চাঁদের সাথে কথা বলঅর অভ্যাসটা কারো কারো বড্ড পুরোনো । আমারই আছে। পুর্ণিমা রাতে বাড়ির উঠানে মাদুর বিছিয়ে মনে মনে যে কতো কথা হয়েছে চাদেঁর সাথে তা কেবল চাঁদ আর আমিই জানি। আকাশ, পাখি , চাঁদ অসম্ভব নির্ভরশীল সঙ্গী। মনের কোণে জমে থাকা কষ্টের কথাগুলো শুনে উপহাসে প্রাণ ভরায়না
আমার বন্ধু নীলা। জীবনের ৯ টি বছর পাড় করে দিয়েছে চাদেঁর সাথে সুখ দুখের কথা শেয়ার করেই। প্রায় ১৬ বছর পর এক বাস স্টপে ওর সাথে দেখা হলো । সৌভাগ্যবশত দিনটিতে দুজনেরই ছুটি ছিলো। তাই দুই বন্ধৃ ঠিক করলাম আজ আর কোনো কাজ নয় । দীর্ঘ সময়ে মরীচা পড়া সম্পর্কটাকে একটু তাজা করে নেয়া যাক।
আসলে মোবাইল ফোনের বহুল ব্যবহার থাকলে হয়তো ১৬ বছর আগে আমরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতামনা। যাই হোক খুব ভালো লাগছিলো ছোটবেলার বন্ধুটাকে কাছে পেয়ে। তবে কেমন যেনো শুকিয়ে গেছে ও। সুন্দর , প্রফু্ল্ল একটি চোহারায় চোখের নীচে কালো দাগ পড়ে গেছে । বলাবাহুল্য ছোটবেলা থেকেই খুব মিষ্টি আর প্রাণচঞ্চল ছিলো নীলা। সংসার আর সঙ্গী নিয়ে ব্যাপক স্বপ্ন দেখতো , তাই বন্ধুরা ওকে ডাকতাম স্বপ্নময়ী বলে। ওর হাত ধরে জানতে চাইলাম ...”কেমন যেনো বিষন্ন দেখাচ্ছে তোকে , তুই ভালো আছিসতো নীলা’? পাথর চাপা আবেগটা যেনো টগবগে দুধের মতো উতলে পড়লো। আমাকে জড়িয়ে কাঁদলো খানিকক্ষণ। আমরা তখল ধানমন্ডি লেকের ছায়াময় একটি স্থানে বসে আছি। ওর পরের কথাগুলো শুনে আমিও আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না। বন্ধু হিসেবে সহ্য করা কঠিনও।
এইচএসসি পরীক্ষার পরপরই ভালোবেসে একজনকে বিয়ে করে নীলা। এক বছর চলে যায় পারস্পরিক মোহ আর আবেগে। এপরই ধরা পড়ে তার প্রাণের মানুষটার কাপুরুষতার চিত্র। কারণে অকারণে গায়ে হাত ওঠাতে শুরু করে । ধীরে ধীরে চিরচেনা মানুষটি বড্ড অচেনা হতে শুরু করে। যেনো এক পাশবিক নির্যাতনশালায় বন্দি হয় নীলা। খুব বড়াই করেছিলো বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের কাছে । তাই কাউকে জানতে দেয়না এসব কথা গভির রাতে সবাই ঘুমানোর পর দু:খ কষ্টের কথা শোনার একমাত্র সঙ্গী হয় চাঁদ।
এভাবেই দিনের পর দিন চলে যায়। দুই সন্তানের মা হয় নীলা। সন্তানের মুখে দিখে তাকিয়ে সবকিছুকে মেনে নেয় নিষ্ঠুর নিয়তি হিসেবে। এভাবেই পেরিয়ে যায় দীর্ঘ ৯টি বছর। একদিনতো বাড়িবাড়ি রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাকে। বিছানার সঙ্গীটি হিংস্র এক ডাকাতের মতো তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। আধমরা হবার পরই ছাড়া পায়। শেষপর্যায়ে সজোরে পেটে একটি ঘুষি দেয়ার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দুর্বল গঠনের মিষ্টি সেই মেয়েটি। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে আবিস্কার করে হাসপাতালের বিছানায়।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ৮৭ শতাংশ নারীই কোনো না কোনো সময় স্বামীর হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন। কখনো কখনো এর মাত্রা গড়ায় মৃত্যু পর্যন্ত । এরপর যদি সন্তান থাকে তাহলে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয় পারিবারিক সমঝোতায়। নারীর ভাগ্যই যেনো সমঝোতার মোড়কে ঘেরা। যখনই কোনো নারী এই মোড়ক ছিড়ে বের হতে চায় সমাজ কটুক্তি করে তাকে নিয়েই।
হয়তো তার চরিত্রে দোষ আছে, নাহলে স্বামী মারবে কেন? হয়তো পরকীয়া প্রেমে জড়িয়েছে, নাহলে সংসার ভাঙবে কেন?সমাজের এমন বিস্তর প্রশ্নের জবাব দিতে হয় নারীকেই । গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া কেউ প্রশ্ন তুলেনা পুরুষের এমন কাপুরুষিত আচরণ কেন? সবকিছুর পরও যদি শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসে নারী –সমাজের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তার ওপর । সমাজের কাছে সেই মেয়েটি পরিণত হয় সস্তা পণ্যে।
তাই বলবো নারীরাই পারে তার নিজের অবস্থানে পরিবর্তন আনতে। ‘স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত’ এ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে অপর সঙ্গীর সামনে নিজেকে সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে। তাহলেই হয়তো পাশবিকতার শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবে নারী।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০১৫ দুপুর ২:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




