আমার বিয়ের সময় এক কেলেঙ্কারি হলো। ১৯৮৩ সালের ঘটনা। রাত বারোটার দিকে বাসরঘরে ঢুকে ফিল্মি কায়দায় দরজার ছিটকিনি লাগাতে গিয়ে উঁ উঁ শব্দ শুনতে পেলাম। পেছন ফিরে দেখি, আমার নববিবাহিতা স্ত্রী বিয়ের জমকালো শাড়ি গয়না পরে খাটের ওপর জবুথুবু হয়ে বসে আছে আর আমাকে উদ্দেশ্য করে মুখ দিয়ে ওরকম শব্দ করছে। ব্যাপার কী? সে কী আমাকে ছিটকিনি লাগাতে নিষেধ করছে?
কাছে গিয়ে আমিও কথা না বলে ইশারায় ব্যাপার কী জানতে চাইলাম। সেও ইশারায় খাটের নিচে ইঙ্গিত করে দেখতে বললো। আমি উবু হয়ে দেখতে গিয়ে মাথা থেকে পাগড়ি খুলে পড়ে গেল। আর সাথে সাথে খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে প্যান্ট শার্ট পরা এক বৃদ্ধা মহিলা তড়িৎ গতিতে আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ঘরের দরজা খুলে পালিয়ে গেল। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, বাইরে ভীষণ হৈ চৈ হচ্ছে। বৃদ্ধাকে কল তলায় শুইয়ে ফেলে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। একপাল কম বয়সী মেয়ে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ নানারকম রং দিয়ে বৃদ্ধার তোবড়ানো গাল মুখ রঙ্গিন করে দিচ্ছে। কেউ কেউ অতি উৎসাহে কল তলার কাদা তুলে বৃদ্ধার মাথার চুলে সযত্নে মেহেদি লাগানোর মতো করে লাগিয়ে দিচ্ছে। বৃদ্ধা হাত জোড় করে সবার কাছে ক্ষমা চাইছে। কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হচ্ছে না। আমার মা, বড়ভাবী এবং বিয়েবাড়িতে আসা বয়স্ক মহিলা আত্মীয়স্বজনরা চিৎকার করে বলছেন, ‘ছেড়ে দে রে, ছেড়ে দে। বুড়ো মানুষ, মরে যাবে।’
অবশেষে এক সময় বৃদ্ধাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। তাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্যও করা হলো। বৃদ্ধা কল তলা থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বারান্দায় উঠে আসার পর দেখি, রেনু নানী। কাদা পানি মাখা ঢিলে ঢালা প্যান্ট শার্ট পরে হতভম্ব হয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। লাইটের আলোয় তাঁর চেহারা হরর ছবির ডাইনীদের মতো দেখাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘নানী, তুমি!’ রেনু নানী তাঁর আধ ফোকলা দাঁতে হাসার চেষ্টা করে বললেন, ‘আমার কোন দোষ নাই ভাই। এরাই আমাকে জামা প্যান্ট পরিয়ে তোর ঘরে খাটের তলায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি যেতে চাইনি ভাই। বিশ্বাস কর।’
রেনু নানী আমার মায়ের আপন মামী। আমার বিয়ের ঘটকালিও তাঁর হাতে। আমি কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললাম, ‘বেশ, বেশ! এখন যাও, মাঝরাতে গোসল করে অসুখ বাধাও।’
আমার কথা শুনে মেয়েরা হৈ হৈ করে রেনু নানীকে গোসল করাতে আবার কল তলায় নিয়ে গেল। সেখানে সাবানের ফেনা তুলে তাকে ধোলাই করা হতে লাগলো। আমি বাসর ঘরে যাওয়ার জন্য পেছন ফিরে দেখি, আমার স্ত্রী দরজার ফাঁক দিয়ে চুপি চুপি সব দেখছে। আমাকে ফিরতে দেখে সে দ্রুত খাটের ওপর গিয়ে বসে পড়লো। আমি ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে তার কাছে যেতেই সে আবার খাটের নিচে ইঙ্গিত করে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘আরও আছে।’
ভালো ল্যাঠা হলো দেখছি। খাটের নিচে কতজন লুকিয়ে আছে? জুতাপেটা না করলে তো এরা বেরুবে না দেখছি। আমি পা থেকে নাগরা জুতা খুলে হাতে নিয়ে খাটের নিচে উঁকি মেরে দেখি, একটা টেপ রেকর্ডার। কোন মানুষজন নেই। তখনকার দিনে ছোট ছোট অডিও ক্যাসেটে গান বা কথাবার্তা রেকর্ড করা হতো। নববিবাহিত দম্পতি বাসরঘরে নিজেদের মধ্যে কী কী কথাবার্তা বলে (নানারকম শব্দসহ), তা’ জানার জন্য কে বা কারা এরকম একটা টেপ রেকর্ডার খাটের নিচে ঢুকিয়ে চালু করে রেখে গেছে। আমার কিছু ফাজিল বন্ধু আছে। এ কাজ তাদের না হয়েই যায় না। আমি টেপ রেকর্ডার বের করে ‘তোরা চলিস ডালে ডালে, আমরা চলি পাতায় পাতায়’ এই কথাগুলো বলে রেকর্ডিং বন্ধ করে টেপটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিলাম। জুতা খুলে হাতে নেওয়ার পর থেকেই আমার স্ত্রী ফিক ফিক করে হাসছিল। এবার সে হেসে বিছানায় গড়িয়ে পড়লো।
পরদিন বৌভাতের খাওয়া দাওয়া চলছে। তখনকার দিনে মফঃস্বল শহরে কমিউনিটি সেন্টারের কায় কারবার ছিল না। বাড়ির সামনে বা পেছনে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে বাড়ির ছাদই ভরসা। তো ছাদের এক অংশে পর্দার আড়ালে মহিলারা খেতে বসেছে, আর এক অংশে পুরুষরা। মেহমানদের খাওয়ানো ও তদারকির জন্য আমার বড়ভাই পর্যাপ্ত লোক নিয়োগ করেছেন। তারপরেও আমাদের এলাকার রেওয়াজ অনুযায়ী নববিবাহিত দম্পতিকে মেহমানদের খাওয়া দাওয়ার খোঁজ নিতে হয়। আমি ও আমার স্ত্রী ঘুরে ফিরে সেই কাজ করছি। রেনু নানীর দু’পাশে দাঁড়িয়ে আমরা তাঁর খাওয়া দেখছিলাম। খেতে খেতে একসময় মাথা তুলে তিনি আমাদের দেখে চমকে গেলেন। তাঁর খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আমি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘নানী, খাও খাও। কাল রাতে তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। পেট ভরে না খেলে চলবে? এই, কে আছো এখানে? আমার নানীকে আর এক পিস রোস্ট দাও।’
আমার স্ত্রী ফিক করে হেসে ফেললো। রেনু নানী বললেন, ‘ভাতার পেয়ে খুব যে হাসছিস রে ছুঁড়ি! আমার মতো বুড়ি কী হবি না কোনোদিন?’
রেনু নানীর মুখ বড্ড বেফাঁস। কখন কী বলে ফেলেন ঠিক নাই। আমি স্ত্রীকে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে কেটে পড়লাম। পুরুষদের মধ্যে আমার সেই ফাজিল বন্ধুরা গল্প করতে করতে খাচ্ছিল। স্ত্রীর কাছে আগেই শুনেছি, সকালে আমি যখন বাথরুমে ব্রাশ করছিলাম তখন ওদের একজন চোরের মতো ঘরে ঢুকে টেপ রেকর্ডারটা খাটের নিচ থেকে নিয়ে গেছে। আমাদের দুজনকে দেখে ওরা খেতে খেতে যেভাবে হাসার চেষ্টা করলো, তাতে মনে হলো সবার কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে। আমি বললাম, ‘কি রে খাওয়া দাওয়া কেমন হচ্ছে?’
‘ভালো।’
‘কোন সমস্যা নাই তো?’
‘না, না।’
‘খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে তোরা নিচে গিয়ে ড্রইংরুমে বসে টেপ রেকর্ডারে গান টান শুনিস। আমি একটু পরে তোদের জন্যে পান নিয়ে আসছি।’
এক বন্ধু খাওয়ার মধ্যে পানি খাচ্ছিল। আমার কথা শেষ হতেই বিষম খেয়ে সে চোখ মুখ লাল করে ফেললো। আমার স্ত্রীর আবার সেই ফিক ফিক হাসি। সাথে শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে গোপনে আমার বাঁ হাতে একখানা চিমটি।
*****************************************************************************
এই লেখাটি ইতিপূর্বে প্রথম আলো ব্লগে প্রকাশিত। সামু ব্লগের বন্ধুরা যারা এটি পড়েননি, তাদের জন্য এই ব্লগে প্রকাশ করলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



