হারিয়ে যাওয়া আমাদের "হাপ্পুত সঙ্গীত" ও উদীয়মান বিদেশী "আকাপেল্লা" বিজন বিহারী শর্মা
"ভুলি দেশের ঠাকুর, ভজি বিদেশী ঠাকুর" - এই কথাটি বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রযোজ্য । সঙ্গীতের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে একসময় ছিল কবির গান, জারী গান, সারী গান ইত্যাদি আরো কত কি । এগুলির অনেকগুলি এখন দূর অতীত হয়ে গেলেও এগুলির কিছু কিছু এখনও আমাদের মনে আছে । কিন্তু আমাদের একটি সঙ্গীতের ধারা যা চর্চার অভাবে একেবারে বিলীন হয়ে গেছে । এটি হলো "হাপ্পুত সঙ্গীত" ।
হাপ্পুত সঙ্গীত গাওয়া হতো শুধুমাত্র একজন মানুষের দ্বারা । এখানে কোন বাজনা ব্যবহার করা হতো না । বাজনার বিকল্প হিসেবে গায়ক তার শরীরের নানা অংশ (যেমন বগল, মুখ, শরীরের বিভিন্ন স্থানে চড় মারা ইত্যাদি) থেকে নানা ভাবে শব্দ সৃষ্টি করতো । গানের কথার মধ্যে থাকতো প্রধানতঃ মানুষের আগ্রহ জাগানো নানা কথা, যা বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন রকম হতো । যাদের বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায় তাদের অনেকে এই হাপ্পুত সঙ্গীত শুনে থাকবেন । গায়ক গলা দিয়ে প্রধানতঃ একটি সুরে গান গাইতো, সেই সঙ্গে বগল বাজিয়ে প্রধানতঃ তাল ঠিক রাখার যন্ত্রের কাজটি করতো, একই সময় গানের ফাঁকে ফাঁকে আরো এক বা দুইটি যন্ত্রের শব্দ তৈরী করতো । যে কোন মানুষ এট করতে পারে না । এর জন্য চর্চা এবং প্রতিভা দুইয়েরই প্রয়োজন হয় । এই সঙ্গীত শুনে গ্রামে প্রায় সবাই এভাবে গান করার চেষ্টা করতো । কিন্তু তাদের মধ্যে খুব মানুষই সফল হতো । যারা হাপ্পুত সঙ্গীত শুনেছেন তারা জানেন, এই কাজটি করা কিন্তু বেশ কষ্টকর ।
মানুষের স্বাভাবিক প্রবলতা হলো, মানুষ নিজেদের জিনিসকে যত্ন করে, উতসাহ দিয়ে, সহযোগিতা দিয়ে তাকে উন্নত করার চেষ্টা করে । তারপর তাকে বিশ্বসমাজে পেশ করে গর্ব অনুভব করে । তারা জানে, পরবর্তীকালে অগুলি তাদের সন্মান বা মর্য্যাদা বাড়ায়, এমনকি কোন কোন সময় দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখে । আমরা জানি, জাপানীরা ছোট ছোট কাগজের টুকরা দিয়ে কতকগুলি ফালতু জিনিস তৈরী করার কাজ, কোন বিশেষত্ব বা সৌন্দর্য্য বিহীন এক ধরনের ফুল সাজানো, কতগুলি বহুল ব্যবহৃত নীতিকথা যা দীর্ঘকাল মানুষ নানা ভাবে বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করেছে তাকেই একটু গ্রন্থিত ভাবে ব্যবহার করে "উন্নয়নের পথ" হিসেবে তাদের দেশের কোন কোন লোকের নামে চালানোর চেষ্টা করছে । ভারতের যোগব্যায়াম এবং ধ্যানকে পশ্চিমে নিয়ে তাকে বিকৃত করে এবং নানা ডাল পালা লাগিয়ে "ইয়োগা ও মেডিটেশন" নামের অর্থকরী ব্যবসার কথাও আমাদের অজানা নয় । এই যখন বিদেশীদের প্রচেষ্টা তখন আমরা কি করছি ? আমাদের দেশের সেই সব জিনিস যা একসময় এদেশের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্যতা রাখে, তাও আমাদের অবহেলায় নষ্ট করে ফেলি । এই না হলে আর আত্মঘাতী বাঙ্গালী ।
এবারে আমাদের আলোচনা, বিদেশের "আকাপেল্লা সঙ্গীত" । বিদেশে সমাদৃত এবং বিখ্যাত হয়ে এখন আমাদের দেশেও প্রবেশ করেছে । আকাপেল্লা সঙ্গীতের জন্ম ঠিক কি ভাবে হয়েছে তা কারো সঠিক কারো জানা নেই । তবে মনে হয় অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রকৃয়ার এটির জন্ম হয়েছে । ধরা যাক, কয়েকজন বন্ধু একটি গান বাজনার দল গড়ে তুলেছে । এখন ধরা যাক, এই বন্ধুরা অনেক সময় এমন জায়গায় যায় ( যেমন, নৌকায় সাগরের মাঝে, বনে জঙ্গলে, মরুভূমিতে ইত্যাদি) যেখানে তাদের বাজনাগুলি নেয়া সম্ভব হয় না । তাই বলে কি গান থেমে থাকবে ? মনে হয় এমন অবস্থায় কোন একটি দল উদ্ভাবন করে এই আকাপেল্লা, যেখানে এক বা দুই জন খালি গলায় গান গায়, বাকী বন্ধুরা মুখ দিয়ে সকল বাজনার শব্দ তৈরী করে । সম্ভবতঃ এই ভাবেই আকাপেল্লা গানের শুরু । এই সঙ্গীত রীতি এখন দুর্গম নির্জন স্থান থেকে সঙ্গীতের মঞ্চে ঠাই করে নিয়েছে । প্রতি বৎসর সেসব দেশে আন্তর্জাতিক ভাবে এই গানের প্রতিযোগিতা হয়, পুরস্কার প্রদান করা হয় ।
স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা যায়, সাধারণ ভাবে বাজনা সহ গানের সাথে তূলনা করলে আকাপেল্লা গান ঠিক সমমানের হবে না । কিন্তু সাধারণ গানের তূলনায় এর যে অনেকগুলি ভালো দিক আছে তা মানতেই হবে । যেমন সঙ্গীত দলের বন্ধুরা যারা গান বাজনাকে বিনোদন অথবা অর্থোপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন তারা অনেক সময় এমন স্থানে থাকেন যেখানে তাদের বাজনাগুলি নেয়া সম্ভব হয় না । আকাপেল্লা জানা থাকলে এসব স্থানে তারা রিয়ার্সাল হিসেবে সঙ্গীতের চর্চা করতে পারেন । এতে তাদের সময়ের অনেক সদ্ব্যব্যবহার হতে পারে । অনেক সময় মানুষের মনে ইচ্ছে হয়, পারিবারের সবাই মিলে গান গাই । কিন্তু গলা ভালো না থাকা বা চর্চার কারনে দেখা যায়, এক বা দুজন গান গায় অন্যরা দর্শকের ভূমিকা পালন করে । আকাপেল্লা এই সমস্যার সুন্দর সমাধান দিতে পারে । বলাবাহুল্য আকাপেল্লায় যারা বাজনাদারের ভূমিকায় থাকে তাদের ভালো গলার প্রয়োজন হয় না । বিদেশে এভাবেও আকাপেল্লার প্রচলন হচ্ছে । হয়তো বা এইসব সুবিধা থাকার কারনেই আকাপেল্লা এখন বিদেশে একটি স্বীকৃত সঙ্গীত ধারা ।
আমাদের দেশেও আকাপেল্লার বিরাট সুযোগ রয়েছে । পরিবারের সবার একত্র হয়ে গান গাওয়া একটি অত্যন্ত আনন্দজনক অভিজ্ঞতা, যেখানে সবারই অংশগ্রফনের সুযোগ থাকে, এবং সামর্থ্যের বিভিন্নতা স্বত্বেও সবাই ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার প্রমান দিতে পারে । এটি একট সৃষ্টি ধর্মী কাজ, যা প্রায় বিনা খরচায় করা যায় । বিনোদন হিসেবে এটি নীরস টেলিভিশন দেখা বা অতীত বর্তমান এবং কাল্পনিক ভবিষয়ত নিয়ে জাবর কাটার চাইতে অনেক ভালো । একটি উদাহরণ দেয়া যাক । ধরা যাক, বাড়ীর কর্তা টেলিভিশনে খবর দেখছেন গিন্নী 'কর্তা কখন ঘরে যাবে' সেই অপেক্ষায় আছেন সিরিয়াল দেখার আশায়, ছেলেটি তার ঘরে ইন্টারনেটে কাজ করার নামে একটু গোপন ধরনের কিছু দেখছে, মেয়েটি ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুকে অর্থহীন লাইক দিয়ে চলেছে । এমন দৃশ্য আমাদের পরিচিত । ধরা যাক, এই পরিবারের মাথায় এলো আকাপেল্লার ভূত । সময় কাটানোর বিকল্প হিসেবে এখন কর্তা, গিন্নী, ছেলে মেয়ে সবাই মিলে গাইতে পারে যন্ত্র বিহীন আকাপেল্লা । এখানে সবাই অংশগ্রহনকারী, কেউ অলস দর্শক নয় । গান ভালো হলো কি মন্দ হলো সেটা এখানে বড় কথা নয় । বড় কথা হলো পরিবাবের সবাই মিলে সৃষ্টিশীল একটা কিছু করা । আকাপেল্লার মতন চমৎকার আর সৃষ্টিশীল জিনিস আর ক হতে পারে ? পরিবাবের সবাই মিলে একটা কিছু সৃষ্টির এই আনন্দ তাদের পরিবারের সবার । আর এটা তারা সবার সীমিত সামর্থ দিয়েই করেছে ।
লজ্জার বিষয়, বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীতে নতুন জিনিস সৃষ্টিতে তেমন কোন ভূমিকা পালন করে নি, তারা কেবল অন্যের ভোগ করেই গেছে । "আদেখলে" (এটির বাংলা প্রতিশব্দ - হাদিগিল্লা), হবার কারনে তাদের অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখা ইতিমধ্যেই এই নিরীহ যন্ত্রটিকে "বোকার বাক্স" নামে অভিহিত হতে বাধ্য করেছে । শুধু অন্যের কাজ দেখা বা শোনার পরিবর্তে নিজেরা কিছু সৃষ্টি করা যে ভালো (এমন কি তা একটু খারাপ মানের হলেও), তা বাঙ্গালীর বুঝতে এখনও অনেক বাকী । সেই সব বিদেশী যারা নিজের সৃষ্টি বা উদ্দোগকে বেশী মূল্য দিতে অভ্যস্ত তারা ইতিমধ্যেই যথোপযুক্ত কারনে আকাপেল্লার কদর বুঝেছে । বিনোদন এবং সময়ের সদ্ব্যবহারে্র বাইরে তারা এটিকে বানিজ্যক ভাবে ব্যবহারও করেছে । এই যখন তাদের অবস্থা তখন আমরা, বাঙ্গালীরা আমাদের নিজেদের একটা সম্ভাবনাময় সম্পদকে পায়ে ঠেলে বিলুপ্ত করে দিয়েছি । হ্যা, আমি হারিয়ে যাওয়া হাপ্পুত সঙ্গীতের কথাই বলছি । দুদিন পরে বিদেশীরা যখন তাদের আকাপেল্লার দল নিয়ে আমাদের দেশে আসবে, হাপ্পুত সঙ্গীত থাকলে আমরা তখন আকাপেল্লার প্রত্যুত্তরে আমাদের দেশীয় সম্পদ হাপ্পুত সঙ্গীত শুনিয়ে দিতে পারতাম।
আকাপেল্লাকে সঙ্গতঃ কারনেই আমরা এদেশে স্বাগতম জানাবো । যখন আমরা এটা করবো, তখন কি আমাদের নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সম্পদ হাপ্পুত সঙ্গীতের জন্য আমাদের একটু কষ্টও লাগবে না ? অবহেলায় এটিকে বিলুপ্ত করার জন্য আফসোস হবে না ?
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


