ঢাকা ১
ছোট খালার বড় ছেলে ঢাকা আসছে পারিবারিক কাজে। সন্ধ্যায় আত্মীয়র বাসা থেকে আসার সময় রাস্তায় এক্সিডেন্ট করেছে। রাস্তা দিয়ে একটি গাড়ি আর একটি গাড়িকে দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। প্রথম গাড়ি চলে যাওয়ার পর সে ক্রস করতে গিয়ে দড়িতে হোচট খেয়ে পরে, ভাগ্য ভালো ছিল বিধায় দ্বিতীয় গাড়ির নিচে পরে নাই। প্রথমে খিদমাহ হসপিটালে নেওয়া হয় সেখানে এক্সরের রিপোর্ট এ দেখা যায় তার বাম হাতের কোনুই ডিসলোকেট হয়েছে আর একটি হাড় ভেঙ্গেছে। তাদের সেখানে হাড় বিশেষজ্ঞ ছুটিতে তাই তারা রেফার করলো নিটোর (National Institute of Traumatology and Orthopaedic Rehabilitation (NITOR)) মানে পঙ্গু হাসপাতালে।
নিটোর আসার পর টিকিট কেটে জরুরী বিভাগে অপেক্ষা করতে হল অনেকক্ষুন। আমাদের পুর্বেই আরো রোগি জরুরী বিভাগে অপেক্ষমান। কাজিনটির এক সময় ডাক পরলো ওটিতে যাবার। আধা ঘন্টা পর বের হলো। তার ডিসলোকেট ঠিক করা হয়েছে কিন্তু ভাঙ্গা হাড় এর জন্য
মেজর অপারেশন করাতে হবে। তাই তারা এখন পোস্ট অপারেটিভ এ দিয়ে দিবে। রাতে সেখানে থাকতে হবে। প্রফেসর দিনে দেখবেন।তার পর ডিসিশন।
প্রশ্ন রাতে কে থাকবে? তার সাথে ছিল তার চাচাতো ভাই, ফুপাতো ভাই। একজন বলল তার টিউশনি আছে সে থাকতে পারবে না।আর একজনের ভার্সিটির উছিলা। নানা অযুহাত দিয়ে তারা চলে গেল। আর আমি থাকলাম তার সাথে। অথচ আমার দশ বারো দিন পর চূড়ান্ত পরীক্ষা। আমি থাকলাম অন্য কারণে, বেচারার সামনে এইচএসসি পরীক্ষা, এক বছর পূর্বে তার বাবা ব্রেইন টিউমারে মারা যায়, বাড়ির বড় ছেলে হিসাবে তাকে তার পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে, এই সময় সাপোর্ট না করলে সমস্যা আরো বাড়বে। তাই থেকে যাওয়া।
পোস্ট অপারেটিভ এর অবস্থা শোচনীয়। বেড এর অব্স্থা খুব খারাপ। যে বেডটা কাজিনের জন্য বরাদ্দ করা হল সেই বেডের পায়া ভাঙ্গা। আধলা ইট দিয়ে সাপোর্ট দেওয়া। তোষক বলতে করুন অবস্থার ফোম। বেডের রডে ময়লা বোঝাই। ওষুধ আর ময়লার বাজে গন্ধ রুমে। আলো কম। কি বাজে একটা পরিবেশ। এর মধ্যে কাজিনকে তার বেডে শুইয়ে দিলাম। সে তখনও ওষুধের ঘোরের মধ্যে। আর আমি তার বেডের এককোনায় বসে ঝিমাতে থাকলাম। মাঝে উঠে পায়চারি চলল। এভাবে চলার সময় রাত একটার দিকে কাজিনের ওষুধের ঘোর কাটলো আর ব্যাথা বাড়তে থাকলো। পরে ওষুধ দেওয়ার পর ব্যাথা কমলো। আমার আবার বসে বসে ঝিমানো আর মাঝে মাঝে উঠে পায়চারি করা। এভাবেই রাত কাটলো।
সকালে ডাক্তাররা ওয়ার্ডে দিয়ে দিল কিন্তু বেড খালি না থাকায় বাস্তুহারার মত থাকতে হলো।পরে একটা রোগি ভর্তি বেডকে এসাইন করে দিল। মানে ছাগলের খুটির মত আরকি। যাই হোক একটু ফুসরত পেয়ে চারিদিক দেখলাম আর চোয়াল ঝুলতে থাকলো। কারো হাতে রড, কারো পায়ে রড, কারো ঘাড়ে, কারো বুকের পাজরে, কারো পিঠে, কারো দুইপা প্লাস্টার করে ইট দিয়ে টানা দেওয়া, অনেকের রড নাই কিন্তু হাড় বের হয়ে আছে, কারো হাত নাই, কারো পা নাই--- সে এক অন্য জগৎ। হাসপাতালের বাহির থেকে এই দৃশ্য অনুধাবন করা যায় না। আর যে প্রথম এই দৃশ্য দেখবে সে শক খাবে। আর আল্লাহর কাছে বার বার দোয়া করবে যেন তাকে এই করুন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে না হয়।
একটি ছেলের সাথে কথা বললাম, ক্লাশ এইটএ পরে, শখ করে হোন্ডা চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করেছে ঝালকাঠিতে। কোন মতে প্রাণে বেঁচে যায়। প্রথমে শের এ বাংলা মেডিকেল পরে সেখান থেকে নিটোরে রেফার। অপারেশন করে তার দুই হাতেরই তর্জনী আর বৃদ্বাঙ্গুলী ছাড়া সব ফেলে দেয়া হয়েছে। হাড় বের হয়ে আছে। ২য় বার অপারেশনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এই অল্প বয়সে তার হাতের এই অবস্থা। মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
দুপুরের দিকে একজন মহিলা জরুরী বিভাগে আসলো। তার হাত কনুইএর উপর থেকে নাই। ছাপটি কারখানায় কাজ করছিল। সময় মত হাত সরাতে না পারায় মেশিনে তার হাত কেটে গেছে। কিছু টাকা আর একজন লোক দিয়ে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। (ছাপটি কারখানাটা কি আমি নিজেও বুঝি নাই। সম্ভবত কোন ধরণের ডাইস মেশিন।)।
এই অবস্থায় দুইদিন থেকে অপারেশন না করিয়ে চলে আসি। আর কাজিনের অপারেশন খুলনায় করানো হয়।
ঢাকা ২
বন্ধুর ফোন, তার এক রিলেটিভ ইলেকট্রিক শকে মারা গেছে, যেতে হবে। পুরান ঢাকায় গেলাম তার সাথে। সেখানে কারখানার মালিকের সাথে কিছু আলাপ করে ঢাকা মেডিকেলে গেলাম।
এ আরেক জগৎ, লাশ কেনা বেচার জগৎ। দশ হাজার টাকায় ঠিক করা হল লাশ পোস্টমর্টেম করা হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১০:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



