আলহামদুলিল্লাহ! প্রসংশা সেই মহান সত্বার যিনি আমাকে আজ নিরাপদে স্বপরিবারে ঘরে ফিরিয়ে এনেছেন। ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফেরার জন্য প্রচন্ড তাড়া ছিল। আবহাওয়ার খবর নেওয়ারও সময় পাইনি। যথারীতি সকাল ৭ টার বাসে বাগেরহাট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে আমার স্ত্রী, দুই সন্তান (৮ ও ২.৫ বছর) ও বাসার কাজের মেয়েটা (১২ বছর) কে নিয়ে রওনা হলাম। সকাল ১১ টার মধ্যে আমাদের বাস কেওড়াকান্দি পৌঁছে গেল। আমি সময় বাঁচাতে সর্বদা লঞ্চ পারাপারে টিকিট কাটি কারন ফেরী পার হতে অনেক লম্বা লাইন থাকে, বিশেষ করে ঈদের সময় ফেরী ঘাটের ৩ ঘন্টার স্বাভাবিক জার্নি ব্রেক অনেক সময় ৭/৮ ঘন্টাও লাগিয়ে দেয়।
লঞ্চে উঠে টের পেলাম নদীর বুকে বেশ জোরে বাতাস বইছে। ছোট ছেলেটার জ্বরে বেশ অসুস্থ ছিল। সকাল থেকে আমরা সামান্য কিছু খেলেও ও গতকাল থেকে কিছুই মুখে দেয়নি। ওরা চারজন ডেকের ভিতর লম্বা টুলে আর আমি লঞ্চের বারান্দায় রেলিং ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটাকে ওর মা মুড়ি মাখা খাওয়াচ্ছিল হঠাৎ দমকা বাতার আর ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ছটা দক্ষিন দিকের যাত্রীদের ভিজিয়ে দিতে শুরু করল। যাত্রীরা তাড়াহুড়া করে সবাই উত্তর দিকে চলে এল। সেই সংগে লঞ্চটা বাম দিকে বেশ খানিকটা কাত হয়ে পড়ল। নদীর গভীরে উত্তাল ঢেউ দেখে আমার বুকের ভিতর ছ্যাৎ করে উঠল। এদিকে আমার অবুঝ শিশুর পেটে দুই দানা খাবার পড়তেই দুষ্টামি শুরু করে দিল। আমাকে বার বার কাছে ডেকে জানলা থেকে গলা বাড়িয়ে বার বার বিনা কারনে আমাকে চুমু খেতে লাগল। একদিকে লঞ্চের ভারসম্যহীনতা আর অন্যদিকে ছেলে অযাচিত চুমু আমার চোখের কোনে পানি জমিয়ে দিল। আমি দেখতে পেলাম সকলের মুখে কেমন আতংকের ছাপ। যাত্রীদের বার বার লঞ্চ কর্তৃপক্ষ ডান পাশে যাবার জন্য অনুরোধ করছিল যেন ভরসম্য বজায় থাকে কিন্তু কার কথা কে শোনে? দোলুনি যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করল আর আমার বুকের হার্টবিট। মাথার মধ্যে টাইফুনের গতিতে হিসাব কষেচলেছি আল্লাহ না করুন যদি লঞ্চের কিছু একটা হয় তাহলে কিভাবে আমার দুই সন্তান ও তার মাকে সেভ করব। কাজের মেয়েটা সাঁতার জানে কিন্তু বাকি তিনজন? আল্লাহর কাছে দোয়া পড়তে শুরু করেছিলাম অনেক আগে থেকেই "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুম মিনাজ জলেমীন" "বিসমিল্লাহী মাজরিহা অমুরসাহা ইন্না রাব্বি লা গাফুরুর রাহীম"
বার বার মনের মাঝে একটা কথাই ভেসে উঠলিছ, হঠাৎ আমার অবুঝ ছেলে কেন আমাকে এতগুলো চুমু খাচ্ছে? তাহলে কি সামনে বিপদের হাতছানি? এই চুমুই কি আমার জীবনের শেষ চুমু? এত ভয় পেতাম না যদি না আমাদের আগের লঞ্চটা মাঝ নদীতে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে না যেত। এতগুলো মানুষের সলিল সমাধী কিছুতেই মাথাটাকে ঠিক রাখতে পারছিল না। চতুরদিক থেকে ফোন আসতে শুরু করল, কারন স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদৌলতে মাওয়ায় লঞ্চ ডুবির খবর প্রায় সকলের কানেই পৌঁছে গেছে।
অবশেষে আল্লাহ পাক আমাদের নিরাপদে নদীর কূলে পৌঁছে দিলেন। সেই সাথে শেষ হল আমার বিভীষিকাময়ে পার হয়ে যাওয়া ৩০টি মিনিট। স্বাপরিবারে বাঁচার আনন্দে চোখের কোনে পানি চলে এল। লাখ লাখ শুকরিয়া আল্লাহ পাকের দরবারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



