somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অসীমের দোরগোড়ায় বিজ্ঞান ও চেতনা: একটি মহাজাগতিক অনুধাবন

২১ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মানবসভ্যতা আজ প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছেছে। আমরা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের রহস্যভেদ করছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে নতুন জগৎ তৈরি করছি, মহাকাশে শক্তিশালী টেলিস্কোপ পাঠিয়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি দেখাবো বলে দাবি করছি। কিন্তু মানুষের এই সমস্ত আবিষ্কারের পেছনে লুকিয়ে আছে এক চরম অহংকার। মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে যে সে প্রকৃতির সব রহস্যের চাবিকাঠি পেয়ে গেছে, ঠিক তখনই বিজ্ঞানের নিজস্ব কিছু দেওয়াল আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কতটা ক্ষুদ্র।

বিজ্ঞানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আমরা আজ পর্যন্ত আধুনিকতম দূরবীন দিয়ে যা কিছু দেখতে বা বুঝতে পেরেছি, তা পুরো মহাবিশ্বের মাত্র ৫% (দৃশ্যমান জগৎ)। বাকি ৯৫% অংশ ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি নামক এক অদৃশ্য চাদরে ঢাকা, যার প্রকৃত রূপ আজ ২০২৬ সালেও বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার ৮০ শতাংশের বেশি সমুদ্রের তলদেশ আজও অনাবিষ্কৃত।

তাই মানুষের এই সমস্ত গর্ব আসলে এক অনাবিষ্কৃত, অনন্ত জ্ঞানের মহাসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক ফোঁটা জলবিন্দু নিয়ে উল্লাস করার মতো। গাণিতিক এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় মানুষের সমস্ত জ্ঞান আসলে সেই না-জানা সত্যের বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগও নয়। বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই সত্যটি উপলব্ধি করে বলেছিলেন তিনি সত্যের এক বিশাল মহাসমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে কেবল কয়েকটি মসৃণ নুড়িপাথর আর সুন্দর ঝিনুক কুড়িয়েছেন মাত্র, পুরো মহাসমুদ্র তাঁর সামনে অপলক এবং অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে।

আমরা বিজ্ঞানের অতি-আধুনিক তত্ত্ব যেমন সুপারস্ট্রিং থিওরি (Superstring Theory) কিংবা এম-থিওরি (M-Theory) নিয়ে কথা বলি সেই অনুযায়ী আমাদের এই চেনা মহাবিশ্ব ৪টি মাত্রার (৩টি স্থান বা Space + ১টি সময় বা Time) মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমীকরণ মেলাতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এখানে অন্তত ১১টি বা ১২টি মাত্রা (Dimensions) থাকা প্রয়োজন। এই বাড়তি মাত্রাগুলোতে সময়েরও দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থাকতে পারে, থাকতে পারে কোটি কোটি সমান্তরাল মহাবিশ্ব (Multiverse)। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মাত্রাগুলো যদি আমাদের চারপাশেই থাকে, তবে আমরা তা দেখতে পাই না কেন? কেন আমাদের আধুনিক প্রযুক্তিও একে সরাসরি ধরতে পারে না?
এখানেই উঠে আসে দর্শনের সেই অমোঘ এবং চিরন্তন উপমা "যার চোখ নেই সে যেমন সাত রঙ বুঝবে না, আর যার জিহ্বা নেই সে যেমন খাবারের স্বাদ বুঝবে না।" রঙ এবং স্বাদের অস্তিত্ব প্রকৃতিতে সবসময়ই থাকে। কিন্তু তা অনুভব করার জন্য যথাক্রমে চোখে 'ফটোরিসেপ্টর' এবং জিহ্বায় 'টেস্ট বাড' নামক মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। মাধ্যম বা রিসিভার না থাকলে বাইরে যতই আলো বা উপাদান থাকুক না কেন, তা ওই শরীরের জন্য সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন।

ঠিক একইভাবে, মানুষের মস্তিষ্ক এবং তার পঞ্চেন্দ্রিয় তৈরি হয়েছে কেবল ৪টি ডাইমেনশনের জগৎকে প্রসেস করার জন্য। এর বাইরের যে অনন্ত মাত্রা বা সত্যগুলো রয়েছে, তা দেখার বা অনুভব করার মতো কোনো ইন্দ্রিয় বা রিসিভার আমাদের এই জৈবিক শরীরে দেওয়া হয়নি। ফলে, অন্ধ মানুষের কাছে যেমন রঙের কোনো অস্তিত্ব নেই, আমাদের এই সীমিত ইন্দ্রিয়ের কাছেও মহাবিশ্বের বাকি রহস্যময় রূপগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য।

মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টির আদি উৎস খুঁজতে গেছে, তখন সে তৈরি করেছে "বিগ ব্যাং তত্ত্ব" (Big Bang Theory)। এই তত্ত্ব বলে, ১৩৮০ কোটি বছর আগে এক পরম শূন্যতা থেকে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে স্থান, কাল এবং এই মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে। কিন্তু এই তত্ত্বের ভেতরেই রয়ে গেছে এক বিশাল বৈজ্ঞানিক ও লজিক্যাল অসঙ্গতি। বিজ্ঞানের নিজস্ব সূত্রই বলে "শূন্য থেকে কোনো কিছু তৈরি হতে পারে না" (Nothing comes from nothing)। অথচ বিগ ব্যাং আমাদের বিশ্বাস করতে বলে যে, কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো স্থান বা সময় ছাড়াই, হঠাৎ করে সবকিছু সৃষ্টি হয়ে গেল!

বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বা আলবার্ট আইনস্টাইনের সমীকরণ অনুযায়ী, বিগ ব্যাং-এর ঠিক আগের মুহূর্তে সময় বলতে কিছু ছিল না, সবকিছু এক "সিঙ্গুলারিটি" বা অনন্ত ঘনত্বের বিন্দুতে স্থির ছিল। তাহলে প্রশ্ন জাগে বিজ্ঞানীরা যাকে "সময়হীন পরম শূন্যতা" বলছেন, সেখানে কী এমন ছিল যা এই বিশাল সৃষ্টির জন্ম দিল?

এখানেই বিজ্ঞানের সব জোড়াতালি (যেমন ইনফ্লেশন বা ডার্ক এনার্জির কাল্পনিক হিসাব) ব্যর্থ হয় এবং দর্শনের সবচেয়ে সহজ, সুন্দর ও অকাট্য সত্যটি আলো হয়ে জ্বলে ওঠে "তিনি আপন ইচ্ছায় এই অনন্ত মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।"

বিজ্ঞান শুধু বলতে পারে কোনো ঘটনা 'কীভাবে' ঘটছে (How), কিন্তু সে কখনো উত্তর দিতে পারে না ঘটনাটি 'কেন' ঘটছে (Why)। সৃষ্টির এই বিশাল ক্যানভাসের পেছনে কোনো অন্ধ নিয়তি বা দুর্ঘটনা কাজ করতে পারে না। একটি বোমা ফাটলে যেমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, ঘর গুছিয়ে যায় না; তেমনি একটি অন্ধ মহাবিস্ফোরণ থেকে গ্যালাক্সিগুলোর এমন নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল আবর্তন, সৌরজগতের ভারসাম্য কিংবা আমাদের ডিএনএ-র (DNA) মতো জটিল সফটওয়্যার কোড নিজে নিজে তৈরি হতে পারে না।
মহাবিশ্বের প্রতিটি মৌলিক বলের মান এত নিখুঁতভাবে টিউন করা (Fine-Tuned), যা প্রমাণ করে যে এই সৃষ্টির পেছনে একজন পরম সচেতন ইচ্ছাকারী বা ডিজাইনারের "আপন ইচ্ছা" এবং নিখুঁত পরিকল্পনা কাজ করেছে।


যদি আমরা আমাদের চারপাশের সৃষ্টিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করি, তবে আমাদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক তর্ক আর সংশয় এক নিমেষে উধাও হয়ে যাবে। একটি সাধারণ শামুকের খোলসের জ্যামিতিক নকশা থেকে শুরু করে বিশাল আকাশগঙ্গার ঘূর্ণন সবকিছু একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাত বা "গোল্ডেন রেশিও" (Golden Ratio) মেনে চলে। আমাদের প্রতিটি কোষের ভেতরের ডিএনএ কোডটি প্রমাণ করে যে এর পেছনে একজন পরম প্রোগ্রামার আছেন। আমাদের পৃথিবী সূর্য থেকে ঠিক যতটুকু দূরত্বে থাকলে প্রাণ টিকে থাকবে, ঠিক ততটুকু দূরত্বেই অবস্থান করছে।

এই সমস্ত নিদর্শন স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় হ্যাঁ, কেউ একজন অবশ্যই এর পেছনে আছেন।

তিনি কে? তিনি কোনো ল্যাবরেটরির পরীক্ষার বিষয় নন, তিনি হলেন সেই পরম চেতনা এবং সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা, যিনি এই স্থান ও সময়ের ঊর্ধ্বে। তিনি এক পরম কুশলী শিল্পী যিনি কেবল গ্রহ-নক্ষত্রের যান্ত্রিক নিয়ম বানান নাই, বরং আমাদের মনে ভালোবাসা, দয়া এবং সৌন্দর্যের মতো অনুভূতির জন্ম দিয়েছেন। বিগ ব্যাং-এর আগে যখন কোনো সময় বা মহাবিশ্ব ছিল না, তখনও তিনি ছিলেন; আবার কোটি কোটি বছর পর যখন এই দৃশ্যমান জগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে, তখনও তিনি থাকবেন।

আমাদের এই দীর্ঘ আলোচনার শেষ কথাটি হলো মানুষের পরম বিনম্রতার স্বীকারোক্তি। মানুষ ভাবে সে তার নিজের যোগ্যতায় প্রকৃতিকে জয় করছে, নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করছে। কিন্তু আসল সত্য হলো মানুষ আসলে অন্ধকার ঘরে হাতড়ে বেড়ানো এক অন্ধ সত্তার মতো। সেই পরম চালিকাশক্তি তাঁর আপন মহিমায় মানুষের সামনে যতটুকু এবং যখন উন্মোচন (Disclose) করেন, পৃথিবীর মানুষ ঠিক ততটুকুই জানতে পারে। তার বেশি জানা মানুষের পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয়। তিনি যখন যেভাবে প্রকৃতির পর্দার অন্তরাল থেকে আলো ফেলেন, মানুষ কেবল ততটুকুই দেখতে পায় এবং সেটাকেই নিজের 'আবিষ্কার' বলে অহংকার করে। অসীমের সামনে নিজের ক্ষুদ্রতাকে চিনে নেওয়ার এই বোধটুকুই মানুষের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান।

১৫ই মে, ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌতালী রায়ের অজ্ঞতা না ধৃষ্টতা ?"

লিখেছেন আরািফন, ২০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

একজন আইনজীবী হয়েও সে যেভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে আলাদা প্রদেশ গঠনের হুঁশিয়ারি দেখিয়েছেন,তা দেশের প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নামে দেশের মানচিত্র খণ্ডিত করার হুমকি কোন নাগরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালো লাগে

লিখেছেন আরমান আরজু, ২০ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৮

এরা কারা, কী এদের পরিচয়?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে জুন, ২০২৬ রাত ১:৪৮


যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঠিক তাই ঘটছে। ‘আজাদ পার্টি’ নামের একটি নতুন ভূঁইফোড় রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে গতকাল ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে যে মিছিল এবং ঘেরাও কর্মসূচি করা হলো, তা কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ বিশ্ব বাবা দিবস।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২১ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৩৬

বাবা: নীরব ত্যাগের এক অনন্ত মহাকাব্য।
========================
আজ বিশ্ব বাবা দিবস। আমাদের দেশে মা দিবস যতটা জাঁকজমক ও আবেগের সঙ্গে পালিত হয়, বাবা দিবস ততটা আলোচনায় আসে না। অথচ একজন সন্তানের জীবনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫০১ নাম্বার রুম কি বিজয় নাকি লাম্পট্যর সাক্ষী।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২১ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:২৮





মাওলানা মামুনুল হক নামের হেফাজত ইসলামের এক নেতা তার ফেসবুক ওয়ালে দীর্ঘ একটি পোস্ট লিখেছেন। তার এই পোস্টটি এক অদ্ভুত রসাত্মক ট্র্যাজেডি।

লেখাটি পড়লে মনে হয়, তিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×