

বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনটি দেখে একদম-ই চমকাই নাই। প্রথমে মনে হয়েছিল কোন গুড়া মসলার বিজ্ঞাপন, যেখানে নারীকে কেবল গৃহিনী, অর্ধাঙ্গীনী আর রাঁধুনি বানানোর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের উপর চপেটাঘাত করে সম অধিকার আর সম দায়িত্ব বন্টনের ঘোষনা করা হয়েছে। কিন্তু যখন নিচের দিকে, ডান পাশে চোখ পড়ল তখন তাজ্জ্বব না হয়ে বরং রীতিমত দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ঠিক কোন আঙ্গিকে দেখা উচিত বিজ্ঞাপনটিকে, ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছিলাম না।
একটা পাবলিক প্লেসে এমন বৃহৎ পরিসরে কনডমের বিজ্ঞাপন শুরুতেই জনমনে দৃষ্টিকটু ঠেকে যায় যেখানে ফেমিকন, নরডেট-২৮ কিংবা আইইউডি-র মত বিজ্ঞাপনগুলোর অবস্থান কোন ভাবেই অস্বভাবিক হিসেবে আবির্ভূত হয় না। স্বাভাবিক হতে হতে এগুলো এমন একটা পর্যায়ে পৌছে গিয়েছে যে এগুলো এখন কোন ভাবেই যৌনতাকে আর নির্দেশ করছে না বরং জন্মনিয়ন্ত্রন টার্মটাকে খুব সহজ কথায়, সহজ করে তুলে ধরছে যেখানে পাবলিক পরিসরে একটা কনডমের বিজ্ঞাপন জন-মনকে সরাসরি যৌনতায় নিয়ে চলে যায়। রেডিও, টেলিভিশনে যত সহজে জন্মবিরতিকরন পিল কিংবা নারীদের জন্য অন্য জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতিকে উপস্থাপন করা যায় তত সহজে পুরুষের জন্য কনডম কে উপস্থাপন করা যায় না। কেউ করবার দুঃসাহস ও দেখায় না। এটা হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক, হয়ে ওঠে লজ্জ্বার।
জন্ম নিয়ন্ত্রনের মোট সাতটি পদ্ধতির মধ্যে পুরুষের জন্য বরাদ্দ দুটি আর বাকী পাঁচটি নারীর জন্য। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ২০১৩-র ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি গ্রহণকারী পুরুষের হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কনডম ব্যবহারকারীর হার ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বাদ বাকী সকল জন্ম নিয়ন্ত্রনের দায়ভার যেন শুধু নারীর উপরই যেখানে সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং সংস্কৃতিগত ভাবে নারী স্বাস্থ্য রক্ষার চেয়ে পুরুষের পৌরুষত্ব রক্ষা করাটাই মুখ্য।
যাই হোক, কথা বলছিলাম বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনটি নিয়ে। বিজ্ঞাপন বিষয়টাকে আমরা একভাবে ফরাসি তাত্ত্বিক রোলাঁ বার্থ (Roland Barthes) এর মত করে রেপ্রিজেন্টেশন হিসেবে দেখতে পারি। যেখানে তিনি রেপ্রিজেন্টেশন বলতে, ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে সকল কিছুকেই অর্থপূর্ন ভাবে উপস্থাপন করার উপর জোর দিয়েছেন। আর এই ভাষা হতে পারে নাটক, সিনেমা, গল্প, কবিতা, পেইন্টিং, বিজ্ঞাপন অথবা অন্য কিছু। রেপ্রিজেন্টেশনের ধারণা সেই ভাষাকে এবং এর অর্থকে সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে। অর্থবহনকারী শব্দ, ধ্বনি ও ইমেজকে আমরা চিহ্ন (সাইন) নামক সাধারণ পরিভাষায় বর্ণনা করে থাকি। আমরা আমাদের মাথায় যেসব-ধারণা ও সেগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ধারণাগত সম্পর্ক নিয়ে ঘুরি-ফিরি, চিহ্ন সেগুলোকে রেপ্রিজেন্ট করে অথবা প্রতিনিধিত্ব করে এবং এগুলো একত্রে আমাদের সংস্কৃতির অর্থ-পদ্ধতি তৈরি করে। একটি বিজ্ঞাপনের চিত্র বা পোস্টারের তাই ওপরের নির্দেশিত অর্থ থাকে, আমরা যদি তার সঙ্গে লেপ্টে থাকা সাংস্কৃতিক সঙ্কেতলিপি বা কোডগুলোক আলাদা করতে পারি তবে সেই চিত্রের গূঢ়ার্থও বের করা সম্ভব।
আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল, উপরোক্ত বিজ্ঞাপন হতে রেপ্রিজেন্টেশনের রাজনীতি এবং এর গূঢ়ার্থ খুঁজে বের করা। বিজ্ঞাপনটির ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন নারী একজন পুরুষকে একটি মেডেল পড়িয়ে দিচ্ছেন। আপাতঃ দৃষ্টিতে ছবিটি শুধুমাত্র পুরো গল্পের একটা লাইন অথবা স্ট্যাটমেন্ট মাত্র যেটি বাকী ভাষাগুলো ছাড়া অসমাপ্ত। পরবর্তীতে যখন চোখ পড়ে ‘সংসার সুখের হয়, আসল পুরুষের গুনে’ লেখ্য অংশটুকুর উপর চোখ পড়ে তখন বিষয়টি তথা গল্পটি আবছা পরিস্কার হতে শুরু করে। কৌতুহলী দর্শক, মনে একটা বিশ্লেষন দাড় করিয়ে ফেলেন যে ছবির এই পুরুষ নিশ্চয়ই এমন কোন কর্ম সাধন করে ফেলিয়াছেন যার জন্য সংসার সুখের হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনের গল্পটির সমাপ্তি এখানেই ঘটে না। লেখ্য অংশ সমাপ্ত করার পর কৌতুহলী মন যখন নিচের দিকে ডানে চোখ দেন এবং এক প্যাকেট প্যান্থার কনডমের চিত্র তার চোখে ফুটে উঠে তখন তার মনে ভিড় করা নানান গল্পের বিনাশ হয়ে বিজ্ঞাপনের মূল গল্পটা তার মনে থিতু হয়ে যায়। গল্পটির অর্থ তখন এমন দাঁড়ায় যে, যৌন জীবনে সমর্থ্য একজন পুরুষই পারে তার সংসারকে সুখী করতে অথবা অন্য কিছু। বিজ্ঞাপনের গল্পটির সাথে রয়েছে আরো দু-একটা ছোট খাটো ম্যাসেজ। যেমন, প্যান্থার নামক কনডমটি এখন নতুন প্যাকে পাওয়া যাচ্ছে। এটি সোস্যাল মার্কেটিং কোম্পানি নামক একটি কোম্পানি দ্বারা প্রস্তুতকৃত। গল্পের চরিত্র রুপায়নে বেশ সতর্কতা এবং কৌশলের অবতারনা করা হয়েছে। নারী চরিত্রে যিনি রয়েছেন তাকে চরম যৌন আবেদনময়ী এবং পুরুষ চরিত্রে যিনি রয়েছে তাকে গর্বিত স্বত্ত্বা হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়াস চালানো হয়েছে।
এখন যদি আমরা, বিজ্ঞাপনের সাংস্কৃতিক অর্থের দিকে মনোনিবেশ করি তবে দেখা যাবে যে এটি কোনভাবেই আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না। যত সহজে না আমরা নারীদের জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতির বিজ্ঞাপনগুলোকে গ্রহন করে নেই তত সহজে আমরা এই কনডমের বিজ্ঞাপনটিকে নিতে পারি না। আমি পূর্বেই বলেছি যে, এই সমস্যা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং তার পুনঃ পুনঃ চর্চার ফসল। আমাদের সংস্কৃতি কনডম নিয়ে নাড়াচাড়া করবার অনুমতি কিংবা প্রয়াস আমাদের কোনভাবেই দেয় নাই আর দেয় ও না।
এবার আসি বিজ্ঞাপনের কিছু দূর্বল দিকের দিকে। বিজ্ঞাপনের যেভাবে এর চরিত্র এবং ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে তা একভাবে যৌনতাকে উস্কে দেয়। এখানে আবারো আরেকবার পৌ-রুষত্বের জয়গান গাওয়া হয়েছে পক্ষান্তরে ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে’ টার্মটির বিপরীতে। যেখানে সংসার নামক প্রতিষ্ঠানটি সুখের হবার কথা ছিল নারী-পুরুষ উভয়ের যৌথ উদ্দ্যোগের ফসল। বিজ্ঞাপনে খুব স্বল্প পরিসরে কনডমের প্রচার থাকলেও সুপুরুষ মাত্র প্যান্থার কনডম ব্যবহার করে কিনা সে সংক্রান্ত কোন ম্যাসেজ নেই যা এর রিপ্রেজেন্টেশনের আরেকটা দূর্বল দিক।
একই সাথে বিজ্ঞাপনের গল্পটায় একটা লুকায়িত বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে, স্বামী যদি তার যৌনতা দিয়ে তার স্ত্রীকে চরম ভাবে সন্তুষ্ট না করতে পারে তবে সেই সংসার সুখের হয় না। এই বিষয় নিয়ে আমি নিজের কোন মন্তব্য হাজির করতে চাইব না। এখানে এসে আমি সত্য বিষয়টাকে আপেক্ষিক হিসেবেই জেনে নিলাম। সত্য বলে আসলে কিছু নেই। সব আংশিক সত্য। একজনের কাছে যা সত্য হিসেবে আবির্ভূত হয়, অন্যের কাছে তা নাও হতে পারে।
বিঃদ্রঃ লেখায় উপস্থাপনকৃত বিশ্লেষন গুলো শুধুমাত্র লেখকের অভিমত মাত্র যেখানে একটা বিজ্ঞাপন এবং তার উপস্থাপনকে সমাজ-সংস্কৃতির আলোকে বোঝার প্রয়াস করা হয়েছে মাত্র। কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করবার উদ্দেশ্যে যার অবতারনা হয় নাই। তথাপি কেহ নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন মনে করলে লেখক কোনভাবেই দায়ী থাকিবেন না।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



