কেন ফ্লাইওভার কোন শহরের যানজট দূর করতে পারে না
"কেন ফ্লাইওভার শহরের যানজট দূর করতে পারে না" একটি সাধারণ প্রশ্ন মনে হলেও এটির কারন কিন্তু মোটেই সাধারণ বিষয় নয় । বরং "যান চলাচলের ক্ষেত্রে এতে এমন সব কঠিন কঠিন বিষয় জড়িয়ে আছে যা সাধারণ বুদ্ধির মানুষ বুঝতেই পারবে না । শহরের মাঝে রাস্তা এবং রেল লাইনের বা দুই তিনটি বড় রাস্তার ক্রসিং থাকলে হলে এবং সেখানে ফ্লাই-ওভার নির্মান করা হলে ঐ স্থানের যান জট কমে যায়, এটি আমাদের সাধারন অভিজ্ঞতা । কিন্তু একটি শহরের স্বাভাবিক ধারন ক্ষমতার বেশী গাড়ী হলে এই অতিরিক্ত গাড়ী এবং শাখা পথ থাকার কারনে যে যানজট হয় তা কোন ভাবেই ফ্লাই ওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে সমাধান করা যায় না । তবে অনেক উন্নত দেশ তাদের নিজেদের স্বার্থে দরিদ্র এবং/অথবা অনুন্নত দেশে এই গুলি নির্মানের প্রস্তাব দেয় । আবার অনেক অনুন্নত দেশের একনায়কেরা তাদের নিজেদের স্বার্থে এই ধরনের ব্যয় বহুল এবং যেখানে দেশের বাইরে গোপনে অর্থ লেনদেনের সুযোগ আছে এমন প্রকল্প গ্রহন করা থাকে ।
ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রে নাইজিরিয়ার উদাহণ দেয়া যেতে পারে । সেখানে তাদের পুরাতন রাজধানী ল্যাগোস-এ অনেকগুলি ফ্লাই ওভের নির্মান করা হয় । লম্বা ফ্লাই ওভারের এমনই মহিমা যে একটি নির্মান নির্মান করা হলেই সেটি কার্য্যকর রাখতে আরো অনেকগুলি ফ্লাই ওভার নির্মান করতে হইয় । ল্যাগোসেও তাই করা হয়েছিল, যার ফলে কোথাও কোথাও একটির উপর আর একটি করে চার স্তর পর্য্যন্ত রাস্তা নির্মান করা হয়েছিল । এর আগে যানজট কমানোর জন্য সেখানে একদিন পর পর জোড় বেজোড় সংখ্যার গাড়ীও প্রবর্তন করা হয়েছিল । সকলই ব্যর্থ । শেষকালে বিদেশী উপদেষ্টারা বললো- নতুন জায়গায় রাজধানী কর । নাইজিরিয়ার নতুন রাজধানী এখন আবুজা ।
উপরে ফ্লাই ওভারের সাথে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কথা বলা হয়েছে । এই দুইটির পার্থক্য হচ্ছে, ফ্লাইওভারে কোন রাস্তা কখনই চলমান গাড়ীর সম্মুখগতি বাধাগ্রস্থ করবে না, যার জন্য বিভিন্ন উচ্চতায় একাধিক রাস্তা নির্মান করতে হয় । এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে ঠিক মাটিতে নির্মিত রাস্তার মতই, এগুলি শুধুমাত্র কিছুটা উচ্চতায় নির্মান করা হয় ।
শহরের রাস্তায় যখন গাড়ী চলে তখন তার দুটি গন্তব্য থাকে । (এক), সে দূরে যেতে চায়, (দুই), সে এক বা বহু জায়গায় থামতে চায় । বাস যেখানে স্বপ্ল সময় থামে, গাড়ির মালিককে সেখানে দীর্ঘ সময় থামতে হতে পারে । শহরের মাটির পথ এই দুইটি সুযোগই দিয়ে থাকে, কিন্তু ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে শুধুমাত্র প্রথম সুযোগটি দিয়ে থাকে । মজার কথা, ফ্লাই ওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়েতে শাখা রাস্তা না থাকায় বা খুব কম থাকায় গাড়ী অনেক দ্রুত যেতে পারে । এর ফলে একটি শহরের মাটির রাস্তায় যত গাড়ী চলাচল করতে পারে, ফ্লাই ওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মান করা হলে তার চাইতে অনেক বেশী গাড়ী চলাচল করতে পারে । কিন্তু এই গাড়ীগুলির সবারই কিন্তু দ্বিতীয় উদ্দেশ্য আছে, যা হলো, শহরের কিন্তু এক বা বহু জায়গায় থামা। তাই কোন না কোন সময় এদের সবাইকে নীচে নেমে আসতে হয় । আর তখন নীচের রাস্তা গাড়ীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায় । নাইজিরিয়ার লাগোসে এই অবস্থা হবার পর রাস্তায় সামনের গাড়ির এক বা দুই ফুট দূর দিয়ে পিছনের গাড়ী চলাচল করতে থাকে । গাড়ী চলাচলের সাধারণ নিয়ম "বড় রাস্তার গাড়ী আগে যাবে, শাখা রাস্তার গাড়ী পরে যাবে" । কিন্তু উপরের অবস্থা হবার পর সেখানে নিয়ম করা হয় "বড় রাস্তার গাড়ী পরে যাবে, শাখা রাস্তার গাড়ী আগে যাবে, শাখা রাস্তার গাড়ি বড় রাস্তায় নামার পরেই কেবল বড় রাস্তার গাড়ী চলতে পারবে" । আমাদের দেশেও ফ্লাই ওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে চালু হবার পর এই নিয়ম চালু করতে হবে । আগেই বলেছি, "যান চলাচলের ক্ষেত্রে এমন সব কঠিন কঠিন বিষয় আছে যা সাধারণ বুদ্ধির মানুষ বুঝতেই পারবে না" । উপরের নিয়মটি উলটে দেবার পেছনে এমনই একটি গুরুত্ব পূর্ণ কারন আছে । বুদ্ধিমান লোকেরা বুঝতে পারবেন, নিয়মটি উলটে না দিলে শহর স্থবির হয়ে যাবে । এত কিছুর পরেও অগনতান্ত্রিক দেশের সরকারেরা বড় প্রজেক্ট এর কমিশন থেকে নির্বাচনী ব্যয় সংগ্রহের জন্য এসব পদ্ধতি গ্রহন করে থাকে ।
অধ্যাপক বিজন বিহারী শর্মা ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ২:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


