আমাদের সমাজে এবং পুরো বিশ্বে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে যিনি যত বয়স্ক তিনি তত মুরব্বী! যেমন বাপ-চাচা-দাদারা মুরব্বী, পীর ছাহেব মুরব্বী, মোল্লা-পুরোহিত-যাজক-ভান্তেরা মুরব্বী ইত্যাদি। আমি মোটেই একমত হতে পারছি না। দয়া করে মুরব্বীরা ক্ষেপে যাবেন না। ’গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ মতবাদেও আমি বিশ্বাসী নই। আসুন মহান আল্লাহর পবিত্র কোরআন থেকে জানতে চেষ্টা করি মুরব্বী আসলে কারা।
”এবং যখন তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তোমরা অনুসরণ কর, পক্ষান্তরে তারা বলে আমরা অনুসরণ করব যা আমরা পেয়েছি আমাদের বাপ-দাদাদের (তথা মুরব্বী বা পিতৃপুরুষ) উপর। এমন কি তাদের বাপ-দাদারা যদিও কিছুই বুঝতো না এবং তারা সঠিক পথে ছিলো না (তথাপিও?)” (সূরা বাক্বারা, আয়াত ১৭০)।
অধিকাংশ তফসীরকারক আয়াতটির ব্যাখ্যায় টেনে এনেছেন মহানবী (সা.) এর যুগের ইহুদী-নাসারাদের নবীকে না মানার কাহিনী। আর তা হচ্ছে আয়াতটির শানে-নযুল। শুধু শানে-নযুল পড়ে কস্মিনকালেও কোরআন বুঝা যাবে না। আর কোরআন কোন কাল বা সময়ের ঘেরাটোপে আবদ্ধ নয়। এটি একটি সর্বজনীন এবং সর্বকালের গ্রন্থ, কেউ মানুক আর না মানুক। বাপ-দাদারা কি এ যুগে নেই? ইসলাম অনুসারীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই আপনি ইসলামিক, একইভাবে আছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আরো আছে শিয়া, সুন্নি, ওয়াহাবি, খারেজী, কাদিয়ানি, শিখ, তালেবান, আইএসআইএস ইত্যাদি। ইসলামের মুরব্বীরা বলে তাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ, একইভাবে বলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানরা। অন্যদিকে সুন্নিরা (ইসলামের একটি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়) বলে তারাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মধ্যে আছে বাকিরা বরবাদ, একইভাবে বলে শিয়া, ওয়াহাবি, খারেজী, কাদিয়ানিরাও। আপনি যাবেন কোথায়? যখন প্রমাণের কথা বলা হয় তখন আপনি এদের কাউকে পাবেন না। পাবেন না মোল্লাকে, পাবেন না পুরোহিতকে, পাবেন না যাজককে, পাবেন না ভান্তেকে। এরা সবাই আনুষ্ঠানিক ধর্ম তথা আচার-প্রথায় বিশ্বাসী। অথচ মহান আল্লাহ আনুষ্ঠানিক ধর্ম তথা আচার-প্রথায় মোটেই বিশ্বাসী নন। নইলে তিনি বাপ-দাদাদের ধর্মকেই মানতে বলতেন। তাই তো তিনি বলেন, ”সেদিন (শেষবিচার দিবসে) যে (ব্যক্তি) আল্লাহর কাছে একটি বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে (সে-ই রক্ষা পাবে)” (সূরা শুআরা, আয়াত ৮৯)। বলা হয়নি যে লক্ষ-কোটি রাকাত নামায কিংবা অনেক রোযা কিংবা হজ্ব বা যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে সে-ই রক্ষা পাবে। অন্তরকে বিশুদ্ধ করতে হলে বাপ-দাদাদের ধর্মকে বিসর্জন দেয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। আবু লাহাবও ছিলেন মহানবী (সা.) এর চাচা এবং হযরত হামযা (রা.)ও ছিলেন নবীর চাচা। আবু লাহাব নামটি ইতিহাসে অত্যন্ত ঘৃণিত একটি নাম যদিও নবীর চাচা। নবী বংশের হলেও তাকে ’সৈয়দ’ পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। অথচ এখন সৈয়দের ছড়াছড়ি! একটু গভীরে গেলে দেখা যাবে এখানে আবু লাহাবদের সংখ্যাই বেশি। সত্য হচ্ছে মহানবী (সা.) এর নূরের বংশধরটিই আসল বংশধর। আবু লাহাব নবী (সা.) কে নবী হিসেবে না দেখে দেখেছিলেন ভাতিজা হিসেবে। চাচা মুরব্বী হয়ে কীভাবে ভাতিজার কাছে বায়াত হয়! বুদ্ধিমান ছিলেন হযরত হামযা (রা.)। যিনি নিজেকে চিন্তা করেছেন একজন পথহারা পথিক। তাই পথের সন্ধান পাওয়ার আশায় গিয়েছিলেন একজন পথ প্রদর্শক তথা নবী (সা.) এর কাছে, ভাতিজার কাছে নয়। তিনিও কিন্তু ছিলেন মুরব্বী। আল্লাহর আওলিয়া বা বন্ধুরা যে কোন বয়সের হতে পারেন। তাঁরা যে শুধু থুত্থুরে বুড়ো হবেন কিংবা বয়স্ক হবেন কিংবা দাদা-চাচাদের বয়সী হবেন এমন কোন কথা নেই। যিনি আল্লাহর আওলিয়া হবেন তাঁর মধ্যে জ্ঞান তো থাকবেই, আরো থাকবে সৎকর্ম, থাকবে বিনয়, থাকবে নিরপেক্ষতা এবং থাকবে সত্য। এবং তিনিই মুরব্বী।
অনেকে ক্রোধের বশে বলে ফেলে, আমার পূর্ব পুরুষ খুব রাগী স্বভাবের ছিলো তাই আমিও রাগী! এখানেই আপনার ব্যর্থতা। পূর্ব পুরুষ ল্যাংটা হাঁটতো কিংবা গাছের ছাল পরতো বলে আপনিও কি এখনো সেরকম থাকবেন? পূর্ব পুরুষের রক্তে ছিলো লুচ্চামি-বদমাইশি তাই বলে আপনিও কি লুচ্চামি-বদমাইশি করবেন? পূর্ব পুরুষ রোবটের মতো নামায পড়েছেন, রোযা রেখে উপবাস করেছেন, অবৈধ টাকায় হজ্ব-যাকাত করে পাছায় তবলা বাজিয়েছেন বলে আপনিও কি তাই করবেন?
কোরআনে আল্লাহ ইসলাম ধর্মকে সবার জন্য মনোনীত করেছেন বলেছেন কিন্তু কোথাও বলেননি তাঁর অর্থাৎ আল্লাহর ধর্ম কোনটি। বুঝতে হবে ’ইসলাম’ কোন বাপ-দাদাদের ধর্ম নয়, এটি আল্লাহর মনোনীত ধর্ম। কীভাবে? পরিপূর্ণরূপে ঢুকেন (সূরা বাক্বারা, আয়াত ২০৮) তবেই বুঝবেন। নইলে তালগোল পাকিয়ে ফেলবেন আর দশটা ধর্মের সাথে। ঘি-মাখন কিন্তু দুধের ভেতরেই থাকে, ইসলামের ভেতরেও আল্লাহ আছেন। তাই ইসলাম মানতে হবে কিন্তু রঙিন হতে হবে মহান আল্লাহর ধর্মে। ”আল্লাহর রঙ (ধর্ম) এবং কে আল্লাহর চাইতে রঙে উত্তম” (সূরা বাক্বারা, আয়াত ১৩৮)। আরো দেখুন, কোরআনে আল্লাহ নামায কায়েম করতে বলেছেন, ব্যস একদল জোরে-শোরে লেগে গেল নামায কায়েম করতে। প্রচার করতে লাগল সবচেয়ে বড় ইবাদত নাকি নামায! অথচ হিসেব করে দেখা গেল সবচেয়ে সহজ এবং ছোট ইবাদত হচ্ছে নামায। কোরআনে আল্লাহ নামায কায়েম করতে বললেও কোথাও বলেননি তিনি নিজে নামায পড়েন। বলেছেন, ”তিনি নবীর উপর দরূদ পড়েন” (সূরা আহযাব, আয়াত ৫৬)। নবীর উপর দরূদ পড়া বাহ্যিকভাবে খুব সহজ মনে হলেও অনেকের কাছে খুবই কঠিন! যাদের কাছে কঠিন তারা ইসলামের অনুসারী বটে কিন্তু নবী বিদ্বেষী। তারা ’আল্লাহুমা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ...’ ছাড়া আর কোন দরূদ শরীফ খুঁজে পান না। তাদের কাছে প্রশ্ন, আল্লাহ তবে কোন দরূদটি তাঁর নবীর উপর পড়েন? এবার বুঝে নিন কোন ইবাদতটি বড়।
এবার একটি হাদীস বলে শেষ করছি- ”যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না ও বড়দের মর্যাদা বুঝে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (তিরমিযি শরীফ, ৪র্থ খণ্ড, হাদীস নং ১৯২০)। সুতরাং মুরব্বীদের ধর্ম মানা না গেলেও তাঁদের কিন্তু অশ্রদ্ধা করা যাবে না। তাঁরা যদি বিধর্মীও হয় তবুও ”তাঁদের শ্রদ্ধা করে যেতে হবে দুনিয়ার এ জীবনে” (সূরা লোকমান, আয়াত ১৫)।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৩:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



