somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শামস-ই -তাব্রিজি ২ অনুবাদ ও ব্যাখ্যা

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শামস ই তাব্রিজি ২

মৌলানা জালালুদ্দিন রুমি

অনুবাদ ও অর্থ


সেইসব প্রকাশকারী রাত্রিতে আমি অভিভূত হলাম
অন্যের অর্ধচন্দ্র হলো আমার পূর্ণচন্দ্র
যে রাতে প্রেমিক আমাদের মাঝে থাকে
সেই রাত সহস্র মধ্যাহ্ন-এর ন্যায় প্রকাশকারী হয় |

আমাদের চারপাশের দুর্বল কার্যকারণ হার মানে
কারণ আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিনকে প্রথম কারণ প্রকাশ করবে
একজন দরিদ্র যাকে দারিদ্র পরিহার করে না |
অন্যের পরিশ্রম সে গর্বের সাথে নিজে করে |

ঈশ্বর না করুন ওই সব প্রতিক আমার জোব্বার ভেতর থাকে
প্রতিটি শহরে সে মুকুট আমি পরি |
সেই মুকুটের মুক্তগুলি যা উভয় দুনিয়াকে ছাপিয়ে যায়
তা আমার হৃদয়সাগরের মাঝে ডুবে থাকে |

এই দুনিয়ায় আমাদের পুনরুত্থান হয়
যতদিন পর্যন্ত না অন্যান্য দিন ও বিচার দিনের চিন্তা মুছে যায়
এবং ঈশ্বরের অনন্ত কৃপা পাওয়ার উপযুক্ত হয়
অন্য সমস্ত কিছুর কৃপাকে পরিত্যাগ করে |
শামস ই তাব্রিজের মত সমস্ত দুনিয়া
এক ছাতার ছায়ায় অবস্থান করে |


এই কবিতার অর্থ অত্যন্ত সুগভীর | আমি সেটা বলার চেষ্টা করছি | কবিতাটি চারটি ভাগে বিভক্ত | প্রথম ভাগে কবি বলছেন এক রত্রির কথা যা প্রকাশকারী| এই রাত্রিতে অন্যে যেখানে অর্ধচন্দ্র দেখছে সেখানে কবি পূর্ণচন্দ্র দেখছেন | তাছাড়া এই রাত্রিতে কবির প্রেমিকা কবির সাথে আছেন| তাই রাত্রি কবির কাছে সহস্র মধ্যাহ্ন-এর ন্যায় প্রকাশকারী | সাধারনভাবে এই হলো কবিতাটির মানে | সাধারণ দৃষ্টিতে এটি হলো একটি প্রেমের কবিতা | মোটামাথার ইউরোপীয়রা এই অর্থই করেছে | প্রেমিকের কাছে প্রেমিকা উপস্থিত হলে সমস্ত রাত্রিই প্রকাশশীল হয়ে যায় | এসব তো বোঝাই যায় |

কিন্তু যেটা বোঝা যায় না তাহলো কিভাবে এক রাত্রিতে একই চাঁদকে দুরকম দেখায় | “ অন্যের অর্ধচন্দ্র হলো আমার পূর্ণচন্দ্র” : এটা কিভাবে সম্ভব হয় ? চাঁদ হয় অর্ধ হয় নয়তো পূর্ণ হয় | কিন্তু বিভিন্ন লোকের কাছে বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয় না | সমস্ত লোকের কাছে একই রকম দেখায় | কিন্তু কবি বলেছেন যে এই রাতে “ অন্যের অর্ধচন্দ্র হলো আমার পূর্ণচন্দ্র” | তাহলে এটা নিশ্চই কোনো সাধারণ রাত নয় | অপিতু কোনো বিশেষ রাত | আমার মতে এই রাত হলো মানুষের মনের অজ্ঞানতার অন্ধকার | চাঁদ হলো এখানে জ্ঞান তথা আল্লা |চাঁদের আলো হলো আল্লার জ্ঞানের আলো | কারণ এভাবে ধরলেই দেখা যায় যে অন্যের মনে অজ্ঞানতার আঁধার বেশি , সেখানে আল্লার আলো অর্ধেকটা আসছে , অতএব চন্দ্রমা হলো অর্ধ | কিন্তু কবির মনে অজ্ঞানতার আঁধার আর নেই তাই সেখানে চাঁদের সমস্ত আলো আসছে | তাই চাঁদ হলো পূর্ণ | এভাবেই “ অন্যের অর্ধচন্দ্র হলো আমার পূর্ণচন্দ্র” |

শেষের দুটো লাইন বলছে যে যখন প্রেমিকা কবির সাথে থাকে তখন সমস্ত রাত হাজার দুপুরের মত উজ্জ্বল হয় | এখানে প্রেমিকা আমাদের রক্তমাংসের প্রেমিকা নয় কারণ সেই রকমের প্রেমিকার উপস্থিতিতে কোনো রাত সহস্র দুপুরের মত উজ্জ্বল হয় না | অন্তত চর্মচক্ষুতে তা দেখা যায় না | সুতরাং এখানে প্রেমিকা হলো সুফিদের প্রেমিকা আল্লা| যদি মনে আল্লা উপস্থিত থাকে তাহলে অজ্ঞানতার অন্ধকার থাকে না | মনের আকাশ সহস্র দুপুরের মত উজ্জ্বল হয়ে যায় | তবে কবি বলেছেন “সেই রাত সহস্র মধ্যাহ্ন-এর মত প্রকাশকারী হয় |” এখানে আল্লার জ্যোতি এত তীব্র যে চোখে অন্ধকার লেগে যায় | তাই কবি বলেছেন রাত এবং প্রকাশের কথা | এই রাত হলো জ্যোতির কারণে জ্ঞান চক্ষুর অন্ধকার | অজ্ঞানতার অন্ধকার নয় | সে অন্ধকার তো নেই | চলে গিয়েছে | এ হলো জ্যোতির অন্ধকার | দুই অন্ধকার এক নয়| অনেকটা গীতায় কৃষ্ণের বিশ্বরূপের বর্ণনার মত : যবে কোটি কোটি সূর্য গগনে কিরণ দেয় .... ( দিবি সুর্যসহস্রস্য ভবেত যুগপত্থিতা .....) ইত্যাদি | এখানেই একটা জিনিস দেখার আছে | প্রথম দুই লাইনে বলা অন্ধকার হলো অজ্ঞানতার অন্ধকার আর শেষ দুলাইনে বলা অন্ধকার হলো আল্লার জ্যোতির ফলে জ্ঞানচক্ষুর অন্ধকার | দুই অন্ধকার এক নয় | নির্ভেজাল আধ্যাত্মিক একটি কবিতাকে রোমান্টিক ইউরোপীয়রা প্রেমের কবিতা বলে প্রচার করেছে |

দ্বিতীয় ভাগে কবি বলেছেন যে আমাদের চারপাশের যে ঘটনা ঘটে চলেছে তাদের মধ্যে যে কার্যকারণ সম্বন্ধ দার্শনিকরা নির্ণয় করেছেন তা অত্যন্ত দুর্বল | কারণ সেই কার্যকারণ সম্পর্কগুলি চিরস্থায়ী নয় | জগত নিতান্তই ক্ষনস্থায়ী | তা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে | আজকে যে কার্যের যে কারণ আছে , কালকে সেই কার্যের অন্য কারণ হচ্ছে | এই দুদিনের পরিবর্তনশীল জগতে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক সলিড নয় | শুধুমাত্র আল্লা হলো প্রথম কারণ | সেই প্রথম কারণ আল্লা জগতের নিয়মকে নিয়ন্ত্রণ করছেন | কবি আল্লার সেই ভাঙাগড়ার খেলা দেখে চলেছেন | এই হলো প্রথম দুই লাইনের অর্থ |

শেষের দুই লাইনে কবি বলেছেন এমন এক মানুষের কথা যে দারিদ্রে কাতর হয় না | সে অন্যের দুঃখ দারিদ্র্যকে অনায়াসে আপন করে নেয়| এই দুই লাইনের সাথে আগের দুই লাইনের সম্পর্ক কি ? আমার মনে হয় নিত্য পরিবর্তনশীল জগতে এই ধরনের মানুষই সুখে থাকে যে দারিদ্র্যে কাতর হয় না | এই কথাটাই হয়ত কবি বলতে চেয়েছেন |

তৃতীয় ভাগে কবি কতগুলি প্রতীকের কথা বলেছেন | প্রতীকগুলি অজ্ঞানতার চিহ্ন | অন্য অনেকে , যাদের জ্ঞান নেই , অনেক প্রতিক চিহ্ন ধারণ করে | এটা সব ধর্মেই দেখা যায় |কিন্তু এইসব চিহ্নধারীদের কোনো জ্ঞান নেই | অর্থাত তারা মুর্খ |কবি মুর্খ নন | তিনি জ্ঞানী | তাই তিনি প্রতিক পূজার হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছেন |এই অর্থ পাওয়া যায় পরের তিনটি লাইনে |পরের তিনটি লাইন একসাথে যুক্ত | এখানে একটা মুকুটের কথা বলা হয়েছে | মুকুটের মুক্তগুলি কবির হৃদয়ের সমুদ্রে ডুবে আছে | এখানে মুখ্যার্থ বাধিত কারণ রক্তমাংসের হৃদয়ের সমুদ্র হয় না | অতএব লক্ষ্যার্থ ধরতে হবে | হৃদয় বলতে জ্ঞানকেও বোঝায় | জ্ঞানের সমুদ্র বলে কথা আছে | তাহলে দাড়ালো কবির জ্ঞান সমুদ্রের মুক্তগুলি দিয়ে মুকুট তৈরী হয়েছে | এখানে মুক্ত কেমন ? মুক্তগুলি দুটি জগতকে ছাপিয়ে যায় অর্থাত জগতের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান | অর্থাত জ্ঞান সমুদ্রের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানগুলি দিয়ে জ্ঞানের মুকুট কবি মাথায় পরিধান করেন | অর্থাত কবির কাছে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান আছে , এটাই কবি বলতে চান | শেষ তিনটি লাইনই প্রথম লাইনটিকে ব্যাখ্যা করেছে | যার কাছে উভয় জগতের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান আছে সে কেন মিথ্যা প্রতিক পুজো করবে বা ধারণ করবে ?

চতুর্থ ভাগে কবি বলেছেন কেন আমাদের পুনরুত্থান হয় ? আমাদের পুনরুত্থান হয় কারণ আমরা বিচার দিনের এবং অন্যান্য দৈনন্দিন সাংসারিক কামনা বাসনা দ্বারা জর্জরিত | “বিচার দিনে আমরা পুনরুত্থিত হব” এই কামনা বাসনাই পুনরুত্থানের হেতু | (হিন্দু ধর্মের পুনর্জন্মের সাথে মিল আছে |) এই হলো প্রথম লাইন দুটির অর্থ | পরের লাইন দুটিতে কবি বলেছেন যে আল্লার কৃপা কিভাবে পাওয়া যায় ? সমস্ত জাগতিক বস্তুর কৃপা পরিত্যাগ করলে আল্লার কৃপা পাওয়া যায় | এখানেও হিন্দু ধর্মের সাথে কিছু মিল পাওয়া যায় যেখানে গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন : “সর্বধর্ম পরিত্যাজ্যং মামেকং শরণং ব্রজ |” অর্থাত সমস্ত জাগতিক ধর্ম ছেড়ে এক আমার শরণে এস | আজকের জাগতিক ভোগী মুসলিমরা কি ভাববেন তা জানি না |

শেষ দুটি লাইনের অর্থ অত্যন্ত গভীর | “শামস এ তাব্রিজের মত সমস্ত দুনিয়া একই ছাতার ছায়ায় আশ্রয় নেয়” | প্রতিটি মানুষই এখানে এক একটি দুনিয়া বা জগত |মানুষের শরীরে কোনো দুনিয়া চর্মচক্ষুতে দেখা যায় না | তাই মুখ্যার্থ বাধিত | অতএব লক্ষ্যার্থ ধরতে হবে | এই দুনিয়া মানুষের মনে আছে | অর্থাত মানুষের মনোজগতের কথা বলা হয়েছে | ছাতাটি হলো আল্লা | যখন যাবতীয় জাগতিক কামনা বাসনা বিসর্জন দিয়ে আল্লার কৃপা মানুষ পায় তখন তার মনোজগত আল্লার ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয় | এই লাইন দুটি আগের দুটি লাইনের সাথে কার্যকারণ সম্পর্কে যুক্ত | আগের লাইন অনুযায়ী যখন মানুষ আল্লার কৃপা পায় তখনই তাদের মনোজগত আল্লার ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয় | অর্থাত মন আল্লায় লীন হয়ে যায় |

রুমির কবিতাগুলি যত অনুবাদ আর ব্যাখ্যা করছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি | এই আধ্যাত্মিক ব্যাপারগুলি ইউরোপীয়দের অনুবাদে কখনো পড়েছি বলে মনে পড়ে না | ওমর খৈয়ামের রুবাইয়ের অনুবাদ করার ইচ্ছা আছে | মনে হয় সেখানেও এই রকম আধ্যাত্মিক বিষয় পাওয়া যাবে |

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:৩৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৫



আজ বৃহঃস্পতিবার, ২রা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
ইংরেজি ১৭ই সেপ্টেম্বর। গত কয়েকদিন বেশ কয়েকজন ব্লগার সামুর ভালো মন্দ নিয়ে লিখেছেন। তাদের মুল বক্তব্য হলো- সামু গেলো। সামু শেষ। তারা সামুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরাব পিনে দে.....

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫১



মির্জা গালিব সম্পর্কে একটি গল্প চালু আছে। একদিন তিনি মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। তখন মুসল্লিরা তাকে বাধা দিয়ে বললেন "মসজিদ আল্লাহর ঘর, মদ্যপানের জায়গা নয়।" তখন মির্জা গালিব তাঁর বিখ্যাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালছাল মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৩৬

প্রথম পাতায় ব্যান ব্লগারের একটি পোস্টে ব্লগার রাজীব নূর মন্তব্য করে বলেছেন - “ওদের কে ‘বালছাল’ লিখতে দেন। বিনোদন নষ্ট করবেন না।”

বাহ! কী চমৎকার গণতান্ত্রিক দর্শন! এতদিন জানতাম দেশে তথ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×