
আপনার শিশুর প্রথম আঁকা ছবিটির দিকে তাকিয়ে কখনো ভেবেছেন, এই ছবিটিই কতটা অমূল্য হতে পারে ? অথবা শুধু মাত্র আঁকা ছবিই নয়, যে কোন ধরনের একটা সৃষ্টিশীল কাজের দিকে তাকিয়ে কখনো ভেবেছেন , কিছুটা রূপান্তরে এটি অভাবনীয় রূপ নিতে পারে ? আমারা আসলে কখনো ভাবিই না একটি শিশুর প্রথম কুড়িয়ে পাওয়া ছোট্ট একটি পাথর কতটা যত্ন এবং আগ্রহ থেকে সে আবিষ্কার করেছে, ছুড়ে ফেলে দেই ময়লা আবর্জনা ভেবে । আমারা বড়োরা এসব নিয়ে ভাবার সময় পাই না । আমাদের জীবন সম্পর্কে অনেক বেশী অভিজ্ঞতা, জীবনবোধ অনেক , তাই ভবিষ্যৎ চিন্তা , ভয় ভীতি অনেক বেশী । কিন্তু শিশুদের কথা ভাবুন , ওসব নিয়ে কোন মাথা ব্যথাই নেই , মাথায় এসব নিয়ে ভাবার জায়গাটাই তৈরি হয়নি ওদের । এজন্যই ওদের সৃষ্টিতে নতুন কিছু পাওয়া যায় ।

big think এর ওয়েব সাইটে একটি ফিচার পড়ালাম Sam Mcnerney এর , আর সেখান থেকেই মনে হোল , সত্যিই তো আমাদের বড়ো হওয়ার প্রক্রিয়াটা অনেক গুলো প্রতিভার মৃত্যুর জন্য দায়ি । বিখ্যাত চিত্রকর পিকাসোর মতে, সকল শিশুই চিত্রকর , কিন্তু বড়ো হতে হতে এটাকে ধরে রাখাটাই সব থেকে কঠিন । তার মানে বুঝতেই পারছেন , মানুষের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি এতটাই জটিল যে শিশুতোষ এই অতি মূল্যবান অবস্থানকে ধরে রাখতে পারে না । তবে বড়োরা একটা কাজ অবশ্যই পারে - ছোটদের কাজের মর্যাদা দিতে পারে অথবা ঐ কাজটিকেই রূপান্তরিত করে নতুন মাত্রা সংযোজন করতে পারে ।
এই কাজটিই করেছেন Dave Devries , তার মনস্টার ইঞ্জিন নামক একটি প্রজেক্ট রয়েছে যেখানে সে শিশুদের আঁকা শিশুতোষ ছবির উপর রং এর ছোঁয়া দিয়ে একটা আলাদা মাত্রা জুড়ে দিয়া সেই ছবিকে জীবন্ত করে তোলে । কিন্তু তার এই জীবন্ত ছবির আইডিয়াটি ঐ ছোট্ট শিশুটির কাছ থেকেই পাওয়া । আসলে , শিশুরা প্রকৃতিগত ভাবেই ভীষণ সৃজনশীল হয় । ওদের জীবনবোধটা সীমাবদ্ধ থাকে , তাই সবকিছু আবিষ্কার করার অদম্য একটি তাড়না বোধ করে সবসময় । ওদের অজানার প্রতি আগ্রহ সবসময় , ওরা মুক্তো ভাবে সব কিছু ভাবে এবং ওদের কল্পনা মুক্তো আকাশে ঘুরে বেড়ায় , সেখানে কোন বাঁধা নেই , নিষেধ নেই , আইনকানুন নেই , নেই কোন প্রকার দায়বদ্ধতা । সম্ভব আর আসম্ভ নিয়ে এতোটুকু মাথা ব্যথা থাকে না , চিন্তা চেতনা গড়ে ওঠে আপন গতিতে । ওদের সমস্তটাই আসল, একেবারেই নিজস্ব - তাই ওদের সৃষ্টিতে কোন নকলের ছাপ থাকে না , ওদের প্রতিটি সৃষ্টিই অনবদ্য সৃজনশীলতার প্রতীক । ওদের চিন্তা আলোর গতির চেয়েও দ্রুতগামী হয় , তাইতো কল্পনায় ওরা চলে যায় বহু দুরে যেখানে আমাদের সূর্যের আলো একটু দেরিতে পৌঁছায় । ওরা অযাচিত প্রশ্ন করে , সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ অব্দি জানতে চায় , বিব্রত করে বড়োদের । এটাই শিশুদের ধর্ম ।
যদিও , মানুষের বেড়ে ওঠাটাও প্রকৃতিরই একটা অংশ এবং এরও অনেক গুলো সুবিধা রয়েছে নিঃসন্দেহে । বেড়ে ওঠাতেই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির প্রসার ঘটে , বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংযম সংবরণ শিক্ষা , অতি জটিল বিষয় নিয়ে ভাবা এবং সেটা থেকে বেরিয়ে আসার কলা কৌশল ইত্যাদি সবই আমারা প্রাপ্ত বয়সে এসেই জানি , যা একটি সমাজ ব্যবস্থার জন্য অতি জরুরি ।
কিন্তু , অধিকাংশ মানুষই বৃহৎ অথবা হতে পারে মহৎ একটি স্বার্থে প্রকৃতি থেকে পাওয়া অতি আশীর্বাদীয় সৃজনশীল গুনকে হারিয়ে ফেলে প্রাপ্তবয়সে যেতে না যেতেই । মানুষ বাস্তববাদী হয়ে ওঠে , নানান প্রকার নিয়ম নীতির বেড়াজালে আটকে যায় , জটিল হয়ে ওঠে জীবন । হয়তোবা এটাকে জটিলও বলা যায় না , হয়তোবা স্থিতিশীল জীবন বলা যেতে পারে অথবা বলা যেতে পারে নিয়ম নীতির ভারসাম্য জীবন । কিন্তু এটাও পরিক্ষিত যে নিয়ম নীতির বিধিমালায় সৃজনশীলতার মৃত্যু ঘটে । মনোবিজ্ঞানী Darya Zabelina and Michael Robinson পরীক্ষা করে দেখেছেন যে শিশুদের মত করে ভাবতে পারলেই অরিজিনাল ক্রিয়েটিভ আইডিয়া পাওয়া যাবে , যেটা বিধিবদ্ধ জীবনে হয়তো সম্ভব না ।
তাই অরিজিনাল ক্রিয়েটিভ আইডিয়া পেতে শিশুদের মত করে ভাবুন অথবা শিশুদের আইডিয়া ধার করুন , তবে ওদের অর্ধেকটা ক্রেডিট দিতে ভুলবেন না যেন । এতে করে আপনার প্রজেক্ট বেশী গ্রহণযোগ্য হবে ।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০১৭ দুপুর ২:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



