আমার বাবা একটু উদাসীন। আসলে কখনো কখনো অনেক। গতকাল রাতে অফিসের কাজ শেষ করে গিয়ে ছিলো ধানমন্ডি। সেখানে আমার এক আংকেলের বাসায়। তখন রাত 10: 30। আংকেল আবার এ্যাডভোকেট মানুষ। খুব রসিয়ে রসিয়ে, ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলেন। অবশ্য আংকেল আমাদের একজন সম্মানিত ক্লায়েন্ট। আমার বাবা ত্রিশ বছর যাবত প্রকাশনা ও মুদ্রণ ব্যবসার সাথে জড়িত। বাবা নিজে ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। ভর্ািসটি লাইফেই ' কাশবন' নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা ( লিটল ম্যাগ সাইজ) প্রকাশনার সাথে জড়িয়ে পড়েন। কাশবনে কে না লিখতো? সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বদরউদ্দীন ওমর, নির্মলেন্দু গুণ...অনেকে। বাবার বাড়তি ঝোঁক ছিলো লেখালেখি! আর বাবার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ছিলো, লালন সঙ্গীত। বই প্রীতি ছিলো বাবার অন্যতম একটা গুণ। আমাদের বাসার বিশাল বুক শেলফই তার প্রমাণ। প্রায়ই বাবা অফিসের ফাকতালে বাংলাবাজার গিয়ে পছন্দের বই কিনে নিয়ে আসবেন। আমারতো স্কুল জীবন থেকেই নতুন বইয়ে গন্ধ ভালো লাগতো, তারপর বাবার এরকম হঠাৎ হঠাৎ কিনে নিয়ে আসা বইয়ের গন্ধ অদ্ভুত লাগতো আমার। বইয়ের প্রতি আজকের যতো মায়া ভালো লাগা সবকিছূই আমার এসেছে, সেই অদ্ভুত গন্ধটা থেকে। মাঝে মাঝে আমি বাবার গায়ের গন্ধ আর বইয়ের সেই গুমোট মায়াবী গন্ধটার মধ্যে তাল গোল পাকিয়ে ফেলতাম। আমার মনে হতো, আমার বাবাও একটা বই, জীবন্ত, আমার বন্ধু যেন।
কিন্তু বাবার বয়স হচ্ছে, আর আত্ম অসচেতনতা বাড়ছে। নিজেকে যেন এখনো হিরক রাজার দেশের বিদ্রোহী মাস্টার মশাই বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাহিত্য সাধনায়রত একজন আত্মকেন্দ্রিক নায়ক মনে করেন।
তো, আমার নায়ক বাবা, রাত 1টার দিকে ধানমন্ডি থেকে ট্যাক্সি ক্যাবে মিরপুর আসতে চাইলেন। কিছু হলো না, হঠাৎ করে সংসদ ভবনের কাছে, ট্যাক্সি ক্যাবওয়ালার কারসাজিতে তার সহোদরেরা এসে কাজটি করলেন। বাবার চোখ দুটো অকেজ না হলে এতো বিপদে পড়তেন না। মরিচের গুড়ো ভালোই ঢুকেছিলো চোখে। তারওপর আবার শারীরিক অত্যাচার, গলাটিপে ধরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চলে গেলো নগদ কিছু টাকা, সাধের মোবাইল ফোন। যেখানে ফোন করে মাও পাচ্ছিলেন না!
যাক, সকালে অফিসে আসার সময় দেখলাম, বাবা কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। লোকটাকে দেখে আমার মনে হলো, একজন নায়ক শুয়ে আছেন। তিনি আবার জেগে উঠবেন, এই টেনেটুনে হিসাব মেলানো জীবনের ডাকে, ব্যস্ত, অযথা কোলাহলময় নষ্ট নগরীতে।
যে যেখানে , যেভাবে থাকুন , ভালো থাকুন, ট্যাক্সি ক্যাবের ব্যাপারে সাবধান থাকুন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০