গত ৩ জানুয়ারি থেকে গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ৫ জানুয়ারি পূর্বঘোষিত একটি কর্মসূচিতে যোগদানের উদ্দেশ্যে কার্যালয় থেকে বের হবার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে বিষাক্ত পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করে। সেদিনই দেশব্যাপী টানা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন ২০ দলের শীর্ষ নেতা বেগম জিয়া।
দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে কার্যালয়েই অবরুদ্ধ হয়ে আছেন তিনি। এর মধ্যে তাকে হত্যা ও তার কার্যালয় জ্বালিয়ে দেবার চেষ্টাও করা হয়েছে। পিস্তল নিয়ে কার্যালয়ের সামনে আসে সরকার দলীয় ক্যাডার। কার্যালয়ে নিক্ষেপ করা হয় ইট-পাটকেল। সর্বশেষ গত বুধবার তার বিরুদ্ধে জারি করা হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। এভাবে সরকার বিরোধী চলমান আন্দোলনে একের পর এক হুমকি-বাধা এলেও ভেঙ্গে পড়েননি আপোষহীন নেত্রীখ্যাত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
এরই মধ্যে চিরতরে হারান ছোট ছেলে কোকোকে। শোক আর সকল বাধাকে শক্তিতে পরিণত করে আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি রয়েছেন অবিচল। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবেও যেমন সুস্থ রয়েছেন, তেমনি মানসিকভাবেও বেশ শক্তি সঞ্চয় করেছেন বলে জানিয়েছেন চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
জানা গেছে গ্রেফতারের জন্য তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন এখনো আছেন। তার পাশাপাশি নিজের অনুপস্থিতিতে দল ও জোট পরিচালনায় করণীয় নির্ধারণ করে নেতাকর্মীদের জন্য নির্দেশনার একটি খসড়া তৈরি করেছেন ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
তাকে গ্রেফতার করলেই দেশব্যাপী শুরু হবে অসহযোগ আন্দোলন। এমনই নির্দেশনা রয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন নির্বাচনের দাবি আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিয়ে যারা জীবন দিয়েছেন এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সার্বিক খোঁজখবর নিতে নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
এক সূত্র জানায় আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে ইতিমধ্যে যারা নিহত আহত এবং মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে কারারুদ্ধ রয়েছেন তাদের ও তাদের পরিবারের সার্বিক খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া জন্য বিএনপি নেত্রী এ নির্দেশ দেন। দলটির শীর্ষ নেতা বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী সংশ্লিষ্ট এলাকার সাবেক এমপি ও সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের তিনি এ নির্দেশনা দিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কোন ব্যক্তি তার খবর নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে নিয়োজিত নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও উল্লেখ করেছেন খালেদা জিয়া। আরেক সূত্রে জানা যায় অন্যান্য দিনের মত গতকাল শনিবারও বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘিরে রাখে। ভেতরে কেউ যেতে পারছেনা। যারা আছেন তারাও বের হতে পারছেন না। গতকাল সন্ধ্যায় কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান গত ৫ জানুয়ারি সমাবেশে পুলিশ বাধা দেওয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন।
১১ জানুয়ারি থেকে ইট-বালু ভর্তি ট্রাক দিয়ে কার্যালয়ের মূল ফটকে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। এরপর ১৯ জানুয়ারি তা সরিয়ে নেওয়া হয়। এরইমধ্যে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর হঠাৎ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গত ২৭ জানুয়ারি গুলশান কার্যালয়েই প্রিয় সন্তানের লাশ গ্রহণ করেন তিনি। এ ঘটনায় খালেদা জিয়া বিমর্ষ হয়ে পড়লেও আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এরপর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। কর্মকর্তারা জানান, মা (খালেদা জিয়া) ছেলে মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না পারলেও আন্দোলনের প্রশ্নে অবিচল রয়েছেন। তিনি সব কিছু ঠিকঠাক মতোই করতে পারছেন। একই সঙ্গে কার্যালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দলীয় কর্মকাণ্ডের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত শোকের পরিবর্তে তিনি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সবল রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) সেই এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও যেমন আপোষহীন নেত্রীর ভূমিকা নিয়ে আন্দোলন করেছেন, ঠিক একইভাবে তিনি এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি অনেক শক্ত। খুব দৃঢ় তার মনোবল। গ্রেফতারি পরোয়ানাতে তিনি একটুও চিন্তিত নন। বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান খালেদা জিয়ার সঙ্গেই কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। এছাড়া নিকট আত্মীয়সহ ডাক্তাররা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। তবে এদের প্রবেশেও পুলিশ কড়াকড়ি আরোপ অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে নিজের অনুপস্থিতিতে দল ও জোট পরিচালনায় করণীয় নির্ধারণ করে নেতাকর্মীদের জন্য নির্দেশনার একটি খসড়া তৈরি করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গ্রেফতারের লক্ষ্যে তার কার্যালয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশব্যাপী ‘অসহযোগ’ কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। আর দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনে অনড় থাকবেন খালেদা জিয়া। দলটির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সূত্রটি জানায় দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালন করবেন দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর তারেক রহমানকে সহায়তা করতে দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে ইতিমধ্যে একটি সমন্বয়ক কমিটি গঠনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য সমন্বয়ক কমিটির তালিকায় রয়েছেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম আ স ম হান্নান শাহ নজরুল ইসলাম খান ড. আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান, আবদুল্লাহ আল নোমান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু শওকত মাহমুদ, সাংবাদিক শফিক রেহমান, মাহফুজ উল্লাহ প্রমুখ। বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনায়ই এ কমিটি চূড়ান্ত হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
জানা যায়, ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ওয়ান-ইলেভেনের সময় বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। ওই সময় দলের গঠনতন্ত্রে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিধান ছিল না। কিন্তু ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিধান রাখা হয়। অর্থাৎ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপার্সনের অবর্তমানে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানই দলের নেতৃত্ব দেবেন। এদিকে বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে দল ও জোটের কি করণীয় রয়েছে তা একটি ‘সংক্ষিপ্ত লিখিত বার্তায়’ প্রস্তুত করা হয়েছে। জানা গেছে- বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর তিনি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব স্তরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া অব্যাহত রেখেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও খালেদা জিয়ার পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাকে গ্রেফতারের পর যে কর্মসূচি আসবে তা পালনে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহ সভাপতি শাহ সরোয়ার হোসেন দৈনিক সংগ্রামকে বলেন আমরা খালেদা জিয়ার নির্দেশেই আন্দোলন করছি। রাজপথে পুলিশ ও সরকারি দলের ক্যাডারদের অব্যাহত হুমকি সত্ত্বেও মিছিল মিটিং চালিয়ে যাচ্ছি। যদি সরকার ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) গ্রেফতার করে তাহলে জনগণকে সাথে নিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ অচল করে দেয়া হবে।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান সোহেল বলেন, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও আগামীতে আরও কঠোর আন্দোলনের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার দাবিকে গণদাবি আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন- বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে পিছু হটবে না বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট।
এদিকে হরতাল-অবরোধ বন্ধ হরতাল-অবরোধে এসএসসি পরীক্ষা ও স্কুল কলেজ কেন খোলা রাখা হবে না- সে বিষয়ে জানানোর জন্য হাইকোর্টের দেওয়া একটি রুলের নোটিশ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে পৌঁছেছে। গতকাল শনিবার দুপুরে হাইকোর্ট শাখার এমএলএসএস মো. হেলাল উদ্দিন একটি রিট (নং-১৩৯৯) আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রুলের নোটিশটি গুলশান কার্যালয়ে নিয়ে আসেন।
খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের গণমাধ্যম শাখার একজন কর্মকর্তা নোটিশটি গ্রহণ করেন। ওই কর্মকর্তা বলেন রুলের নোটিশ গ্রহণ করা হয়েছে। নোটিশটি দেখে আইনজীবীর মাধ্যমে তার জবাব দেওয়া হবে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


