somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সহপাপী (গল্প)

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ব্যবসাটা ভালো যাচ্ছে না বেশ কদিন হল। আদালত পাড়ার পাশে ছোটখাটো এই খাবারের দোকানটায় কটা দিন আগেও কাস্টমর সামলাতে রীতিমত হিমশিম খেতাম। বাবার আমলের ব্যবসা। বাবাও এখানে চুটিয়ে ব্যবসা করতেন। আমিও করেছি বেশ কিছুদিন। এখন সেদিন নেই, ভাগ্য মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আশেপাশে আরও অনেক গুলো নতুন নতুন খাবারের দোকান হয়েছে। ওসব দোকানের চাকচিক্য আর অবস্থানগত কারণে আমারটা আড়ালে পড়ে গেছে। ব্যবসার বেহাল দশায় দুটো কর্মচারীকেও বিদায় দিয়েছি। এখন ক্যাশ থেকে শুরু করে মেঝে পরিষ্কার সব নিজেই করি। সারাদিনে গুটিকয়েক মানুষ এদিকটায় আসে। তাদের বেশিরভাগ পুরাতন কাস্টমর এবং আদালত পাড়ার কিছু পরিচিত উকিল। বাকির খাতাটাও তাই বেশি ভারি হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। দোকানটা বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করছি বেশ কিছুদিন ধরে। কিন্তু কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে দোকানটির প্রতি। ছাড়তে গিয়েও ছাড়তে পারছি না।

সেদিন খুব গরম পড়েছিল। মাত্র দোকানের শাটারটা খোলতেই পায়ের কাছে একটি ছায়ার আবির্ভাব। পিছন ফিরে দেখলাম এক বোরখা পরা মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। মহিলার মুখ হিজাবে ঢাকা, চোখ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললেন, হাফ লিটার একটা মিনারেল ওয়াটার দিন তো। দামটা মিটিয়ে মহিলা চলে গেলে সেদিনকার মত, আমি কাজে মন দিলাম। সামান্য কিছুদিন বাদেই সেই বোরখা পরা মহিলা আবার দোকানে আসলেন। কুশল জিজ্ঞেস করে বললেন একটু বাতাস খেয়ে নিলে আপনার আপত্তি নেই তো? আমি অনাপত্তি জানালাম।
“এদিকটায় লোকজনের খুব একটা ঝামেলা নেই। তাই বললাম এখানে বসে একটু জিরিয়ে নেই।” বললেন মহিলা। নিতান্ত আলাপ জমানোর জন্য বললাম, এখানে প্রতিদিন আসেন?
মহিলা মাথা নাড়লেন। বললেন, যেদিন শুনানি হয় কেবল সেদিন। আমার স্বামীর হত্যা মামলার কার্যক্রম চলছে। বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠে কথাগুলো বলে গেলেন মহিলা। একটু অবাক খেলাম তার কথার ধরণে। যেহেতু মুখ দেখা যাচ্ছে না সেহেতু চোখ দেখে বুঝার চেষ্টা করলাম মহিলার কণ্ঠস্বর আর মনের অবস্থা এক কি না। চোখ দেখে যদিও কিছুই আন্দাজ করতে পারলাম না। ‘শুনবেন আমার গল্প?’ এখন বেশ কাতর শুনল তার কণ্ঠস্বর। বললাম, বলুন।

মহিলা শুরু করলেন, আপনার হয়ত শুনে ঘৃণা হবে যে আমি নিষিদ্ধ পল্লির মেয়ে ছিলাম। তবে অনেক মেয়ের মত আমি ওখানে নিজ থেকে যাইনি। আমার ওখানে যাওয়ার গল্পটা লম্বা, সংক্ষেপে বলি। আপনার আগ্রহ আছে তো?
-হ্যাঁ।-- আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়েছে বটে। তবে না করতে পারলাম না।
সায় পেয়ে মহিলা বলতে শুরু করলো। আমি তখন সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি। ঐ বয়সের প্রত্যেক বালিকার মত আমারও একটা সুন্দর সাজানো সংসারের স্বপ্ন ছিল। নিজ পছন্দের মানুষকে সাথে করে সে স্বপ্নটিকে বাস্তবে রূপ দিতেই পালিয়ে এসেছিলাম ওর সাথে। কিন্তু আমি যে মানুষটাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনছিলাম, যাকে বিশ্বাস করে পরিবার ছেড়ে পালিয়েছিলাম সে মানুষটির মনে অন্য কিছু ছিল। পালিয়ে আসার রাতেই সে আমাকে অবচেতন করে বিক্রি করে দিয়েছিল। সেই থেকে আমার জীবনের সকল দুর্দশা আর নাটকীয়তার শুরু। আপনার কি আগ্রহ আছে? মহিলা আবার জিজ্ঞেস করলো। আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। মহিলা আবার বলতে শুরু করলো, নিষিদ্ধ পল্লির দুই প্রভাবশালী মহিলা ছিল। একজনকে সকলে বড় মাসি আরেকজনকে ছোট মাসি বলে ডাকে। জ্ঞান ফেরার পর প্রথম পরিচয় হয়েছিল এই দু মহিলার সাথে। কুৎসিত চেহারার মহিলা দুটো প্রথম দুটা দিন একটানা শাসিয়ে গেল। আমি হাত পা ধরলাম, কত কাকুতি মিনতি করলাম ছেড়ে দিতে কিন্তু ওদের মন গলল না। আমাকে তারা একটি কক্ষে বন্দী করে রাখল। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। সম্ভব হয়নি, সিলিং এ সে সুব্যবস্থা ছিল না। নিষিদ্ধ পল্লির প্রথম দুদিন দু রাত গেল তালাবন্ধ কক্ষে বন্দী থেকে। তিনদিনের মাথায় আমাকে দিয়ে খাটানো হয়। আমার সেদিন খুব কান্না পাবার কথা। কিন্তু গত দুদিনের বিরামহীন কান্নার ফলে চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। প্রথম যে ছেলেটির সাথে রাত কাটাতে হয়েছিল তাকে আমার স্পষ্ট মনে আছে। অল্পবয়সী একটি নিরীহ চেহারার লাজুক ছেলে। যাই হোক, ঐ রাতেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাকে কদিন খাটানো হল না। কদিন পর এক গাঁট্টাগোঁট্টা মত এক লোক আমার ঘরে আসলো। আমি তখন অনেকটা সুস্থ তবে অসুস্থতার ভান করছিলাম, কিন্তু কাজ হয়নি। হয়তো মাসিরা অভিনয়টা ধরতে পেরেছিল। তারা বিশাল দেহী লোকটাকে আমার নিকট পাঠিয়ে দিল। লোকটাকে দেখেই আমার কেন যেন খুব ভয় হল। খানিক বাদেই দরজায় সজোরে ধাক্কা পড়ল। পুলিশ এসে সেই লোকটিকে নিয়ে গেল। এরপর আমাকে আর খাটানো হয়নি। ঐ লোকটা লোক পাঠিয়ে নাকি বারণ করেছে। এরপর থেকে মাসিরা আমার সাথে হঠাৎ করে খুব ভালো ব্যাবহার শুরু করল। নতুন কাপড় চোপড় , তেল, সাবান এর ব্যবস্থা করল, ভালো ভালো খাবারের ব্যবস্থা করল। মাসিদের নিকট ওই লোকটা সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করলাম। তারা বিশেষ কিছু বলতে পারলো না। কেবল জানলাম সে আমাকে কিনে নিতে চায়। কিছুদিন পরের কথা। আমি গোসল খানায় পড়ে গিয়ে বেহুশ হয়ে গিয়েছিলাম। জ্ঞান ফেরার অর দেখলাম মাসি-দ্বয় আমার পাশে বসে আছে। জানলাম আমার পেটে নতুন একটি প্রাণ এসেছে। মাসিরা বললেন ওটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নষ্ট করে দিতে। আমি বেঁকে বসলাম। মাসিরা চাপ দিতেই থাকলো। আমি আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে বসলাম। এরপর যখন তারা জানতে পারলো বছর দুইয়ের আগে লোকটির ছাড়া পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই তখন পরিস্থিতি একটু বদলাল। যদিও বুঝতে পারছিলাম প্রসবের পর সন্তানটিকে আর কাছে রাখতে পারবো না। যাই হোক যথা সময়ে একটি মেয়ে আসলো আমার কোলে। একটিবারের জন্যই কেবল আমাকে মেয়েটাকে দেখতে দেওয়া হল। এই সামান্য মানবিকতাটা তারা আমার সাথে করেছিল। মেয়ের মুখ দেখার বদলে আমি তার জন্ম দাগের প্রতি মনোযোগী ছিলাম। জানতাম এরপর মেয়েটিকে আর দেখতে পাবো না। সিনেমা দেখতাম খুব। আশা ছিল, সিনেমার গল্পের মত এই দাগ গুলোই দেখে হয়ত কোনদিন সনাক্ত করতে পারবো। বড় মাসিকে বলেছিলাম আমার মেয়েটার খেয়াল রাখতে। পায়ে পড়ে কেঁদেছিলাম। ঐ কুৎসিত মহিলাকে মা পর্যন্ত ডেকেছি। শেষমেশ সে কথা দিয়েছিল আমার মেয়ের খেয়াল রাখবে, ভদ্র পৃথিবীর লায়েক করে তুলবে। একটা শর্ত জুড়ে দিল। বিশাল দেহী লোকটি আসার আগে একজনের সাথে রাত কাটিয়েছি সেটা যেন লোকটি ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে। আর অবশ্যই সাথে আমার বাচ্চার কথাও।---এতগুলো কথা একটানা বলার পর মহিলা একটু থামল। এক ঢোক পানি গিলে জিজ্ঞস করলো, আপনাকে বিরক্ত করছি নাতো?। “না”

আবার শুর করল মহিলা, এরপর অনেকদিন পর লোকটি জেল থেকে ছাড়া পেল। লোকটি আমকে ওখান থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার পর আমি তৃতীয়বারের মত বিক্রি হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সত্যি বলতে নিজেকে তখন একটি পণ্যের চেয়ে বেশী কিছু মনে হচ্ছিল না। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে বুঝলাম লোকটির মনে সেরকম কোন খেয়াল নেই। লোকটাকে আমি আমার অতীতের সব কিছু খুলে বললাম শুধু সেই ছেলেটি আর সেই রাতের কথাটা চেপে গেলাম। সব শোনে লোকটি একটু হেঁসে বলল, আমি খারাপ মানুষ কিন্তু তোমার ঐ প্রেমিকের মত অতটা না। ঐ সাধারণ একটি কথা শোনে মনে হল দীর্ঘকাল মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়ার পর আমি তীরের দেখা পেয়েছি। তবে লোকটি আমায় বিয়ে করল না। বেশ অদ্ভুত প্রকৃতির ছিল সে। খুব একটা কথা বলত না, সারা দিন বাইরে বাইরে থাকত। মাঝে মধ্যে পার্টিতে নিয়ে যেত আমাকে। বড় বড় পলিটিকাল লিডার, আন্ডারওয়ার্ল্ড-এর লোকদের পার্টি। ওখানে অবশ্য সে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিত তার স্ত্রী হিসেবে। আমার ঐসব খারাপ লোকদের আড্ডায় ভালো লাগত না। তবে আমি তাকে কখনও না বলতে পারতাম, আমার সে শক্তি ছিল না। পার্টি কিংবা অন্য কোথাও তার পরিচিত কেউ আমার রূপের প্রশংসা করলে, আমার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকালে তখন তাকে গর্বিত মনে হত। মাঝে মধ্যে মনে হত লোকটি এই অদ্ভুত আনন্দ পাওয়ার জন্যই আমাকে রক্ষিতা করে রেখেছে। সে নিজেও মাঝে মাঝে বলতো, আমার বসদের অনেক টাকা, তবে তাদের কাছে এত সুন্দরি বউ নেই। আমি কখনও কখনও জবাবে বলতাম, আমি তো তোমার বউ নই। উত্তরে সে কিছু বলত না। ওকে বিয়ের জন্য কোন চাপ দিতাম না। আমার সাহস হত না। আমি প্রতিনিয়ত লোকটির মনটা জিতে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। এতদিন একই ছাদের নীচে বসবাস করেও আমি সঠিক জানতাম না মানুষটার পেশা আসলে কী? গর্ভবতী হয়ে পড়ার পর আস্তে আস্তে আমি নিজেকে কিছুটা বদলাতে চেষ্টা করি। মাঝে মধ্যে তাকে চেপে ধরতাম। কী করছে, কোথায় যাচ্ছে এসব জিজ্ঞেস করতাম। বিশেষ কিছু বলত না আমাকে। বলত ব্যবসার কাজ। বিস্তারিত কিছু জানতে চাইতাম না কারণ পায়ের নীচে মাটি ছিল না আমার। ওকে কিছুটা দেরিতে জানালাম অনাগত সন্তানের কথা। সেদিন খুব ভয় হচ্ছিল। ভয় ছিল মাসিদের মত সেও বলে বাচ্চা নষ্ট করে ফেলার কথা বলে। কিন্তু না, সে বলেনি। সে কিছুই বলেনি। উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেনি। একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়, মৃত। সেদিন আমি খুব কেঁদেছিলাম, এতটাই কেঁদেছি যে সারা জীবনের কান্না এক করলেও হয়ত তার সমান হবে না। এর পরই লোকটি আমাকে বিয়ে করলো, আচমকা! হয়ত তার করুণা হয়েছিল। লোকটার উপর আরও কৃতজ্ঞ হয়ে পড়লাম। এর মধ্যে মেয়েটিকে অনেক খুঁজেছি, পাই নি। আমি ছেড়ে আসার কিছু দিনের মধ্যে পতিতা পল্লিটা তখন তুলে দেওয়া হয়েছিল। মাসিদের কিংবা ওখানকার কোন মেয়ের দেখা মেলেনি।

বিয়ের পর আস্তে আস্তে স্বামীর আর্থিক উন্নতি হতে শুরু হলে সে আমাকে লক্ষ্মী বলে ডাকা শুরু করলো। যদিও প্রথম দিকে তার এই উত্থানে আমি এতে খুব একটা খুশি ছিলাম না। তার এ উন্নতি কীভাবে হচ্ছিল জানা একটি চকলেট ফ্যাক্টরি, পরে একটি গার্মেন্টস গড়ে তুলল। তবে আস্তে আস্তে তার সব অবৈধ কাজ মেনে নিয়েছিলাম। নিজেকে বুঝালাম উচ্চবিত্তরা কেউই ধুয়া তুলসী পাতা নয়। আমাকেও যে লোভ লালসা পেয়ে বসেনি তা না। হাতে প্রচুর টাকা, অঙ্গে বাহারি গয়না, গায়ে দামী বস্ত্র...কজনের সাধ্য আছে এসবের লোভ সামলানোর? সচ্ছল, সুন্দর, আয়েশি জীবন...বেশ লাগতো। তবে একটা ঘাটতি ছিলই, একটি সন্তান। কিন্তু খোদা আমাদের পাপে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বিয়ের পনেরো বছর পরও আমরা নিঃসন্তান রয়ে গেলাম।

আস্তে আস্তে আরও খারাপ সময় আসলো। আমি টের পেলাম আমার স্বামী অন্যত্র মজে আছে। কিছু বলতে পারতাম না ওকে। আমার কাছে প্রমাণ ছিল না, তার উপর আমি তখনও পায়ের নীচে শক্ত মাটি অনুভব করতে পারিনি। ওর উপর রাগ হলেই আমার অতীতের কথা মনে পড়ে যেত। অতিমত্রায় কৃতজ্ঞ ছিলাম আমি। এভাবেই চলছিল এতদিন। সেদিন হঠাৎ ফোন আসলো। ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন বলল গার্মেন্টসের অফিসে ও খুন হয়েছে। দ্রুত ওখানে ছুটে যাই। ভিড় ঠেলে অফিস রুমটিতে যখন প্রবেশ করলাম তখন চমকে উঠলাম। দেখলাম অফিস কামরার ভেতরে আরেকটি কামরা ঐ কামরায় আমার স্বামীর রক্ত মাখা নিথর দেহ পড়ে আছে। আমার মাথা কাজ করছিল না। আমি অনেকবার ঐ কামরায় প্রবেশ করেছি কিন্তু কোনদিন মনে হয় নি ভেতরে আরেকটি কামরা আছে। আমার মনে সন্দেহ চাপল। ঠিক সন্দেহও নয় আমি একরকম নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে খারাপ কিছু একটা করত আমার স্বামী। একদিকে শোকে মুষড়ে পড়লাম, অন্যদিকে প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছিল ওর প্রতি। আবার কখনো মনে হচ্ছিল লোকটা অতটা খারাপ ছিল না, দোষে গুণেই তো মানুষ। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে আমার স্বামী মানুষ হিসেবে কেমন ছিল তবে উত্তরে আমি সত্যিই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়বো।
এরপর নিয়ম পালন করতেই আমি মামালা করে বসলাম অজ্ঞাত নামধারী কেউ একজনের বিরুদ্ধে। খুনের ব্যপারে গার্মেন্টসের কেউ মুখ খোলেনি। জানতাম না কে খুনটা করেছে। সপ্তাহ খানেকের ভেতরে পুলিশ গার্মেন্টসে চাকুরী করা একটি মেয়েকে গ্রেফতার করে।
---এতটুকু বলার পর মহিলা সময় দেখে নিলেন। বললেন, সময় নেই আজ। গল্পের বাকিটুকু অন্যদিন বলবো। মহিলা বিদায় নিয়ে চলে গেল।

ঐ দিনই দুপুরের দিকে যখন এখানকার উকিল সুব্রত আসলো তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, এমন কোন কেসের কথা সে জানে কি না। সুব্রত শুনা মাত্রই বলল, আরে এই কেসটা নিয়ে তো ভালোই মাতামাতি হচ্ছে। সুব্রত শুরু করল, “আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দরি মহিলা। বিশ্বাস কর হাসান মুম্বাই-মাদ্রাজের অনেক সুন্দরি নায়িকা দেখেছি, বাংলার সুচিত্রাকেও দেখেছি। কিন্তু এই মহিলাটির ধারে কাছেও কেউ নেই। মহিলার নাম আফরোজা শাকিল। শাকিল স্বামীর নাম। আস্ত একটা বদ লোক। চেহারাটাও তেমন, খুবই কুৎসিত। এই লোকটিকে এই মহিলাটা কেন বিয়ে করলো সেটা ভেবে অনেক সময় নষ্ট করেছি। যতটুকু যানা যায় লোকটা কোন এক এক এতিমখানায় বড় হয়েছিল। এতিমখানা থেকে সোজা অপরাধ জগত। আন্ডারওয়ার্ল্ডে খুব দ্রুতই নাম করে ফেলে। ভয়ঙ্কর রকমের ধূর্ত ছিল। লোকটার মৃত্যুর পর তার প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের অফিসে এক একটি গোপন কামরা পাওয়া গিয়েছিল। মহিলা অনেক টাকা ঢেলেছিল বলে পত্র-পত্রিকায় এসব মুখরোচক কীর্তি কাহিনী ছাপা হয়নি। হত্যা মামলার আসামী একটি মেয়ে। গার্মেন্টসে চাকরি করত। বিবাদী পক্ষের উকিলের সাথে আমার ভালো পরিচয় আছে। তার দাবি মেয়েটি সতীত্ব বাঁচাতে গিয়ে খুন করেছে। যতটুকু শুনেছি বাদী পক্ষ খুব একটা তৎপর ছিল না মামলা নিয়ে। কিন্তু অবাক হওয়ার মত ঘটনাটা ঘটল আজ। মহিলা আচমকা কনফেস করে বসলো যে, হত্যা সে নিজেই করেছে। সে নাকি এখন অনুতপ্ত। এখন তাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। যেচে কেউ এভাবে ফাঁসির দড়ি গলায় নেয় এই প্রথম দেখলাম। ”
সুব্রতের বর্ণনা শুনে বেশ অবাক হলাম সত্য তবে এ নিয়ে খুব একটা খোঁজ নেওয়া হয়নি। নিজের দুরবস্থার তুলনায় এসব চাঞ্চল্যকর বপার একেবারেই নস্যি। আর্থিক, মানসিক চাপে ঘটনাটা একরকম ভুলে গিয়েছিলাম। এতদিনে অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করেছি ব্যবসাটা গুটিয়েই ফেলবো। আর মাত্র সপ্তাহ খানেক আছে এই মাস শেষ হওয়ার। এরপর এই রেস্টুরেন্টটা বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার পর কিভাবে কী করব দোকানে বসে সেটা ভাবছিলাম। ভাবনায় ছেদ পড়ল সালাম শুনে। অপরূপ একটি কিশোরী মেয়ে ক্যাশের সামনে দাঁড়িয়ে। সালামের জবাব দিলাম। একটি খাম বাড়িয়ে দিল মেয়েটি। এটা কী? জিজ্ঞেস করলাম। “জানি না” বলল মেয়েটি। মেয়েটি একটি চেয়ারে বসে পড়ল। খাম খুলে দেখলাম একটি চিঠি ও একটি চেক। চেকে টাকার অংকটা বিশাল। চোখ কপালে উঠার মত। চিঠিটা খুললাম দ্রুত,

জনাব,
এই টাকা গুলো আপনার। বিনিময়ে শুধু মেয়েটির খেয়াল রাখবেন। মেয়েটি বড়ই হতভাগী। সে জানে তার মা মরে গেছে কারণ সেই মাসি মরে গেছে। বাবা সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। অথচ হতভাগী জানে না তার সত্যিকারের আপনজনরা পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে আছে। তবু প্রতিনিয়ত সম্ভ্রম খোয়ানোর ঝুঁকি নিয়ে সে পেটের দায়ে এখানে ওখানে কাজ করছে। এই মেয়েটির ঘামের ফসল দিয়ে তার মা দামী গাড়িতে ঘুরেছে, দামী বাড়িতে আয়েশি জীবন যাপন করেছে। এতটুকুই নয়, মেয়েটিকে ফাঁসির মঞ্চের একেবারে নিকটে যেতে হয়েছে সৎ বাবার লালসা থেকে নিজেকে বাঁচাতে। আর তার আসল পিতা তার সামনে দাঁড়িয়ে এই মাত্র সব কিছু জানতে পেরেছে। ভয় নেই, সে কিছুই জানে না।
ইতি-
আপনার সহপাপী
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:৩৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৩৬

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

USB Charger এর ভেতরে লুকানো ক্যামেরার ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×