somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার বাবা

১৮ ই জুন, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিয়ের আগের রাতে খালামনিকে মিথ্যে বলে ডেকে নিয়ে গেলো মনির নামের একজন। এলাকায় তার প্রভাব খুব। বড় ভাই ওই এলাকার চেয়ারম্যান। তখন তাদের ভয়ঙ্কর দাপট এলাকায়। তাদের নামে থানায় কোন মামলা হতো না। রাজনৈতিক কারনে মামলা হলেও পুলিশ বাসায় আসার আগে কল দিয়ে জানিয়ে দিতো "আমাদের দায়ীত্ব পালন করতে আপনার বাসায় তল্লাশী চালাতে হচ্ছে, বিকেল অব্দি একটু সরে থাকবেন অথবা আজ রাতে আপনার বাসায় তল্লাশী হতে পারে, আজ রাত টা অন্য কোন জায়গায় থাকবেন।" তাদের কথায় এলাকার লোকজন উঠে বসে। সারাদিন ধরে আমাদের বাসায় বিয়ের আয়োজন চলছিলো। রাত ফুরোলেই ময়মনসিংহ থেকে রুপক মামা (বর) সবাইকে নিয়ে আসবে। বিয়ে হবে। সেই উল্লাসে বাড়িতে মেহমান আসা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যের পর পাশের বাড়ির শান্ত মামা এসে বললো "রুপা, জেঠিমা তোমাকে একটু যেতে বললো।"

খালামনি তখন আমাকে কোলে নিয়ে সাবিত্রী দিদির সাথে গল্প করছিলো। মা কে বলে আমাকে আর সাবিত্রী মাসিকে নিয়েই রওনা হলো তার জেঠীমার কাছে। আমাদের বাড়ির পর একটা পুকুর, তারপর দুটো বাড়ি(মনিরদের), তারপরেই জেঠিমার বাড়ি। মনিরদের বাড়ি পর্যন্ত যাবার পরপরই মনির সামনে এসে দাঁড়ালো। আমাকে কোল থেকে নিয়ে সাবিত্রী দিদির কোলে দিয়ে খালামনিকে হাত ধরে টেনে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলো। পিছু পিছু সাবিত্রী দিদি। বাড়ির গেট বন্ধ করে দেয়া হলো। ভিতরে আরো কয়েকজন লোক। একজন দাড়িওলা পাঞ্জাবী টুপি পড়া (কাজী সাহেব) লোক ও বসা। বিয়ে হলো। খালামনি কে সহ সাবিত্রী দিদি আর আমাকে পাঠিয়ে দিল আমাদের বাড়িতে। শান্ত মামা এসে দিয়ে গেলো। অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় মা চিন্তা করছিলো। তবে খালামনি আর সাবিত্রি দিদির ফ্যাকাশে মুখ দেখে বুঝার আর বাকী রইলো না। তখন মোবাইল নামক জিনিস টা না থাকায় তাদের কে খবর দেয়া সম্ভব হয়নি।পরদিন বরযাত্রী এসে ফিরে গেলো। রুপক মামা রয়ে গেলো তবুও খালামনির উত্তরের আশায়। ছোট থেকেই খালামনিকে পছন্দ করতো। দুদিন পর রুপক মামাও ফিরে গেলো। আমার বাবার ও ইচ্ছে ছিলো রুপক মামার কাছেই বিয়ে দিবে। ইচ্ছে পুর্ণ হলোনা। খালামনির সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো।

২০০৪ সালের শেষের দিকে। আমি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। ফুপু একদিন চাচীকে দিয়ে খবর পাঠাল। তার আদরের বখাটে আদুভাই ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিতে চায়। আমার মা আর খালামনি রেগেমেগে অস্থির। এখনি তো বিয়ের বয়স হয়নি। এমন ধনীর দুলালের কোন প্রয়োজন নেই। শুধুই টাকার বাহাদুরি হলে তো চলবেনা। শিক্ষা, শিষ্টাচার, ভদ্র, ভালো ছেলে ছাড়া হবেনা। এই নিয়ে চললো ঝুট ঝামেলা। বাবা বলে বসলো "আমার মেয়ে, আমি কোথায় বিয়ে দিবো না দিবো তাতে রুপার কি?" লোক মারফত আমার মতামত জানতে চাইলো। আমি চিন্তা করলাম এই ছেলেকে তো আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারবোনা। বাবার কথা মেনে নিলে এই বিয়েই করতে হবে। পড়াশুনা গোল্লায়। তাছাড়া খালামনির উপর আমার সম্পুর্ণ ভরসা আছে। জানিয়ে দিলাম " এই বিয়ে সম্ভব না।" সেদিন থেকে আমার সাথেও কথা বন্ধ হয়ে গেলো।

খালামনির বাসায় থেকেই পড়াশুনা করতে হলো। আমি বাড়ি গেলে তিনি বাড়ি থাকতেন না। বাবা বাড়ি থাকা অবস্থায় আমি গেলে, তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন। ২০০৭ সালে এইচ এস সি রেজাল্ট যেদিন বের হলো বাজারে বকুল স্যারের সাথে বাবার দেখা। বাবাকে বললেন "আপনার মেয়ে তো ভালো রেজাল্ট করেছে, মিষ্টি কোথায়?" বাবা একবাক্যে উত্তর দিয়েছিলেন "আমার কোন মেয়ে নেই।" কতো সহস্রবার বাবা বাবা বলে পিছন থেকে ডাকতে ডাকতে অনেক দূর অব্দি হেঁটেছি। তিনি নিশ্চুপ। যেনো আমাকে চিনেনই না। তিনি এখন আলাদা বাড়িতে থাকেন। এখনো বাড়ি গেলে পথে যদি কখনো দেখা হয়ে যায় মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে করে চলে যায়। বাবার কোন ছবি নেই আমার কাছে। ব্যবসার লাইসেন্স এর ফাইল থেকে ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপিটার একটা কপি নিয়ে রেখে দিয়েছি। মন চাইলে সেটাই দেখি। মাস খানেক আগে শুনেছিলাম বাবা নাকি এক্সিডেন্ট করেছে। পায়ে সেলাই লেগেছে। অপরিচিত নাম্বার থেকে কল দিলাম। রিসিভ করলো। হ্যালো না বলেই সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম "তুমি নাকি এক্সিডেন্ট করেছো? খুব বেশি কি? কয়টা সেলাই লেগেছে?" উত্তর না দিয়ে জানতে চাইলো "আপনি কে?" নাম বললাম। শুনেই কেটে দিলো।

আজ বাবা দিবস। অনেকেই তাদের বাবাকে নিয়ে ছবি আপলোড দেয়। আমিতো পারিনা। আপলোড তো বহুদুর, বাবাকে নিয়ে ছবি তুলতে পারিনা।সবার মতো করে বাবার সাথে কথা বলতে পারিনা। বাবারা নাকি তাদের মেয়েকেই সবচেয়ে বেশি আদর করে। আদর পেয়েছি তো। ছোটবেলায় বাবা আমাকেও বাবা বলে ডাকতো। কখনো নাম ধরে ডাকতে শুনিনি। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে বাবার সেই ডাক শুনি ঃ- বাবা, বাবা............
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:০৭
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড় আমি ভালোবাসি

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩

পাহাড় আমি ভালোবাসি
...........................................



চললাম তবে তোমার সাথে,
হাতটি রেখে হাত বাড়াতে।
পিছুটানের বাঁধন ছিঁড়ে,
হারাবো ওই মেঘের ভিড়ে।

পাহাড় চূড়ায় রোদের হাসি,
শুনছো ! তোমায় ভালোবাসি।
চলবে নদী আপন বেগে,
নতুন কোনো আশার মেঘে।

ইচ্ছেগুলো পাক না ডানা,
আজকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাসিত নক্ষত্রের শহর !

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯



রাতের শেষে যে শহর জেগে থাকে
তার ভাঙা নীয়ন আলোয়
আমি দেখেছি মানুষের মুখ—
অথচ দেখিনি মানুষ ।
দেখেছি ক্লান্ত আত্মারা,
ধীরে ধীরে আত্মহুতি দেয় প্রতিরাতে।

চারদিকে শব্দ ছিল,
হাজার কথার বিষাক্ত ভিড় ছিল,
কর্পোরেট... ...বাকিটুকু পড়ুন

"তোমরা আমাদের মানুষদের কেন খুন করলে?"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০১

জাপানের মানুষেরা আজও বুঝতে পারে নাই, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের এভাবে হত্যা করা হলো। সেই দেশের মুরুব্বীরা এখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন। আক্ষেপ করেন। আমার বোনের জামাই জাপানে পোস্ট ডক... ...বাকিটুকু পড়ুন

শত্রুর শত্রু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৪

উগ্রবাদী আর উদারবাদী, দুটি ইসলামই একই রাজনীতি করে। তাবলীগ জামাতের লোকটি মাঠে এসে বলে মেয়েদের ফুটবল হারাম। তারপর বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে সমর্থন করে রাস্তায় নামে। এই দুটি আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×