তার মাথার মধ্যে কিছু নাই। মনের মধ্যেও না। ধ্যানের মধ্যেও না। সে একটা না। না। আগে পরে আর কিছু নাই। সে একটা বাক্স। বোকা। ফাঁকা। পড়ে আছে চৌকির তলায়। বহুদিন। তার ভেতরে এসে বেঁধেছে বাসা কয়েকটা তেলাপোকা। সে একটা পিতলের ঘটি। সেই ঘটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছাই দিয়ে সকালে ঘাটে মাজে সোনাবউ। ঘটিতে জল ভরে বউ নিয়ে যায় ঘরে। গৃহে। শান্তির নীড়ে।
তারপর একদিন কী জানি কী হয়। জানে না কেউ। সেই গৃহে ঢুকে সাপ। সেই গৃহে মরে যায় লখিন্দর। ঘটিটা রেখে, গৃহটা রেখে শান্তিটা চলে যায়। লখিন্দরও যায়। ভেলায়। অজানায়। সোনাবউও যায়, লখিন্দরের ভেলায়। ভেলা ভাসে। ভাসে। ভাসে।
ভাসতে ভাসতে দরিয়া মাঝে দেখা দেয় এক জাহাজ। বিরাটকায়। যেনো চান সওদাগর ফিরছেন বাণিজ্য হতে। যেনোবা রাজার কুমার ফিরছে দূর রাজ্য হতে শিকার শেষে। দরিয়া মাঝে ভাসে আঠারো পালের জাহাজ। দরিয়া মাঝে ভেলা। ভেলায় নাম না জানা লখিন্দর। ভেলায় নাম না জানা বউ। অঙ্গ মলিন হওয়া সোনাবউ।
সোনাবউয়ের মলিন মুখে সারা রাজ্যের মায়া। মায়ার টানে জাহাজ থামে। পালের আড়াল থেকে বের হয় বিরাট শরীর। সেই শরীর সওদাগরের নয় । সেই শরীরে নাই কোনো রাজার কুমার। সেই শরীর নিয়ে সামনে আসে ডাকাত সর্দার। সোনাবউয়ের মায়ায় পড়ে ডাকাত। জাহাজের ধার ঘেষে দাঁড়ায় ডাকু। শীষ্যরা নিচে নামে। ভেলা আটকায়। ভেলা ভাসায়। ভেলায় একলা ভাসে শায়িত লখিন্দর। বেহুলাকে তুলে আনে ডাকাতের দল। বেহুলা কাঁদে। আছারি-পিছারি কাঁদে দরিয়ার উপর।
দরিয়ার হৃদয় নাই কোনো। দরিয়া বোঝে না দুঃখিনীর ভাষা। দরিয়া বোঝে না মলিন অঙ্গ। দরিয়া বধির। দরিয়া কাঁপে। সেই কাঁপায় যেই নিনাদ হয় ‘সে’ সেই নিনাদ; ‘সে’ সেই বোকা বাক্স। বাক্সের ভেতর নিনাদ। নিনাদের ভেতর বাক্স। একেরে জড়ায়ে অন্য বাঁচে। একেরে জড়ায়ে অন্য মরে। পরস্পরেরে জড়ায়ে তারা পায় নিজের সন্ধান। এর আগে পরে আর কিছু নাই।
সে একটা না। না। চৌকির তলায় একটা খালি বাক্স; না। বাক্সের ভেতর কয়টা তেলাপোকার সংসার; না। সোনাবউয়ের হাতে ঝলমল করতে থাকা পিতলের একটা ঘটি; না। দুঃখীনির কান্না না বোঝা একটা দরিয়া; একটা না। না। এর আগে পরে আর কিছু নাই।
ডাকাতের জাহাজে বেহুশ বেহুলা। সে ভাসে। তার ঘুমের ভেতরে ভাসে লখিন্দর। তার ঘুমের ভেতরে সোনাবউ বানায় জাদু। দেহ তার পরে থাকে খাটে। জাহাজে। আর তার ভেতরের জাদুর পাখি ডাকাতের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যায়। দূরে। ভেলায়। সাপে কাটা লখিন্দরকে নিয়ে সে যায় সন্ধানে। পাতালের।
যায় সর্পরাজের দেশে। সে নাচে। মলিন অঙ্গে তার পেলব মুদ্রা ওঠে। পায়ের পাতা তার অবশ হয়ে আসে। অবশ হয়ে আসে। সোনাবউয়ের নৃত্যের ঘূর্ণনে ঘূর্ননে সর্পরাজের বুকের ভেতর তুমুল ঘূর্ণি ওঠে। তুমুল মায়া জাগে। জেগে উঠে চোখ মেলে লখিন্দর। কিন্তু সোনাবউ নাই। ঘুমের ভেতর সে বানায় জাদু। ঘুমের ভেতর লখিন্দরেরে সে করে জীবন দান। ঘুমের ভেতর সে করে প্রাণপাত। তবু তাকে ঘিরে থাকে ডাকু সর্দার। তবু তার মলিন মুখের মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে ডাকু। মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বুকের ভেতর অবশ-অবশ বোধ করে ডাকাত সর্দার।
কিন্তু মায়ামুখ নাই। নিয়েছে বিদায়। ডাকাত তাকে দরিয়ায় করে সমর্পন। দরিয়া তাকে করে বরণ। দরিয়ায় ভেসে লখিন্দর ফিরে গৃহে। দরিয়ায় সোনাবউ ডুবে যায়। সোনার মূর্তির মতন। পিতলের ঘটির মতন। ফাঁকা; ফাঁপা; বোকা বাক্সের মতন। ডুবে যায় জলের তলে। দরিয়ার নিনাদের মতন জেগে উঠে আবার হারায়। নাই হয়ে যায় সোনাবউ। তার আগে পরে আর কিছু নাই।
‘সে’ একটা সোনাবউ। ‘সে’ একটা না। না। তার আগে পরে আর কিছু নাই।
১৭.০১.১৭
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১৭ সকাল ৯:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



