somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা যা বলতে পারি না, সেখানে নীরবতাই উত্তম কথক

১৭ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'আমরা যে বিষয়ে কিছু বলতে অক্ষম, সেখানে নীরবতার কাছে সমর্পিত হওয়াই উত্তম'- এই কথা বলে নিজের থিসিস শেষ করেছিলেন বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত সেই অতি জটিল থিসিসটার শিরোনাম ছিলো -'ট্র্যকটাটাস লজিকো ফিলোসফিকাস'। বইটি পড়ে সবটা বুঝেছি - এই দাবি আজ পর্যন্ত কেউ করেছেন বলে জানা নেই, আমি তো কোন ছাড়! তবু, অনেকের কাছে শুনে, কৌতূহলবশত সেটি পড়তে পড়তে, কিছুটা বুঝে এবং বেশিরভাগ না বুঝে যখন মাথা এলোমেলো হবার অবস্থা, তখনই দেখি- তিনি তাঁর থিসিসের শেষ পঙক্তিতে পৌঁছেছেন এক আশ্চর্য বাক্য দিয়ে -

‘what we can not speak about, we must consign to the silence’

এই একটি বাক্যই আমাকে বুঝিয়ে দেয় - এক আশ্চর্য প্রতিভাবান মানুষের একটা বই আমি বুঝে হোক না বুঝে হোক, পড়ে শেষ করে ফেলেছি। আগ্রহ জন্মে তাঁর ব্যাপারে। নানা বইপত্র ঘেঁটে জানতে পারি, এ্যারোনেটিক ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি, সেখানেই গণিতের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং হাতে পান বার্টান্ড রাসেলের প্রিন্সিপলস অব ম্যাথমেটিক্স, যেটি তাকে দর্শন সম্পর্কেও উৎসাহী করে তোলে। রাসেল নিজেই ভিটগেনস্টাইনের সঙ্গে তার কথাবার্তার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, (ভিটগেনস্টাইন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন)-

‘Will you please tell me whether I am a complete idiot or not?’ (আপনি কি দয়া করে বলতে পারেন, আমি পুরোপুরি ইডিয়ট কী না!)

I replied, ‘My dear fellow, I don’t know. Why are you asking me?’(আমি তো জানি না! কেন একথা জিজ্ঞেস করছেন?)

He said, ‘Because, if I am a complete idiot, I shall become an aeronaut; but, if not, I shall become a philosopher.’(আমি যদি পুরোপুরি ইডিয়ট হয়ে থাকি, তাহলে ইঞ্জিনিয়ার হবো। তা না হলে দার্শনিক হবো!)

I told him to write me something during the vacation on some philosophical subject and would tell him whether he was a complete idiot or not. At the beginning of the following term he brought me the fulfillment of this suggestion. After reading only one sentence, I said him, ‘No, you musrt not become an aeronaut.’(আমি তাকে সামনের ছুটিতে দার্শনিক বিষয়ে কিছু একটা লিখে আনতে বললাম এবং জানালাম, ওটা পড়ে আমি তাকে জানাবো, সে ইডিয়ট কী না! ছুটিশেষে যথারীতি সে একটা লেখা আমাকে দেখালো, আর একটা মাত্র বাক্য পড়েই আমি তাকে বললাম - না, আপনি কোনোভাবেই ইঞ্জিনিয়ার হবেন না!)

কমপ্লিট ইডিয়ট হলে ইঞ্জিনিয়ার হবেন, আর না হলে দার্শনিক হবেন! রাসেলের এই স্মৃতিচারণ পড়ে ভীষণ মজার আর মধুর এক চরিত্র মনে হলো ভিটগেনস্টাইনকে। শুধু কি তাই, পিএইচডির জন্য থিসিসটি হাজির করার পর মৌখিক পরীক্ষার দিন তিনি তাঁর পরীক্ষকদ্বয় বার্টান্ড রাসেল আর জি ই মূরকে বলে বসেন, 'আমি জানি আপনারা এটা বুঝবেন না!' মৌখিক পরীক্ষার সময় পরীক্ষকদের কেউ একথা বলতে পারেন, এবং সেটি শুনেও পরীক্ষকরা তাকে ডিগ্রি দিতে পারেন - এটা বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। শুধু এখানেই নয়, তার চরিত্রের অদ্ভুতত্ব আরো অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়েছে। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি মনে করতেন, দার্শনিকের কোনো সম্পত্তির প্রয়োজন নেই! কেমব্রিজ ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রায় ছ-বছর গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। এই সময় কোলাহল এড়ানোর জন্য তিনি কিছুদিন এক সরাইখানার পরিত্যক্ত বাথরুমে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন! কেমব্রিজে ফিরে তিনি দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন বটে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে স্বেচ্ছায় সেই পদ ত্যাগ করে কাজ করলেন হাসপাতালে প্রথমে পোর্টার এবং পরে ল্যাবরেটরি এ্যাসিসটেন্ট হিসেবে।

তাঁর ওই থিসিসে মোট সাতটি প্রোপোজিশন ছিলো। শেষেরটি ছাড়া অন্যগুলোতে আবার সমর্থনমূলক প্রোপোজিশনও ছিলো। ব্যাপারটা এরকম : তিনি থিসিস শুরু করেছিলেন এইভাবে- ১. দি ওয়ার্ল্ড ইজ অল দ্যাট ইজ দা কেইস। [জগৎ হলো সমুদয় বাস্তব ঘটনা/অবস্থার সমষ্টি]

এই প্রোপোজিশনের সমর্থনে তিনি লিখলেন :

১.১ দি ওয়ার্ল্ড ইজ দা টোটালিটি অফ ফ্যাক্টস, নট অফ থিংস। [জগৎ হলো সমুদয় বাস্তব ঘটনা/অবস্থার সমষ্টি, বস্তুর সমষ্টি নয়।]

১.১১ দি ওয়ার্ল্ড ইজ ডিটারমিনড বাই দা ফ্যাক্টস, অ্যান্ড বাই দেয়ার বিইং অল দা ফ্যাক্টস [ জগৎ নিরুপিত হয় বাস্তব ঘটনা/অবস্থার দ্বারা এবং এইসব অবস্থার ফল দ্বারা!]
ইত্যাদি।

একেকটি প্রোপোজিশন ব্যাখ্যার জন্য তিনি অনেকগুলো করে সমর্থনসূচক প্রোপোজিশন লিখলেন বটে (যেমন : ৪, ৪.১, ৪.১১... ৪.৪৪১, ৪.৪৪২... ৪.৪৬৬১, ইত্যাদি), কিন্তু শেষ প্রোপোজিশন - ‘what we can not speak about, we must consign to the silence’-এর পরে আর কিছুই লিখলেন না!

মনে হয়, যেন, এতকিছু বলার পরও যে কথাগুলো বলা হলো না, সেগুলো সম্বন্ধে নীরবতা পালন করা ছাড়া উপায় নেই! নীরবতারও তো নিজস্ব একটা অর্থ আছে। যদি অনুবাদ করে নেয়া যায়, তাহলে নীরবতাই সর্বোত্তম ভাষা - এই কথা মনে হয়েছিল আমার, ওই অসামান্য লাইনটি পড়ে। আর জীবনে বারবার তেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে উচ্চারিত শব্দের চেয়ে নীরবতাই অধিকতর বাঙময় হয়ে উঠেছে।

নিঃসঙ্গ ছিলেন তিনি। ছিলেন চিরকুমার, বন্ধু-বান্ধবও ছিলো না কোনো। তাঁর চরিত্রের যে প্যাটার্ন, তাতে নিঃসঙ্গ থাকাটাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু এমনটি বলা হয় যে, তাঁর পরে পৃথিবীতে এমন কোনো দার্শনিক আসেননি, যিনি তাঁর সম্বন্ধে (পক্ষে-বিপক্ষে) দু-চার কথা লেখেননি! এমন গুরুত্ব কজন মানুষই বা পান?

ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিজ চিকিৎসকের বাড়িতে মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন : `Tell them, I’ve had a wonderful life!’ হ্যাঁ, wonderful-ই বটে। জীবন নিয়ে এইভাবে ছিনিমিনি কজন-ই বা খেলতে পারেন! কজন-ই বা বলতে পারেন -'হোয়াট উই ক্যান নট স্পিক অ্যাবাউট, উই মাস্ট কনসাইন টু সাইলেন্স!'
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ২:৪৪
৫২টি মন্তব্য ৪৩টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেল পাকলে কাকের কী?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২৫ শে মে, ২০২২ সকাল ১১:১৫

বন্ধু বান্ধব বিয়ে করছে। কিন্তু তাদের মনে অনেক দুঃখ। কত আশা ছিল সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করবে অথচ জুটছে মোটা, কালো সব মেয়ে। বর্ণবৈষম্য হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। তবে এটা কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্র রাজনিতি বন্ধ করতে হবে। বিশ্বের সভ্য কোন দেশেই ছাত্রদের লাঠিয়াল বাহিনি হিসেবে ব্যবহার করেনা।

লিখেছেন নতুন, ২৫ শে মে, ২০২২ সকাল ১১:২৭



দেশের ভবিষ্যত নেতা তৌরির কারখানা হিসেবে অনেকেই ছাত্ররাজনিতির দরকার আছে বলে ধারনা করে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্ররাজনিতিকদের কাজে বোঝা যায় সময় এসেছে বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার। ছাত্ররা বর্তমানে রাজনিতিক দলের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সত্যিকারের দেশপ্রেম কী?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে মে, ২০২২ দুপুর ১:২৬


বাংলাদেশে দেশপ্রেম বলতে আওয়ামীলীগের ক্ষেত্রে ভিন্ন মতের বিষোদগার করা, মাইকে গলা ফেটে বঙ্গবন্ধু গুনকীর্তন গাওয়া, বঙ্গবন্ধু কন্যার গুনকীর্তন করা, জাতীয় দিবসগুলোত ফুলদিয়ে শ্রদ্ধা করা এবং ভিন্নমতকে রাজাকার, দেশবিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতিচারণঃ নজরুল

লিখেছেন জাদিদ, ২৫ শে মে, ২০২২ দুপুর ২:১৮


ছবি সুত্রঃ shadow.com

নজরুলের মাহযাবঃ
আমি সাধারনত পাগল, ছাগল এবং আঁতেল এই তিন শ্রেনীর মানুষ দেখলেই সাথে সাথে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় তা সম্ভব হয় না, নুন্যতম ফরমালিটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

এত বড় কবি কেন দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পেলেন না?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৫ শে মে, ২০২২ রাত ১০:৪০



বাংগালীরা পড়তে ও লিখতে জানতেন না, যারা সামান্য লেখাপড়া জানতেন, তাঁদের বড় অংশ ছিলেন দরিদ্র, যাদের সামর্থ ছিলো, তারা বই কিনতো না; এই কারণে, কবির তেমন আয় ছিলো না। তখনকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×