হরতাল-অবরোধের রাজনীতিতে দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা আবার ভয়ানক ধ্বংসের মুখে পড়েছে। গত কয়েক দিনে হরতাল-অবরোধকারীদের আক্রমণে ১৩ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে পাঁচ শতাধিক, ১৬২টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, ভাঙা হয়েছে ৪৫০টি গাড়ি। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আকুতি জানিয়েছে, তারা বাঁচতে চায়। গত কয়েক দিনে শুধু পোশাক খাতের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। প্রতিদিন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার সমান। কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ দিশাহারা। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অনবরত হরতাল-অবরোধ ও তাদের পিকেটারদের আক্রমণে জ্বলছে বাড়ি-গাড়ি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। দগ্ধ হচ্ছে মানুষ, নিরীহ বাস ও ট্রেনযাত্রীদের ওপর যখন-তখন ছুড়ে মারা হচ্ছে পেট্রলবোমা। সব মহল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের ভেতর এখন নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বলা যায়, গত কয়েক দিনে মানুষ জামায়াত-বিএনপির ধ্বংসাত্মক রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? মানুষের জন্য রাজনীতি, না রাজনীতির জন্য মানুষ? মানুষের জন্য যদি রাজনীতি হয়, তাহলে সেই মানুষ মেরে, দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে আজ বিএনপি যদি ক্ষমতায় যেতে চায়, তা কি এই একবিংশ শতাব্দীতে সম্ভব হবে? বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে যখন বলে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য আন্দোলন করছি, তখন তা প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে। কারণ জামায়াতের যে রাজনীতি ও তাদের যে আদর্শ, তাতে গণতন্ত্র হলো হারাম ও কুফরি মতবাদ। আর যখন বলে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, জনগণের কল্যাণের জন্য আন্দোলন করছি, তখন সেটি আরো নির্মম পরিহাসের মতো শোনায়। কারণ মানুষ মেরে যে আন্দোলন হয়, তাকে কোনো বিচারেই মানুষের কল্যাণের আন্দোলন বলা চলে না। বিএনপি সাত দফা দাবি প্রদান করে যে আন্দোলন শুরু করেছে, সেই দাবিগুলোর একটির মধ্যেও কি জনকল্যাণের কোনো কথা আছে? সব দাবির মূল বিষয়বস্তু হলো কিভাবে নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করা যায়। মানুষের জীবন-জীবিকার পথ সুগম করে এমন কোনো কথা কি ওই সাত দফার মধ্যে আছে? গত প্রায় এক বছর দেশের মানুষ শান্তিতে ছিল; নিরাপদে চলাফেরা করে যে যার মতো জীবন-জীবিকার অন্বেষণ করতে পেরেছে। তারপর দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক যেসব খাত রয়েছে, তার প্রতিটি সূচক তো ঊর্ধ্বমুখী। তাহলে দেশের মানুষ জামায়াত-বিএনপির ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে যোগ দেবে কেন? আসলে দেশের মানুষের স্বার্থে নয়, দূরবর্তী কোনো সুতার টানে বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমেছে। এর মূল কারণ জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে রক্ষা করা। কারণ ২০১৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান সরকার যদি ক্ষমতায় থাকতে পারে, তাহলে জামায়াতের সব বড় নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়ে যাবে এবং জামায়াতের রাজনীতি বাংলাদেশে বিলুপ্ত হবে। তাই জামায়াতের মূল মুরব্বি পাকিস্তানের আইএসআই চাইছে যেকোনো মূল্যে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাতে। তার জন্য বলির পাঁঠা কে হবে সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। কিছুদিন আগে গোয়েন্দা সূত্রে খবর বেরিয়েছিল, জঙ্গিদের হত্যার তালিকায় নাম আছে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া- দুজনেরই। বিগত দিনে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের যত আক্রমণ হয়েছে, তাতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কোনো নেতা-কর্মীর গায়ে সামান্য আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। হঠাৎ করে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নাম জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের তালিকায় কেন? বিএনপির মধ্যে যাঁরা প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক আছেন, তাঁরা ভালো করে জানেন, এভাবে মানুষ মারা ও অর্থনীতি ধ্বংস করার আন্দোলন করে কোনো দিন কোনো সরকারের পতন ঘটানো যায়নি, আগামী দিনেও যাবে না। বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেই। বাংলাদেশেও এমন উদাহারণ নেই।
ধ্বংস ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে মানুষ মুক্তি চায়
১৯৯০ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন হয়েছিল। তার প্রধান কারণ সেই আন্দোলনে সাধারণ জনগণ ব্যাপকভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল নতুনভাবে আবির্ভূত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনা মানুষ দেখতে চেয়েছিল।
এরপর ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফলে বিএনপি সরকারের পতন হয়। এরও কারণ ছিল বিএনপির ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে মানুষ ভয়ানকভাবে আশাহত হয়েছে। সারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ অবরোধে বিএনপি সরকারের পুলিশ গুলি চালিয়ে ১৮ জন কৃষককে হত্যা করে। রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত শহীদজননী জাহানারা ইমামসহ দেশবরেণ্য সুধীজনের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে বিএনপি সরকার। এরপর মাগুরার উপনির্বাচনে ভয়ংকর নগ্ন ভোটচুরির ফলে মানুষের ধারণা হয়, বিএনপির কাছে মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার বলতে আর কিছু থাকবে না। ফলে ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে মানুষ আওয়ামী লীগের আন্দোলনে ব্যাপক হারে যোগ দেয় এবং বিএনপি সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ পাঁচ বছর পর ২০০১ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন সংবিধানের বিধান অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নতুন নির্বাচনের পথ সুগম করে দেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম যে একটি সরকার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। এরপর ২০০১ সালের অক্টোবরের ১ তারিখে অনুষ্ঠিত সালসা (সাঈদ, লতিফ, সাহাবুদ্দীন) নির্বাচনের কথা না-ই বললাম। ২০০১ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে জামায়াত-বিএনপির ক্যাডার বাহিনী সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং জামায়াত-বিএনপিবিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর মানবতার সব সীমা লঙ্ঘন করে যে নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে, এর সঙ্গে কেবল একাত্তরের পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের তুলনা চলে। যারা বাংলাদেশ মানে না, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা দেখায় না, যাদের সদর দপ্তর এখনো পাকিস্তানে, সেই জামায়াতের দুজন মশহুর যুদ্ধাপরাধীকে মন্ত্রী করে এবং তাঁদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়। বাংলাদেশের বুকে আরেকটি কলঙ্ক রচিত হয়। ২০০১-০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি রাষ্ট্রের সব অঙ্গন থেকে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের বিতাড়িত করে। দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতের সব সূচক ক্রমাগত নিচে নেমে যায়। সারা দেশে উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর ভয়ানক উত্থান ঘটায়। বোমা-গ্রেনেড মেরে বিচারক থেকে শুরু করে উদার প্রগতিশীল গণতন্ত্রমনা মানুষকে হত্যা করে। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ কালো তালিকাভুক্ত হয় এবং একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের কিনারায় পৌঁছে যায়। এত কিছুর পরও আন্দোলন-সংগ্রামে ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে জামায়াত-বিএনপি সরকারের পতন ঘটাতে পারেনি। আর বিএনপির মতো ক্ষমতাভোগী সুবিধাবাদী দল সরকার পতনের আন্দোলন করবে আর সেখানে সাধারণ মানুষ সেই ডাকে সাড়া দেবে, সেটা কোনো বিচার-বিশ্লেষণে মেলে না। কিন্তু বিএনপি এখন মরিয়া। এর কারণ ২০১৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে পাকিস্তান ভাবাদর্শের যে রাজনীতি ১৯৭৫ সালের পরে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশে জায়গা করে নিয়েছে, তার চিরবিদায় ঘটবে। জামায়াতের রাজনীতির সমাধি হবে। আর এটা যখন ঘটবে, তখন বিএনপির বর্তমান রাজনীতি এবং তাদের বর্তমান কর্ণধারদের কোনো স্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর থাকবে না। সে সময় বিএনপিকে টিকে থাকতে হলে নতুন নেতৃত্বকে দলের হাল ধরতে হবে এবং দলের নীতি-আদর্শকে পরিশুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও আদর্শের রাজনীতি করতে হবে। সেটি করতে না পারলে বিএনপির দশা হবে ওই পতিত মুসলিম লীগের মতো। আমার বিশ্বাস, বিএনপির নতুন প্রজন্ম সেটা চায়। কিন্তু বর্তমানে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের এমন অবস্থা হয়েছে যে দূরবর্তী সুতার জালে তারা যেভাবে জড়িয়ে পড়েছে, তাতে এখন তারা মহা উভয়সংকটে। বের হওয়ার চেষ্টা করলেও মরণ আবার বের হতে না পারলে জালের মধ্যে আটকা থাকা অবস্থায় যেভাবে দাপাদাপি করবে তাতে বাংলাদেশের মানুষের হবে মরণদশা, যা বর্তমানে শুরু হয়েছে। যারা এই জাল বাংলাদেশে পেতেছে তারা তো বাংলাদেশের ধ্বংস চায়, একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চায়। একাত্তরের পরাজিত শক্তির কাছে বাংলাদেশের মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই।
একাত্তরে তারা বলেছিল- মানুষ নয়, আমরা এ দেশের মাটি চাই। বাংলাদেশ আজ সব ক্ষেত্রে সব সূচকে পরাজিত শক্তি পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষকে আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা তৈরি করে। এই পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের ভয়াবহ ধ্বংস প্রত্যক্ষ করে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন চিৎকার করে বলেছিলেন, হায় খোদা (God), এ আমি কী করলাম! কিন্তু ততক্ষণে বোমার চাবিকাঠি চলে গেছে যুদ্ধবাজ রাজনীতিকদের হাতে। তারপর বিশ্ববাসী দেখল জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ। তখন আইনস্টাইন মানুষের কাছে বলেছেন, আমেরিকার যুদ্ধবাজ নেতারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে ভয়ংকর মারণাস্ত্রের সন্ধান পেয়েছে, সেখান থেকে তারা নিজেরা আর কখনো বের হতে পারবে না। একমাত্র আমেরিকার জনগণই পারে আমেরিকার যুদ্ধবাজ নেতাদের ওই ভয়ংকর মোহ থেকে বের করতে। বাংলাদেশের জামায়াত-বিএনপির বেলায় এই কথাটি আজ শতভাগ প্রযোজ্য। বিএনপি ক্ষমতার লোভে দূরবর্তী শক্তির যে ভয়ংকর জালে আটকা পড়েছে, সেখান থেকে বিএনপি নিজেরা আর বের হতে পারবে না। তাই বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষকে আজ সোচ্চার হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বিএনপিকে ওই জাল থেকে বের করতে হবে এবং বাংলাদেশকে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


