ছে মুবিদ শাহ হিন্দি ( মুবিদ জারথুস্ত্রী তথা অগ্নি উপাসকদের ধরমীয় নেতাকে বলা হয়)।
আবার মোল্লা ফিরোজ দাসাতীর গ্রন্থের পাদটিকায়(পৃঃ২২১) উক্ত লেখকের নাম মীর জুলফিকার আলী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকগন তাদের গবেষনার ভিত্তিতে সরবশেষ যে সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন,তা হচ্ছে উক্ত লেখকের নাম ছিল মুবিদ কেই খসরু ইস্ফান্দিয়ার এবং তার পিতার নাম আযার কীয়ান [ সে ছিল ভারতের ‘কিয়ানুয়্যাহ’ মতবাদের প্রবরতক এবং বাদশাহ আকবার শাহ তৈ্মুরির শাসনকালে (৯৬৩-১০১৪ হিজরী) জীবন যাপন করত।] সে ভারতের পাটনা অঞ্চলে একাদশ হিজরীর ৩য় দশকে জম্নগ্রহন করে এবং ৭ম দশকের পর পরযন্ত জীবিত ছিল,তার গ্রন্থে উল্লেখিত তারিখ থেকে এটা বুঝা যায়।
লেখক সবাইকে কেইয়ানী ধরমের (অদ্বৈতবাদে বিশ্বসী) প্রতি দাওয়াত করতো এবং অন্যান্য ধরম ত্যাগ করে “ দাসাতীর” মতবাদ অনুসরনের আহবান জানাত।তার ধারনা মতে এ কিতাবটি হচ্ছে সমস্ত কিতাবের মাতৃ্তুল্য এবং ধরমের সারাংশ,যা সাসান নামক নবী (ভন্ড নবী) এনেছেন।
এভাবে দাবিস্তানুল মাযাহেব গ্রন্থে বিভিন্ন ধরমের আকিদা-বিশ্বাসের উপর আঘাত হানা হয়েছে এবং লেখক অত্যন্ত সূক্ষ্য ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বীয় পিতার সদ্য প্রতিষ্টিত মতবাদকে সমাজে প্রচারের চেষ্টা চালিয়েছে।
এ গ্রন্থটি সরবপ্রথম যে ব্যাক্তি উপস্থাপন করেন তার নাম হচ্ছে ফ্রান্সিস গ্লাডুইন।সে ১৭৮৭ সালে এ গ্রন্থটি ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করে এবং ১৮০৯ সালে ১২৪৪ হিজরীতে তৎকালীন বৃটেনের প্রতিনিধি মিঃ উইলিয়াম বিলি’র নিরদেশে ভারতের কলিকাতায় সরবপ্রথম মুদ্রিত হয়।পরবরতীতে প্রলাশিত এ বইটি বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী দালালদের দ্বারা ভারত ও ইরানে বিতরন এবং বিশ্বের অন্যান্য ভাষাতে অনুবাদ ও প্রচার অব্যাহত রয়েছে।( তাহলে নিশ্চিতভাবে বুঝা যায় যে চরম মুসলিম বিদ্বেষী বৃটিশ সরকার এই গরহিত অপকরমটি করে মুসল্মানদের মধ্যে ছড়িয়ে শিয়া বিরোধীতায় নেমেছে।আর সহজ সরল গোবেচারা সুন্নি মুসল্মানরাও এই বানোয়াট মিথ্যাটিকে মনের সুখে ছড়িয়ে যাচ্ছে –সম্পাদক )।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


