এগারো দিনের মধ্যেই মে-জুন দুই মাসের বেতন তুলে নিয়েছেন তোবা গ্রুপের পোশাক শ্রমিকরা। বোনাস এবং জুলাই মাসের বেতনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিরীহ পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে কোন রাজনীতি না করার অনুরোধ জানেিয়ছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রী এবং বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজিএমইএ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্রমিক সংগঠনের নামে জামায়াতের বিপুল অর্থায়নে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস এবং সরকার পতনের বড় রকমের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী এবং বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ । তোবা গ্রুপ গার্মেন্টস শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের নেতা মোশরেফা মিশু এবং জলি তালুকদারকে বৃহস্পতিবার দুপুরে আটক করে বাডডা থানায় নেয়া হয়। বিকেলেই তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
শুক্রবার এবং শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকার কারণে ১০ আগস্টের মধ্যে জুলাই মাসের বেতন এবং বোনাস দেয়ার জন্য তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেনকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সরকার এবং বিজিএমইএ। শ্রম প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রীকে ডেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্রুততম সময়ে তোবা গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন দেবার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। এ তথ্য জানিয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা ঈদের আগে থেকেই প্রাণপণ চেষ্টা করেছি তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের বেতন দিতে। দেশের রফতানি আয়ের ৮১.০১ শতাংশ আসছে পোশাক শিল্প খাত থেকে। তাই এই খাতকে সব রকমের সঙ্কট থেকে রক্ষা করতে সরকার বদ্ধপরিকরÑবললেন গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘ব্যক্তি মালিকানা কোন প্রতিষ্ঠানে বেতন না হলে শ্রম আইনের ১২৩ ধারা লঙ্ঘন হয়। এই আইনের ১০৭ ধারায় ফ্যাক্টরি মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। তবে আমাদের শ্রমিকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সিভিল ফর্মে মামলা হলে মালিক সুবিধা পেয়ে যাবে। যতদিন মামলা ঝুলবে, শ্রমিকদের বেতন না দিয়ে ততদিন ঝুলিয়ে রাখবে মালিক। তা না করে মালিককে বেতন দিতে বাধ্য করতে হবে।’
তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক ও বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বেলা দুইটার পর থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত সোনারগাঁও হোটেলে বৈঠক করে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
তিন মাসের বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে তোবা গ্রুপের পাঁচটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে শ্রমিকরা ঈদের আগের দিন থেকে লাগাতার অনশন কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। আন্দোলনের মুখে সরকারের চাপে বিজিএমইএ নেতারা বুধবার মে ও জুন মাসের বেতন ও ১০ আগস্ট জুলাই মাসের বেতনের ব্যবস্থা করতে সম্মত হয়। কিন্তু শ্রমিক নেতৃবৃন্দের একটি অংশ এ প্রস্তাবে রাজি হননি। তারা এক সঙ্গে তিন মাসের বেতনের দাবিতে অনড় থাকেন এবং তোবা কারখানায় বেতন গ্রহণ করতে চান। তাঁরা বিজিএমইএ ভবনে গিয়ে বেতন-ভাতা গ্রহণ করতে রাজি হননি।
১১ দিনের মাথায় প- হয়ে যায় এই আন্দোলনের ছক। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর মধ্য বাড্ডার লুৎফন কমপ্লেক্সের ৫টি গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের বের করে আনতে লাঠি হাতে হামলা করে একদল উত্তেজিত বহিরাগত শ্রমিক। এই হামলায় আহত হন কে এ ডিজাইন, লাইফ স্টাইল, বিগ বস, স্টেপ-টু, স্টেপ থ্রির অন্যতম পরিচালক শাহীন হোসেনসহ আরও কয়েকজন। হামলাকারীদের প্রতিরোধে ৫টি গার্মেন্টস থেকে নেমে আসে কয়েকজন। এই প্রতিবেদককে ঘটনাস্থলে উপস্থিত শাহীন হোসেন বলেন, ‘আমাদের গার্মেন্টসে কোন বেতন বকেয়া নেই, মাতৃত্বকালীন ভাতা, শ্রমিকদের সন্তানদের পড়ালেখার খরচও আমরা দেই। তারপরও বহিরাগত কিছু লোক এসে দাবি করল আমাদের ৫টি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ছুটি দিতে হবে। আমরা সময় চাইলাম। তারা সময় দিতেও রাজি হলো না। এখন তারা কেউ হামলা করতে এলে আমরা পাল্টা আক্রমণ করব বলে দাঁড়িয়েছি।’
এর কিছু দূরে অবস্থিত বাড্ডা হোসেন সুপার মার্কেটের সামনে জমায়েত হতে থাকে একই এলাকার টোপাজ গার্মেন্টসের ২০/২৫ জন শ্রমিক ।
রিক্সাচালক মালেক তোবা গার্মেন্টসের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকে তার স্ত্রী পারভীনকে। পারভীন তোবা গর্মেন্টসের দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল। এই প্রতিবেদককে মালেক বলেন, ৫ বছর এই গার্মেন্টসে আমার পরিবার কাজ করে। কোন দিন এমন হয় নাই। কালকা থেকেই এইহানে আছে। তারে লইয়া যাইতে চাই, কেউ তারে নামতে দেয় না।
দুপুর ১২টার দিকে তোবা গার্মেন্ট কারখানার কাছাকাছি টোপাজ গার্মেন্টস থেকে ২০/২৫ জন নারী শ্রমিক তোবার শ্রমিকদের আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তারা কেন রাস্তায় নেমে এসেছেন প্রশ্ন করা হলে ক্ষুব্ধ নারী শ্রমিকরা বলেন, ‘আমাদের মতোই শ্রমিকদের ৪/৫ মাস ধইরা বেতন বন্ধ, এমনকি ঈদেও তারা বেতন-বোনাস পায় নাই। আমরা তাগোর বেতনের দাবিতে রাস্তায় নাইমা আসছি।’ তারা যে গার্মেন্টসে আছে সেই গার্মেন্টসে কোন সমস্যা আছে কিনা জানতে চাইলে টোপাজ গার্মেন্টসের বেতন-বোনাস নিয়ে কোন সমস্যা নেই বলে জানায় তারা। তবে তারা শুনেছে তোবা গার্মেন্টসের শ্রমিকদের বেতন- বোনাস নিয়ে সরকার নীরব। তাই তারা সরকার এবং তোবার মালিক সরকারের দালাল পুলিশের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে।
এর পরই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এই সময়ে জল কামান থেকে রঙ্গীন পানি ছড়ানো শুরু করে পুলিশ। হোসেন সুপার মার্কেটের পেছনের গলিতে পালিয়ে যায় নারী শ্রমিকরা। সেখান থেকেই অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মহিলা পুলিশকে লক্ষ্য করে অশ্লীল গালাগাল করে ইট ছুড়তে থাকে নারী শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে পুলিশ ধাওয়া দেয়।
দুপুর ১টা ২০ মিনিটে ১০ /১৫ জন পুলিশের একটি দল কারখানার ভেতরে যায়। ধাওয়া দিয়ে নামিয়ে আনে শ্রমিকদের। সব মিলে ৫০ জনের মতো শ্রমিককে নামতে দেখা যায়। এদের অনেকে আতঙ্কে কাঁদতে থাকে। অনেকে বলেন, ভেতরে গ্যাস ছেড়েছে পুলিশ, যাতে তারা নেমে যেতে বাধ্য হয়। এরপর মোশরেফা মিশুসহ কয়েকজন নেমে আসেন। দেশের সব পোশাক কারখানায় বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকা হয়েছে।
তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু আজ দুপুরে এ ঘোষণা দেন। এরপরই তাঁকে ও শ্রমিক নেত্রী জলি তালুকদারকে আটক করে পুলিশ।
গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদারকে আটক করে বাড্ডা থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এর পর শ্রমিক সংগঠক মোশরেফা মিশুকে কয়েকজন মহিলা পুলিশ পাজাকোলা করে পুলিশের জীপে তুলে নেয়।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ফাঁকা গুলি এবং জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় বাড্ডার প্রগতি সরণী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মোশরেফা মিশু এবং জলি তালুকদার গ্রেফতার হবার পর কয়েকজন বিক্ষুব্ধ শ্রমিক হাতে লাঠি নিয়ে বাড্ডা এলাকায় কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে।
২০১২ সালের ২৪ নবেম্বর রাতে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তোবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১১১ জন পোশাক শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় করা মামলায় জামিন নিতে গেলে আদালত ৯ ফেব্রুয়ারি দেলোয়ার হোসেনকে কারাগারে পাঠান। গত ২৪ জুলাই তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন হাইকোর্ট। এরপর ৫ আগস্ট মুক্তি পান তিনি।
বিজিএমই ভবনে বেতন তুলতে এসেছন মিনা। তিনি তোবা গ্রুপের বুকশান গার্মেন্টসের পোশাককর্মী। বলেন, আমাগোর বেতন দরকার ঘরভাড়ার লাইগা, সংসার চালানোর লাইগা। আমরা শুনছি বেতন দেয়া হইবোনা। তাই এতদিন আন্দোলন করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



