somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাহফুজ আনামের কাছে ২০ প্রশ্ন

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ৮:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের একটি কমেন্ট্রি ছাপা হয়েছে সোমবার (০৮.০২.১৬) তারই সম্পাদিত দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রথম পাতায়। আমি ভেবেছিলাম ১/১১ নিয়ে নতুন যে বিতর্কে জড়িয়েছেন, তা নিয়ে কোনও মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন তিনি। কিন্তু না, তিনি ২০০৭ সালের ১৭ জুলাই তার লেখা একটি পুরনো মন্তব্য প্রতিবেদন পুনর্মুদ্রণ করেছেন। এই পুনর্মুদ্রণের ব্যাখ্যা ডেইলি স্টারের মুদ্রিত সংস্করণে নেই। তবে, ব্যাখ্যা আছে অনলাইন ভার্সনে।
অনলাইন সংস্করণের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘গতকাল (০৭.০২.২০১৬) জাতীয় সংসদে সাতজন সম্মানিত সংসদ সদস্য রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আমার বিচার দাবি করেছেন। তাদের দাবি, আমি সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলাম। আমরা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি এবং বলছি—এই অভিযোগ সত্যনিষ্ঠ নয়।’
‘আমরা এই মন্তব্য প্রতিবেদনটি সংসদ সদস্যদের বিবেচনায় নেওয়ার জন্য আবারও প্রকাশ করলাম। সংসদ সদস্য এবং পাঠকরা বিবেচনা করে দেখুন, এই মন্তব্য প্রতিবেদনের লেখক কি তাঁর ( শেখ হাসিনা) গ্রেফতার চাইতে পারেন বা গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারেন?’ ব্যাখায় তিনি আবারও ১/১১-এর সময় নিশ্চিত না হয়ে কিছু প্রতিবেদন ছাপানো তার ভুল সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন। এই মন্তব্য প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৭ সালে শেখ হাসিনাকে আটকের পরদিন। শিরোনাম ছিল ‘This is no way to strengthen democracy.’
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের এই ভুল সিদ্ধান্তের কথা এর আগে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে একটি বেসরকারি টেলিভিশেনের টকশো অনুষ্ঠানে। আর টকশো’র সেই অংশটি আমি দেখেছি। প্রশ্নকর্তা যখন ১/১১-এর বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন মাহফুজ আনাম রেগে যান। প্রমাণ না দিয়ে টকশো থেকে যাওয়া যাবে না বলেও জোর গলায় বলেন। কিন্তু যখন প্রমাণ হাজির হয় তখনও তিনি সবাই করেছে বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অতঃপর ফেঁসে গিয়ে ভুল স্বীকার করেন।
মাহফুজ আনামের বক্তব্য এবং টকোশোতে ভুল স্বীকার নিয়ে আমার মতো একজন ছাপোষা সাংবাদিকের মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে।
১. মাহফুজ আনাম, আপনি আট বছর পর ভুল স্বীকার করলেন। এই ভুল স্বীকার করতে আপনার আট বছর কেন লাগল? আপনার যদি এটা উপলব্ধি হতো, তাহলে ভুল বোঝার পরপরই কেন তা স্বীকার করেননি?২. টকশোতে যদি আপনি তথ্যভিত্তিক প্রশ্নের মুখোমুখি না হতেন, তাহলে কি এই ভুলের কথা আপনি বলতেন? প্রশ্নের শুরুতে তো আপনি রেগে যাচ্ছিলেন। বলছিলেন, টেলিভিশনে ঢালাও অভিযোগ করে বাড়ি যেতে পারবেন না। প্রমাণ দিতে হবে। প্রমাণ দেওয়ার পরও আপনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ভুল স্বীকার করেছেন, কেন?
৩. এটা আপনার ভুল? নাকি জেনে-শুনে করেছেন? তার কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে? আপনার মতো সম্পাদক এত বড় ভুল করে তা নিয়ে এতদিন কিভাবে চুপচাপ ছিলেন?

৪.তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কারও বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করার জন্য আপনাকে কারা চাপ দিয়েছিলেন? আপনি বলেছেন, শেখ হাসিনা-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিএফআই দিয়েছিল। তারা কি চাপ দিয়েছিলেন ছাপার জন্য? নাকি নিজেই অতি উৎসাহে ছেপেছেন?

৫. আপনি নিজেই বলেছেন, নুরুল কবীর সম্পাদিত নিউএজ পত্রিকা ওই প্রতিবেদন ছাপেনি। তাহলে তার ওপর কি চাপ ছিল না?

৬. আপনি এজন্য নুরুল কবীরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। ধন্যবাদটি আপনি নিজে কেন নিতে পারেননি? নাকি ধন্যবাদের চেয়ে বড় কিছু পাওয়ার আশায় আপনি প্রতিবেদন ছেপেছিলেন?

৭. ভুল প্রতিবেদন প্রত্যাহার করার সুযোগ আছে। পৃথিবীতে এর অনেক উদাহরণ আছে। আট বছর পর আপনি ভুল স্বীকার করলেও এখনও প্রতিবেদন প্রত্যাহার করেননি। দেরি হলেও এখন কি প্রতিবেদনটি প্রত্যাহার করবেন?

৮. ভুল স্বীকার করলেই কি সব দায় শেষ হয়ে যায়? এই ভুল প্রতিবেদনে যারা বা যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তার জন্য আপনি কিভাবে ক্ষতিপূরণ দেবেন?

৯. আপনি কি নিশ্চিত যে, অনুকূল বা প্রতিকূল সময়ে আবার এ ধরনের ভুল করবেন না?

১০. সাংবাদিকতার নীতিমালা ভঙ্গকারী, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে হেয় করা বা ভুল তথ্য পরিবেশন করার দায় যে সম্পাদকের, তার কাছে ওই প্রতিষ্ঠানের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিরাপদ কিনা?

১১. আপনি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বারবার টকশোতে বলেছেন, ‘আরও অনেক পত্রিকা ওই প্রতিবেদন ছেপেছে।’ সবাই করলেই একটি অনৈতিক কাজ নৈতিক হয়ে যায়? সবাই ঘুষ খেলে ঘুষ হালাল হয়ে যাবে?

১২. আপনার প্রতিষ্ঠানকে অপসাংবাদিকতার হাত থেকে রক্ষায় আপনি কি উদ্যোগ নেবেন? আপনি কি দায় নিয়ে পদত্যাগ করার মতো সৎ, সাহসী ও উদার হতে পারবেন?

১৩. আমি যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের একজন সাংবাদিক হতাম। আর আপনি যা করেছেন, আমি যদি তাই করতাম, তাহলে কি আমাকে চাকরিতে রাখতেন?

১৪. রাজনীতিবিদদের আমরা দুর্নীতিবাজ বলতে অভ্যস্ত। নীতিহীন সাংবাদিকতা আর দুর্নীতির মধ্যে কোনও পার্থক্য আছে কি?

১৫. ভুল করার পরও নানা উপায়ে (পুরনো মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপে) পদ আকড়ে থাকা কি পদলোভীদের কাজ নয়?

১৬. আপনার পত্রিকায় কি এখন এজেন্সির খাওয়ানো প্রতিবেদন ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছেন?

১৭. ১/১১-এর সময় খালেদা জিয়াকে নিয়েও তো একই ধরনের অনির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন ছেপেছেন। তার জন্যও কি এখন দুঃখ প্রকাশ করবেন? নাকি বিএনপি ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন?

১৮. ১/১১-এর সময় এ রকম ‘খাওয়ানো’ প্রতিবেদন কতগুলো প্রকাশ করেছেন, তার কি একটি তালিকা প্রকাশ করবেন?

১৯. আপনি বলেছেন আরও অনেক গণমাধ্যম সেই খবর প্রকাশ করেছে। এটা তো ঢালাও কথা। আপনি এভাবে না বলে ওই গণমাধ্যমগুলোর একটি তালিকা কি প্রকাশকরবেন?

২০. গণমাধ্যম সম্পাদকের ইচ্ছায় নয়, সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুযায়ী চলে। আপনার প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের একজনও কি তখন এই ধরনের খবর প্রকাশে আপত্তি জানাননি?

মাহফুজ আনামকে নিয়ে এখন বিতর্ক তুঙ্গে। সংসদে তার বিচার এবং ডেইলি স্টার বন্ধের দাবি উঠেছে। আমি মনে করি, প্রতিষ্ঠান আর ব্যক্তি আলাদা। আর আলাদা বলেই ব্যক্তির দায় কোনওভাবেই প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে না। তবে প্রতিষ্ঠানকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন ব্যক্তি। যেমন সম্পাদকীয় নীতিমালা ভঙ্গের কারণে মরতে হয়েছে ব্রিটেনের ১৬৮ বছরের পুরনো পত্রিকা নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডকে।

১৮৪৩ সালের ১ অক্টোবর এই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। আর টেলিফোন হ্যাকিং-এর অভিযোগ মাথায় নিয়ে ২০১১ সালের ৭ জুলাই পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকাটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যসহ সেলিব্রেটিদের ফোনে আড়ি পেতে সংবাদ সংগ্রহের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। এই অভিযোগের তদন্তকালে পত্রিকাটির সম্পাদক রেবেকা ব্রুকস ও ম্যানেজিং এডিটর এন্ডি কুলসনকে গ্রেফতারও করা হয়। সম্পাদকের সম্মতিতেই টেলিফোন হ্যাকিং চলছিল। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ এমপি ও সিভিল রাইটস মুভমেন্ট কর্মীদের প্রবল চাপে মিডিয়া মোঘল রুপার্ট মর্ডাক-এর মালিকানাধীন পত্রিকা নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। বৃটিশ সাংবাদিকতার নীতিমালা ভঙ্গ করে পত্রিকাটি নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশ করেছিল। যা কোনওভাবেই সেখানে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

মাহফুজ আনাম আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে অনেক বিষয় খোলাসা হয়ে যাবে। জানা যাবে, এজেন্ডা কতদিক দিয়ে আসে। কেন আসে। আর কারা এজেন্ডা সেট করেন।

বিষয়টি পত্রিকা বন্ধ বা কোনও সম্পাদককে আইনের আওতায় নেওয়ার নয়। বিষয়টি সাংবাদিকতার নীতিমালার—মাহফুজ আনামের দায় স্বীকারের মধ্য দিয়ে যা প্রকাশিত হলো। আমাদের সংবাদমাধ্যমকে এখন এই জায়গা থেকে শুরু করতে হবে। সাংবাদিক, সম্পাদক বা সংবাদ মাধ্যমকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সঠিক নীতিমালা অনুসরণের । কোনও চাপের কাছে নতজানু হলে চলবে না। আর রাষ্ট্র ও সরকারকে নিশ্চয়তা দিতে হবে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার। কোনও তথাকথিত উপদেশ, চাপ বা ফরমায়েশ যেন আর সাংবাদিকতাকে কলুষিত না করে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ৮:১৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০১৮ সালের পর ঢাকাতেই ৪টা এক্সপ্রেসওয়ে

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৫৩



একটা দেশের উন্নয়ন কতটা এগিয়েছে, সেটা বোঝার অনেকগুলো উপায় আছে। তবে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই দেশের রাস্তা, সেতু আর যোগাযোগব্যবস্থা। কারণ এগুলোর পরিবর্তন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪



শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দায় কার?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭


সংক্ষিপ্ত রায় সবচেয়ে বড় দায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির। এর মধ্যে ২০০৯–২০২৪ সময়কালের সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবন.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭


১।মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে জুম্মার নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১২.৫০ এ আজান তারপর ১.১৫ দিকে জুম্মার নামাজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আজানের কিছুক্ষণ পর খুতবা শুরু তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×