পর্ব ১
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারেরই নিজস্ব কিছু স্মৃতি আছে, অভিজ্ঞতা আছে। এরকমটা আমারো আছে। আমার বাবার কাছ থেকেই এর বেশির ভাগটা শুনেছি। আরো শুনেছি দাদু, নানা, খালু, ফুফা, চাচা এরকম আরো কয়েকজনের কাছ থেকে। আমি ভাবছি এই অভিজ্ঞতাগুলো একে একে লিখবো, যার বেশির ভাগটাই এখন আমার স্মৃতি। কারণ, যাদের কাছ থেকে শুনেছি, তাঁদের বেশির ভাগই আজ আর বেঁচে নেই!
প্রথমতঃ আমার বাবা, যিনি একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। একাত্তরে তিনি ডিগ্রী পড়তেন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। সায়েন্স গ্রুপে। জীববিজ্ঞান আব্বার অনেক প্রিয় বিষয় ছিল। আমাকে পরবর্তীতে এই বিষয়ের ব্যবহারিক বিষয়ে সাহায্য করেছিলেন। হাড়ের ছবিগুলো তিনিই এঁকে দিতেন, স্যার খুব পছন্দ করতেন সেই ড্রয়িংগুলো।
আমার বাবা সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। যুদ্ধ শুরু হলে সব প্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বা বলা যায় আমাদের পরিবার মুক্তিযুদ্ধপন্থী হওয়ায় কলেজ এড়িয়ে গিয়েছিল। আব্বার ভাষ্যমতে বাড়ির সাতজন যুবক তখন যুদ্ধে গিয়েছিলেন। চাঁদপুর – কুমিল্লা অঞ্চলের হয়ে ত্রিপুরায় ট্রেনিং এ গিয়েছিলেন, পরবর্তীতে আমি জেনেছি যে এই সেক্টর হলো খালেদ মোশাররফ এর সেক্টর। তবে আব্বা বলেছিলেন মেজর জিয়ার ভাষণই মূলতঃ তারা শুনেছিলেন। তার আগ পর্যন্ত ঢাকার ক্র্যাকডাউন শুনে উনারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিলেন, কি হয়, কি হয়! সবাই কি করবে এরপর। শেখ মুজিবকে পাকিস্তান আর্মি গ্রেফতার করে ফেলেছে! সবাই রেডিওতে কান পেতেছিল, কি খবর আসে! দুই দিন পর আগরতলা রেডিও থেকে জিয়ার ঘোষণা শোনা যায়, সবাই স্বস্তি পেল, নিশ্চিত হলো কি করতে হবে।
আমার বাবা আর উনার এক চাচা, মানু নাম। এই দুজনের দায়িত্ব ছিল বাড়ির মেয়েদের দেখভাল করা, বাজার করা , বাড়িতে বাইরের কেউ এলে সাবধানে কথার জবাব দেয়া। উল্লেখ্য, আমাদের বাড়িটা চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত বাড়ি। সবাই এক নামে চেনে, পাকিস্তান আর্মিরাও এলাকায় এসেই চিনেছে।
বাবা-চাচারা ছিলেন ছয় ভাই, পাঁচ বোন। দাদা ছিলেন সরকারী কর্মকর্তা, পোস্টমাস্টার ছিলেন। আব্বা সবার বড়। পরিবারের তৃতীয় সন্তান খোকন চাচা ছিলেন ক্লাস নাইনের ছাত্র। কিন্তু তাতে কি? বাড়ির অন্যান্য বড় ভাইদের সাথে তিনিও গিয়েছিলেন যুদ্ধের ট্রেনিং এ।
খোকন চাচাসহ সবার ট্রেনিং হয়েছিল আগরতলায়। এখানে উল্লেখ্য যে যিনি আমাদের বাড়ির গ্রুপের প্রধান ছিলেন, তিনি হলেন কমরেড খালেকুজ্জামান, স্বাধীনতাউত্তর জাসদ ও পরবর্তীতে বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা। যারা মুক্তি ত্রেনিং নিতো, তাদের স্ক্রলিং করা শেখানো হতো, তাই দু হাতের কনুইতে কড়া পড়ে যেত, চামড়ায় শক্ত কালো দাগ পড়ে যেতো। তাই পাকিস্তান আর্মিরা বা তাদের দোসর শান্তিকমিটির লোকেরা তথা রাজাকারেরা সেসময়কার প্রত্যেক তরুণের কনুই চেক করা হতো। তাই ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিরা কখনো প্রকাশ্যে চলাচল করতো না।
আমাদের বাড়ির মুক্তিদের ব্যাপারে শান্তিকমিটির লোকেরা কোনভাবে জেনেছিল বা সন্দেহ করেছিল। তাই আমার দাদাকে একবার গ্রেফতার করে। উনি ধার্মিক, সজ্জন ব্যক্তি। উনার ছেলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেছে, এটা মেনে নেয়া প্রশাসনের পক্ষে কঠিন। জিজ্ঞাসাবাদ চলে, স্বভাবতই দাদাকে মিথ্যে বলতে হয়েছে। উনি সরকারী লোক, স্বাভাবিকভাবেই উর্দু বলতে পারতেন। তাই পাকিস্তানীরা তেমন কিছু প্রমাণ করতে পারেনি। ছেলে কোথায় আছে, দাদা যে ই উত্তর দিয়ে আর্মিদের সন্তুষ্ট করেছিলেন, আল্লাহ মালুম!
রাজাকাররা তো আর বোকা না, বাড়ির ছেলেগুলো বাজারে, বাইরে দেখা যায় না। কিছু তো ঠাহর করার চেষ্টা করতো, কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। তাই প্রায় প্রায়ই বাড়িতে ঘুরে যেত। একবার হঠাৎ করে রাজাকারের আগমন। বাড়ির দায়িত্বে থাকা মানু দাদা দৌড়ে বাড়ির পেছনে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে কচুরীপানার ফাঁকে কোনরকম নাক তুলে ডুব দিয়ে আছেন। পানি একটু একটু ঢেউ খেলে যাচ্ছিল। আমার বাবা তাৎক্ষণিক উপস্থিত বুদ্ধিতে সহজ সরল বোকা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সেজে গেলেন, কথা বলতে আটকায়, ভাল করে কথা বলতে পারে না। হাঁটতে চলতে কষ্ট। আব্বাকে জিজ্ঞ্যেস করলে বললেন মাছ সাঁতরায়। তারা ট্যাডা / বর্শা মারতে গিয়েও মারেনি। বাড়ির মেয়েরা ট্রেনিং মোতাবেক রাজাকার আসলেই পেছনে গাজি বাড়ির ধানক্ষেতে লুকিয়ে পড়তেন। মেয়েরা কেউই বাইরের এসব লোকদের সামনে আসতেন না। কারণ, তখন সবাই জানে, মেয়েদের ধরে নিয়ে পাকিস্তানী ক্যাম্পে চালান দেয়। নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে।
তখন একটা কথা অনেক শোনা যাচ্ছিল, বাংলাদেশপন্থী যুবক বুঝতে পারলেই ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে গলা কেটে মেরে ফেলে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হতো। তাই সাধারণ যুবকেরাও ভয়ে আতংকে দিন কাটাতো। আব্বার কোন এক প্রয়োজনে ভিক্টোরিয়া কলেজে যাবার দরকার। চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা হাঁটাপথ অনেক দূর! তখন সরাসরি বাসে চড়তে অনেক রিস্ক ছিল। রাস্তায় রাস্তায় আর্মি টহল ছিল। একটু সন্দেহ হলেই সোজা গুলি। রাস্তায় সারি করে দাঁড়িয়ে। তাই আব্বা ছেঁড়া ময়লা গেঞ্জি লুঙ্গি পরে সব্জি বিক্রেতা সেজে হেঁটে হেঁটেই কলেজে গেলেন, আবার আসলেনও। যাক, সেবারও রক্ষা পেলেন আর কি!
বাড়িতে আমাদের পরিবার তখন মূল বাড়িতে ছিলেন। ফুফুরা অনেক ছোট ছোটই ছিলেন। আমার ছোট ফুফু ছিলেন মাত্র আড়াই বছর বয়স। বড়দের সবার মতো তিনিও দোয়া করতেন, আল্লাহ, জান মাল, ইজ্জত সব দক্ষা (রক্ষা) করো।
কোন কোন রাতে মুক্তিরা খেতে আসতেন বাড়িতে, গোপনে রান্না হতো। বাড়ির পেছন দিয়ে ঢুকতেন, গাজী বাড়ি দিয়েই বেরিয়ে যেতেন। সদর দরজা দিয়ে কেউ আসা যাওয়া করতো না। ভাগ্য ভালই বলতে হবে, তারা কেউই ধরা পড়েনি! রূপসা বাজারের কাছেই আর্মি ক্যাম্প ছিল। তারা কিছু একটা আঁচ করছিল, কিন্তু কখনোই হাতে নাতে ধরতে পারছিল না। তাই রাগে ক্ষোভে দুইবার মর্টার শেল ফেলেছিল। আমাদের দুটো কাচারী ঘর (বৈঠকখানা) পুড়ে গেছিল তাতে, পুরোপুরি ধ্বংসই হয়ে গেছিল!
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




