somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কান্ডারি অথর্ব
আমি আঁধারে তামাশায় ঘেরা জীবন দেখেছি, আমার বুকের ভেতর শূণ্যতা থেকে শূণ্যরা এসে বাসা বেঁধেছে, আমি খুঁজেছি তোমাকে সেই আঁধারে আমার মনের যত রঙ্গলীলা; আজ সাঙ্গ হতেছে এই ভবের বাজারে।

অমীমাংসিত রহস্য

১২ ই মে, ২০১৪ রাত ১২:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





পৃথিবীতে অনেক সময় এমন সব ঘটনা ঘটে থাকে যার রহস্য কখনও কখনও ভেদ করা সম্ভব হয়না। অলৌকিক কিংবা লৌকিকতার দ্বৈরথে রহস্যাবৃত হয়েই থেকে যায় সেইসব ঘটনা। ধর্ম কিংবা বিজ্ঞান কোন কিছুর আলোকেই; যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেসবের সমাধান বের করা সম্ভব হয় না। তেমনই কিছু ঘটনা নিয়ে আমার অমীমাংসিত রহস্য। এগুলোকে মিথ্যা ভাবলে মিথ্যা আর সত্য ভাবলে সত্য। তবে বলতেই হয় যে, বিশ্বাস করুন আর নাই করুন ঘটনাগুলো আজও অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে আমার কাছে। হয়ত কখনও এসব রহস্যের সমাধান হলেও হতে পারে।

ঘটনাঃ - ০১

আজকের আধুনিক মিরপুর একটা সময় ছিল একেবারেই অজপাড়াগাঁ। সামান্য গুলিস্তান গেলেই মানুষ বলতো ঢাকা যাচ্ছি। আমি তখন স্কুলে পড়ি। কোন ক্লাস ঠিক মনে নেই। উত্তর পাড়ার সৈকত ছিল আমার বন্ধু। সৈকতের অনুরোধে সেইদিন ওদের হয়ে ফুটবল ম্যাচ খেলতে গিয়েছিলাম। তখন প্রায় নিয়মিতই ক্ষেপ দেই। ক্ষেপ দেই বলতে কোথাও খেলা হলেই আমার ডাক পড়ত। দরদাম হয়ে যাওয়ার পর খেলতাম সেই দলের পক্ষ হয়ে। বিনিময়ে যা টাকা পেতাম তাই দিয়ে হাত খরচ চলে যেত। খেলা শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। সেই সময়ে মিরপুরে একটু রাত হলেই মনে হতো যেন গভীর রাত হয়ে গেছে। চারদিকে শুধু ধান ক্ষ্যাত। ক্ষ্যাতের আইল ধরে হাঁটছি। নিস্তব্ধ চারদিকে অন্ধকার। চাঁদের আলোই একমাত্র ভরসা। ঘন ঘন শিয়ালের ডাক। হেটে হেটেই বাড়ি ফিরছি। কিন্তু খেলায় হেরে যাওয়ার কারনে মনের ভেতর খুব জ্বালা করছিল। ওরা যে আশা করে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল ওদের সেই আশা আমি পূরণ করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছি। বরং কিছু মনোমালিন্যও হয়ে গেল ওদের সাথে। খেলায় হেরে যাওয়ার কারনে ওদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক হিসাবে কোন টাকা নিতে পারি নাই। তাই মনঃটা ভীষণ খারাপ। হাঁটছি; হঠাত সামনে দেখি রহিম চাচা জিকির করতে করতে যাচ্ছেন। বাম হাত দিয়ে ধরে কাঁধে করে একটি লাঠি নিয়ে হাঁটছেন। লাঠির মাথায় গামছা দিয়ে পুঁটলি বাঁধা। রহিম চাচা ছিলেন আমাদের পাড়ার মসজিদের খাদেম। আমি পেছন থেকে ডাকছি, “রহিম চাচা, ও! রহিম চাচা”। কোন সাড়া শব্দ নাই। উনি উনার মতো জিকির করেই হেটে চলেছেন। আমি আবারও ডাকলাম, “রহিম চাচা, ও! রহিম চাচা”। এবারও কোন সাড়া শব্দ নেই। আমি আবারও ডাকলাম। কিন্তু শেষে কোন সাড়া না পেয়ে চুপচাপ উনার পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বাড়ির সামনে এসে পৌঁছেছি খেয়ালই করি নাই। রহিম চাচা তখনও একই ভাবে জিকির করতে করতে হাঁটছেন। আমি দৌড়ে গিয়ে উনার ডান হাতটা ধরে বললাম, “চাচা”। সাথে সাথে মনে হলো যেন আমার হাতটা জ্বলে গেল। যখন জ্ঞান ফিরল, বাড়ির সবাই দেখি আমাকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে। আমি বিছানায় শুয়ে আছি আর আমার মা পাশে বসে আমার মাথায় পানি ঢালছেন। সবাই জিজ্ঞাস করল কিরে তোর কি হয়েছিল? আমি কোন জবাব দিতে পারলাম না শুধু আমার ডান হাতের মুঠো খুলে দেখি পয়সার মতো গোল হয়ে হাতের তালুর মাঝখানটা ঝলসে গেছে। আমার হাতের তালুর সেই ক্ষত দাগ প্রায় ষোল বছর ধরে ছিল। সেই রাতের ঘটনার দুইদিন পর যখন ঘটনাটা সবাইকে বললাম; তখন আমি মাত্র জানতে পারলাম যে, রহিম চাচা মারা গেছেন মাস কয়েক আগেই। এই ঘটনা নিয়ে সবাই কিছুদিন উপহাস করল। তারপর সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে এলো কিন্তু এই নিয়ে এখনও আমার মায়ের মধ্যে আমাকে নিয়ে উদ্বেগ লক্ষ্য করি।

ঘটনাঃ – ০২

আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন জোয়ারদার চাচা। তারা ছিলেন নিঃসন্তান দম্পতী। এই নিয়ে তাদের মাঝে সবসময় ভীষণ কষ্ট বিরাজ করত। সেই সময়ে পুরো পাড়া জুড়ে শুধু জোয়ারদার চাচার বাড়িতেই একটা টেলিভিশন ছিল তাও সাদা কালো। সন্ধ্যা হলেই আমরা কয়েকজন মিলে তার বাড়িতে যেতাম টেলিভিশন দেখতে। তিনি আমাদের জন্য একটা নাম ডাকার খাতা করেছিলেন। সবাই যখন টেলিভিশনের সামনে বসতাম তখন তিনি নাম ধরে ডাকা শুরু করতেন। একে একে উপস্থিত বলা শেষ হলে তিনি টেলিভিশন ছেড়ে দিতেন। যদি কাউকে কোন দিন অনুপস্থিত পেতেন সঙ্গে সঙ্গে তার খোঁজ নেয়ার জন্য ছুটে যেতেন। এমনই এক অদ্ভুত খেয়ালের মানুষ ছিলেন জোয়ারদার চাচা। একদিন কোথা থেকে যেন একটা বাচ্চাকে সাথে করে নিয়ে এলেন। বাচ্চাটার বয়স হবে চার কী পাঁচ বছর। বেশ মায়াবী একটা চেহারা ছিল বাচ্চাটার। দেখলেই গাল টেনে ধরে আদর করতে ইচ্ছে করত। চাচা-চাচী দুজনেই যেন তাদের নিঃসন্তান দাম্পত্য জীবনে একটা সন্তান পেলেন। নিজের সন্তান হলেও হয়ত এত আদর তারা করতেন না, যতটা বাচ্চাটাকে আদর করতেন। জোয়ারদার চাচা আদর করে তার নাম রাখলেন তুলি। কিন্তু বাচ্চাটার একটাই সমস্যা ছিল কথা বলতে পারত না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে থাকত। পৃথিবীর যাবতীয় কথা যেন সব তার চোখই বলে দিত। চাচা খুব শখ করে তুলির জন্য ছোট একটা বালিশ বানিয়ে আনলেন যাতে তুলি আরাম করে ঘুমাতে পারে। এক রাতে চাচার কলম দিয়ে সেই বালিশে তুলি অবিকল তার নিজের মুখের মতো করে একটা মুখ আঁকল। তারপর সেই বালিশ দিয়েই তার সারাদিনের পুতুল খেলা। চাচী বহুবার চেষ্টা করেছে বালিশের কাপড় ধুয়ে দেয়ার জন্য কিন্তু তুলির জেদের কারনে সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ময়লায় নোংরা হয়ে কালো হয়ে গেল বালিশটা। সেই ময়লা বালিশেই চাচীর কাছ থেকে কখনও লিপিস্টিক নিয়ে, কখনও কয়লা দিয়ে বউ সাজাতো। চাচা অনেক পুতুল কিনে এনে দিলেন কিন্তু কোন কিছুই তুলির মন ভোলাতে পারলনা। সে তার বালিশ নিয়েই পড়ে থাকল। একদিন চাচা ভীষণ রেগে গিয়ে তুলির গালে চড় বসিয়ে দিলেন। সেইদিন থেকে তুলি উধাও হয় গেল। সাথে বালিশটাও নাই। আমরা সবাই মিলে অনেক খোঁজা খুঁজি করেও কোথাও আর তুলিকে পেলাম না। তুলির শোঁকে দেখতে দেখতে জোয়ারদার চাচা কেমন যেন উদাস প্রকৃতির হয়ে গেলেন। কারও সাথে কথা বলেন না। সারাদিন চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকেন। খাওয়া দাওয়াও ছেড়ে দিলেন। সব সময় হাসিখুশি নাদুস নুদুস একটা মানুষ হঠাত করেই ভীষণ রোগা হয়ে গেলেন। এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে একটা সময় ভীষণ অসুস্থ হয়ে দীর্ঘ দিনের জন্য কোমায় চলে গেলেন। অনেক টাকা পয়সা খরচ করে বিদেশে নিয়ে গিয়েও চিকিৎসা করানো হলো। এরই মাঝে কেটে যায় প্রায় বছর সাতেক কিন্তু কোন কিছুতেই কোন ফল না পেয়ে অবশেষে ডাক্তাররা তার বাঁচার আশা ছেড়ে দিলেন। একরাতে জোয়ারদার চাচার বাড়ির দরজায় কাড়া নাড়ার শব্দে চাচী ঘুম ভেঙে দরজা খুলে দিতেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সেই চার-পাঁচ বয়সের বাচ্চা মেয়েটা হাতে সেই বালিশটা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। গুটি গুটি পায়ে চাচার বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই জোয়ারদার চাচার চোখ বেয়ে পানি নেমে এলো। তুলি চাচার দিকে বালিশটা এগিয়ে দিতেই অস্পষ্ট কণ্ঠে জোয়ারদার চাচা একবারের জন্য বললেন, “তুলি মা আমার, তুই ফিরে এসেছিস”। তারপর আর কোন দিন জোয়ারদার চাচা কথা বলেন নাই। কিন্তু আশ্চর্য জনক হলো চাচার সেই মৃত্যুর রাতের পর থেকে তুলিকেও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এবার উধাও হওয়ার আগে তুলি বালিশটা রেখে গেল। জোয়ারদার চাচা বেঁচে নেই, তুলিও নেই কিন্তু সেই বালিশটা আজও ঠিক তেমনই আছে। চাচী এখন বুড়ো হয়েছেন তবু খুব যত্ন করে তুলির ফিরে আসার প্রতীক্ষায় তুলে রেখেছেন বালিশটা।


সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০১৫ রাত ১১:৩৯
৩৫টি মন্তব্য ৩৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×