বিষয়ঃ হ্যারী পর্টারের আগ্রাসনে ডালিম কুমার আজ বিস্মৃত।
ধন্যবাদ মাননীয় মডারেটর আমাকে আমার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ প্রদানের জন্য। উপস্থিত সম্মানিত বিচারকমন্ডলী, শিক্ষকবৃন্দ, সহপাঠীবৃন্দ এবং ভাই-বোন সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সালাম জানিয়ে আমার বক্তব্য শুরু করছি। আজ আমরা যে বিষয়টি নিয়ে এই বিতর্কের মঞ্চে উপস্থিত তা হলঃ হ্যারী পটারের আগ্রাসনে ডালিম কুমার আজ বিস্মৃত। বিষয়টির পক্ষে কথা বলছি।
আমার পূর্ববর্তী বক্তাগণ এই বিষয়টির পক্ষে যথেষ্ট তথ্য এবং যুক্তি দিয়ে তা একাধিক বার প্রমাণ করে গিয়েছেন, তাতে আপনাদের মনের অবস্থা দেখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের “মৌন” কবিতাটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে,
যাহা-কিছু বলি আজি সব বৃথা হয়
মন বলে মাথা নাড়ি- এ নয় এ নয়।
বিজ্ঞ প্রতিপক্ষ বন্ধুরা, হ্যারী পর্টারের আগ্রাসনে ডালিম কুমার যে আজ সত্যিই বিস্মৃত একথা আপনারাও খুব ভালো করেই জানেন, কিন্তু আজ এই মঞ্চে আপনারা তা চাইলেও সঙ্গত কারণে স্বীকার করতে পারছেন না সেকথা ভেবে আমার বড় কষ্ট হচ্ছে।
ক্ষমতা, আধিপত্য এবং কর্তৃত্ব বজায় রাখার অপর নাম বিশ্বায়ন। যে বিশ্বায়ন বা উন্নত পুঁজির হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। নব্বইয়ের দশকে ‘আকাশ সংস্কৃতি’ নামে নতুন যে সংস্কৃতির সাথে আমাদের পরিচিতি ঘটে, তা প্রকৃতপক্ষে ছিলো পণ্যায়ন তথা সাংস্কৃতিক পণ্যায়নের এক বিস্ফোরণ; যা ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিয়েছে আমাদের সংস্কৃতিকে। টেলিভিশন,মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদি এইসব কিছু দুনিয়াকে এনে দিয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়। মুহুর্তেই আমরা ঘুরে আসতে পারি দুনিয়ার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। অথচ সারা দুনিয়ায় বিচরণ করতে গিয়ে আমরা নিজেদের শেকড়কে ছেড়ে চলে এসেছি। গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ উপেক্ষা করে আমরা যেখানে মোবাইল ফোন,ট্যাবলেট,ল্যাপ্টপ নিয়ে ফেইসবুক,টুইটার,ইন্সটাগ্রামে ব্যাস্ত সেখানে হ্যারী পর্টারদের বিচরণই বেশী ডালিম কুমারের নয়!
আজকাল কার শিশুরা ডালিম কুমার কে চেনে না কিন্তু হ্যারী পর্টারকে এক নামে চেনে। তারা ডালিম কুমার এর গল্প শুনে নয়, ডোরেমন কার্টুন দেখে ঘুমাতে যায়। তারা ল্যাপ্টপে হ্যারী পর্টারের গেমস খেলে। ডালিম কুমারের কোন গেমস আছে বলে আমার জানা নেই, আমার বিজ্ঞ প্রতিপক্ষ বন্ধুরা, আপনাদের যদি যানা থাকে তবে অবশ্যই আমাদের জানাবেন।
আপনারা হয়তো জানেন জে কে রাউলিং এর লেখা হ্যারী পর্টার সিরিজের বইগুলো ৪০কোটি কপি বিশ্ব জুড়ে বিক্রি হয়েছে। এত সংখ্যক বই বিক্রি আমাদের বাংলা সাহিত্যের সকল শিশুতোষ গল্পের বই মিলে হয়েছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। আমি কোন ভাবেই বাংলা সাহিত্যকে ছোট করে দেখছি না, পশ্চিমা সংস্কৃতি কীভাবে আমাদের গ্রাস করছে তার চিত্র তুলে ধরছি। ভুলে যাবেন না, পশ্চিমাদের এই আগ্রাসনে আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ও নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিস্মৃত হয়েছিলেন। যদিও পরবর্তী কালে তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন।
শিশুরা কার্টুন দেখতে ভালবাসে সেকথা সবারই জানা। হ্যারী পর্টার চরিত্রটি নিয়ে কার্টুন নির্মিত হলেও ডালিম কুমার নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন কার্টুন নির্মিত হয় নি। বইয়ের পাতার রূপকথার গল্পকে আজ ঢেকে দিয়েছে কার্টুনের পর্দা। কার্টুনের বিচিত্র ও আশ্চর্য জগত তাদের কল্পনার জগতে বিমূর্ত থেকে মূর্ত হয়ে যায়। তাদের মনে গভীর ছাপ ফেলে যার কারণে ডালিম কুমার তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে আজও আসতে পারে নি। এমন পরিস্থিতিতে হ্যারী পর্টার যখন তাদের কল্পনার জগতের কেন্দ্রে তখন ডালিম কুমারকে বিস্মৃত হওয়াই স্বাভাবিক নয় কি? আশা করি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাবেন আমার প্রতিপক্ষ দলের বন্ধু।
আজকের এই বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির যুগে যেখানে হ্যারী পর্টারের মত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নিয়ে সিনেমা কিংবা কার্টুন তৈরী হয়ে চলেছে সেখানে আমাদের ডালিম কুমার কেবল বইয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ। হ্যারী পর্টার সিরিজের ৭-৮টি চলচিত্র রয়েছে। এছাড়া আমাদের বাংলা চলচিত্রে শিশুদের নিয়ে তৈরী চলচিত্রের সংখ্যা খুব বেশি নয়। বিখ্যাত চলচিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়
বাংলাদেশি তরুণ নাফিস বিন জাফর বিদেশের হয়ে আনিমেটেড সিনেমা তৈরী করে যেখানে অস্কার জিতে যাচ্ছে সেখানে তাকে আমরা কোন সিনেমাই আজ পর্যন্ত বানাতে পারি নি। আর সব থেকে বড় কথা আমরা জাতির বিরাট একটা অংশ এখন অনক্ষর, আর তাই আমরা অনেকটাই বই বিমুখ, সাহিত্যের কদর আমরা তাই করতে জানি না। পশ্চিমা দেশ গুলোতে যেখানে একটা বই কেউ লেখলে বা মত প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধ মতের লোক আরেকটা বই লেখে, কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ ভিন্ন মত প্রকাশ করে চাপাতি হাতে নিয়ে, যার প্রমাণ সম্প্রতি উগ্রাবাদীদের হাতে নিহত মুক্তমনা লেখক অভিজিত রায়। আমাদের শিশুতোষ গল্পের লেখক কতজন বলতে পারেন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




