somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চলার পথের কিছু কথা ৬

১০ ই আগস্ট, ২০২০ সকাল ৯:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সিলেট ১
এইচএসসির পর যেসব ভার্সিটিতে এডমিশন পরীক্ষা দিতে যাই তার মধ্যে শাহ্ জালাল ভার্সিটি অন্যতম। এই শহরে আমার জন্ম।আবছ কিছু যাও মনে পরে তা বুঝে ওঠার পূর্বেই হারিয়ে যায়। একা যেতে হবে সেই শহরে। সকাল বেলা যে বাসে টিকিট করলাম হানিফ এন্টাপ্রাইজ, সেটিও তাদের প্রথম সিলেট এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে এবং আমিই প্রথম যাত্রী-- টিকিটও কাটলাম এ১।
রাত্রি ১০.০০ টার সময় উপস্থিত হই, বাসে আরোহন করার পর তারা যাত্রীদের মিস্টি আর একটি রজনীগন্ধার স্টিক দিয়ে অভিন্দন জানায়। বাসের অন্যান্যরাও পরীক্ষার্থী। ভার্সিটিতে এডমিশন পরীক্ষার এই এক মজা, দল বেধে পরীক্ষা দিতে যাওয়া। রাত তিন কি সাড়ে তিনটায় সিলেট পৌছে যাই। আমরা কিছু বলার পূর্বেই সুপারভাইজার সাহেব আমাদের শাহ্ জালাল ভার্সিটি পর্যন্ত পৌছে দিবেন বলে অবহিত করলেন। আমরা তাদের ধন্যবাদ দিলাম। সেই রাতে সিলেটে নামলে অনেক সমস্যা দেখা দিত।

আমাদের ভার্সিটি গেইটে নামিয়ে দেওয়া হল। তখনও অন্ধকার। এর মধ্যে ভার্সিটির প্রধান রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমরা হলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। মাঝা মাঝি এসে দেখি প্রধান সড়কটি দুই ভাগ হয়ে দুই দিকে গেছে একটা সোজা আর একটি বাম দিকে। আমরা বাম দিকে যাত্রা করলাম যেহেতু কিছু দূরেই একটা ভবন দেখা যাচ্ছে। হল হবে হ্য়তো। সেখানে পৌছে হতাশ, হলই তবে ছাত্রীদের হল।আবার সেই মোরে পৌছে সোজা রাস্তা ধরে হাটলাম এবার। এবার অনেকক্ষুন হাটার পর ছাত্রদের হলের দেখা পেলাম। আমরা টিভি রুমে উঠলাম। যে যার মত সেখানের বেঞ্চ, চেয়ার এ বসে বিশ্রাম নিতে থাকলাম।এর মাঝে কিছু ভার্সিটির স্টুডেন্ট আসলেন। তাদের একজন মাহি ভাই আমার খোঁজ খবর নিয়ে বললেন ''তুমি আমার সাথে আমার রুমে আসো, তুমি আমার গেস্ট"।গেলাম তার সাথে তার রুমে।গিয়ে দেখি আরো দুইজন শিক্ষার্থী রয়েছে। মাহি ভাই বললেন "তোমরা পরিচয় হয়ে নাও, একবিছানা দুই জন শেয়ার করবা আর আমি পাশের রুমে আছি, কোন প্রয়োজন হলে বলবা"।

সকাল হলে তিনি আসলেন আমাকে নাস্তা করানোর জন্য। গেলাম তার পিছু পিছু ।পরোটা, ডাল, সবজি ভাজি আর ডিম ভাজি। তিনিই দাম দিলেন। যতই বলি আমি দেই ভাই, তার এক কথা "তুমি আমার গেস্ট, তুমি দিবা ক্যান।"

পরীক্ষা ছিল সকালে আর দুপুরে। সেই দিনের পরীক্ষার সিট পরে ছিল ক্যাম্পাসেই তাই ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হয় নাই। দুপুরবেলা খেতে গিয়ে একভাই এর সাথে পরিচয় হল, বাড়ি তার সুনামগঞ্জ, সমাজকল্যাণ এ পড়েন। কোন রুমে উঠেছি জানতে চাইলেন। শুনে আমার ইচ্ছা হচ্ছিল তখনই কেটে পরি। রুমটা ছাত্রদলের এক বড় ভাইর। আমি জানলে সেই রুমে উঠতামই না। দুপুরের খাবার পর রুমে গিয়ে দেখি সেই বড় ভাই আর তার সংগিসহ সিগারেট খাচ্ছেন এর মধ্যে মাহি ভাইও আসলেন। আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তারা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে দিলেন। আমার বিস্তারিত যেনে তিনি বিদায় নিলেন।

সেই বড় ভাই রাত্রে আসেন, কিছুক্ষণ থেকে তার প্রয়োজনী জিনিস নিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে আমাদের সাথে কথা বলেন। এর পূর্বেই মাহি ভাইকে বলেছিলাম আমি যদি আগে এই রূম সম্পর্কে জানতাম তাহলে তার গেস্ট হতাম না। বিষয়টি তার সাথে আমারই সামনে বড় ভাইকে অবহিত করলে তিনি বলেন "এখনে ভয়ের কিছু নাই, তুমি টিকলে তোমার ট্র্যাকে তুমি যাবা। পছন্দ হলে তুমি আমাদের সাথে যোগ দিবা না হল নাই, এখানে জোড়াজুুুড়ির কিছুই নাই।" আমি নিরবে তার কথাগুলি শুনি। তিনি আমাদের উইস করলেন, যেন ভাল ভাবে পরীক্ষা দেই, ভয় যেন না পাই। রুমে তিনি আমার সাথে সবার শেষে হ্যান্ডশেক করে চলে যান।

রাতের খাবারের জন্য মাহি ভাই আমাকে নিয়ে ডাইনিং হলে নিয়ে যান। আমাকে টেবিলে বসিয়ে তিনি মেস ম্যানেজারের কাছে যান অর্ডার করতে। মাহি ভাই আর ম্যানেজারের মাঝে কথোপোকথন কিছু না শুনলেও এটা বুঝতে পারি খাবারের টাকার জন্য ম্যানেজার জোড়াজুড়ি করছেন, (সম্ভবত মেসে কিছু বাকি পরে ছিল)। কিছুক্ষণ পর তিনি এসে বলেন "ভাইয়া তোমাকে খাবার দিবে, যা লাগে খেয়ে নিবা, কোন সমস্যা হলে ম্যানেজারকে বলবা।" আমি তার খাওয়ার কথা বললে তিনি এত তাড়াতাড়ি খান না বলে জানান। আমি একটু ইনস্সিট করি বিল দেওয়ার জন্য, তার ঐ এক কথা "তুমি আমার গেস্ট, তুমি বিল দিবা ক্যান?"।

রাত্রের খাবার খেয়ে রুমে এসে বিছানা শুয়ে পরি, একটু তন্দ্র লাগতেই, একজনকে দেখলাম তাড়াহুড়া করে রুমে এসে গামছায় পেচিয়ে দোনালা বন্দুক নিয়ে গেল। ঘুম সব শেষ।চোখ ডলি আর একজন আরেক জনকে দেখি। আধা ঘন্টা পর তিনি বেশ ধীরে সুস্থে বন্দুক সহ প্রবেশ করলেন। আমরা তাকিয়ে আছি দেখে তিনি হেসে বললেন "একটু মহরা দিয়ে আসলাম"।

এরপর কোন রকম রাত পার করেই আবার পরীক্ষার উদ্দেশ্যে যাত্রা। সকালের পরীক্ষার সিট আজকে ক্যাম্পাসের বাইরে পরেছে। কোন মতে পরীক্ষা দিয়ে ক্যাম্পাসে আসি দুপুরের পরীক্ষ দিতে। মাঝে রুমে আসি ফ্রেশ হতে। তখন রুমে মাহি ভাই পরিচয় করিয়ে দেন সিইসির সোহাগ ভাইয়ের সাথে। তিনি পরীক্ষার প্রশ্নটা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস করতে গিয়েও পরে বাদ দিলেন, বললেন রাতে দেখবেন।

আমার শাহ্ জালাল ভার্সিটির সর্বশেষ পরীক্ষার সিট ছিল ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। পরীক্ষা দিয়ে বের হতেই দেখি সেই বড় ভাই মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পিছনে শখানেকের মত ছাত্র।

পরীক্ষা দিয়ে রুমে আসি দ্রুত। দেখি মাহি ভাই ঘুমাচ্ছেন। তাকে ডেকে তুলে বলি "ভাইয়া আমাকে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। আম্মা কল দিয়েছেন"
"কি বল, পরীক্ষা শেষ, তুমি একটু শহর ঘুরে দেখবা না।শহর যদি না ঘুরো, ক্যাম্পাসটা একটু দেখার জন্য থাকো।কালকে যাও।"
"না ভাইয়া, আম্মা যেতে বলেছেন, আমাকে যেতেই হবে"।
"আচ্ছা ঠিক আছে যাও, ভাড়া লাগলে বলো। আর একটা দিন থাকলে ভালো হইতো, আচ্ছা যাও, পৌছে ফোন দিও"
আমি কোন মতে একটা রিক্সা ধরে বাস স্ট্যান্ডে আসি। সবকটা বাস ভর্তি। শেষে শ্যামলীতে ইন্জিন কভারে যায়গা পাই।
সারাটা পথ আমি ঢুলতে ঢুলতে আসি। আমার এই অবস্থা দেখে স্টাফরা হাসাহাসি করে। কিছুক্ষণ পর পর বলে ভাই সাবধানে বসেন।
রাত সাড়ে এগারোটায় বাসায় পৌছে এক আরামের ঘুম দেই।

ঠিক দুই মাসের মাথায় পত্রিকায় দেখি সেই বড় ভাই প্রতিপক্ষের গুলিতে ক্যাম্পাসেই নিহত হন। তিনি ছিলেন নটরডেম কলেজের ছাত্র।



ঢাকা ১
তখন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে যাই। সকালের পরীক্ষা দিয়ে ক্যাম্পাসে হাটছি। পথে কজন শিক্ষার্থীদের দেখলাম অসুস্থ সহপাঠির জন্য টাকা তুলছে। আমাকে দেখে একজন টাকা দেওয়ার জন্য বেশ জোড়াজুড়ি করলেন। আমি তাকে বলি এতো জোড়াজুড়ি করারতো প্রয়োজন নাই। তিনি আমার উপর ক্ষেপে গেলেন।
"এই ওরে বান, রড দিয়া পিডামু ওরে, ও আমারে ক্ইছে আমি জোড়াজুড়ি করছি, এই তুই এখানে খারা, আজকে সারা দিন এইখানে খারাইয়া থাকবি"
আমি চুপচাপ দাড়িয়ে থাকলাম।
তার সাথের একজন আমার বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করে।
"ভাই ওর বাড়ি বরিশাল"
"তো কি হইছে, ওরে রড দিয়া পিডামু"
এরই মাঝে তাদের মধ্যে চোখেচোখে কি কথা হয় কে যানে।
ছোটজন কিছু টাকা দিয়ে যেতে বলেন। আমিও কিছু টাকা দিয়ে চলে আসি।

কুইজ: আমি কেন তারাহুরো করে ভার্সিটি ত্যাগ করি?
ছবি: ফেইসবুক থেকে নেয়া।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ৯:৩৮
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কদমের পাপড়ি

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৭ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩


এ আষাঢ়ের চোখ কেমন জানি-
চৈত্রের হাওয়ায় কদম নয় যেনো
আগুন- আগুন- তবু ভেজে যাচ্ছে-
শান্তি চুক্তির গন্ধ বাতাস-বাতাসে;
আনন্দময় আষাঢ়ে কাম ভাবনায়
শুধু মাটির বুক গড়ে- গড়ে আসে
জলকাঁদার শ্রেষ্ঠ হাসি অথচ বসন্ত
কান্না... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: কুয়ালালামপুরের ছায়া সম্রাট

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৭ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



বালির নীল দিগন্ত
ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের একটি নির্জন পাথুরে সৈকত। ভারত মহাসাগরের বিশাল নীল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল তীরে। সমুদ্রের ঠিক ওপরের একটি আধুনিক কাঁচের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘র’-এর কৌশল, প্রভাব ও গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি , পর্ব ২

লিখেছেন মেহেদী আনোয়ার, ১৭ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:২১

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দেশ। বর্তমানে এ উপমহাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম ইক্লরোজ 'দি ক্রিটি ক্যাল মাস' বইয়ে মন্তব্য করেছেন, 'এ উপমহাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহলে হাদিস বিরোধী পোষ্টে ব্লগে লাইক না থাকলেও গ্রুপে লাইক পাঁচ হাজার আটশত

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৭ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৪



হাদিস প্রেমিক হলো নাস্তিক ও আহলে হাদিস। উভয় দল হাদিস দিয়ে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আমি যেহেতু মুসলিমদের হেদায়াতের জন্য কাজ করি সেহেতু আমাকে আহলে হাদিস বিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামী ব্যাংক - সবার ভাবী !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৬

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×