তুই যে সোফাটায় বসে আছিস, সেটাও সেকেন্ড হ্যান্ড। আমার হাতের যে মোবাইল দুটো দেখছিস, এই দুটোও।"
সোহেল এত অবলীলায় সব বর্ণনা করছিল, যেন এটা খুবই মজার একটা বিষয়। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষই চেষ্টা করে তার মুখোমুখি বসা লোকটাকে চমকে দিতে; সোহেল সে কাজটা ভালোই করতে পারে, এবং সে এখন সেটাই করছে।

"এই যে কম্পিউটারটা দেখছিস, তার নিচের টেবিলটা—ডাইনিং টেবিল, বাচ্চা বসার ওই দামি চলন্ত চেয়ার—সবই।"
"তোর সবই দেখছি সেকেন্ড হ্যান্ড!" খানিক বিদ্রূপের হাসি নিয়ে সোহেলের স্পেনফেরত ক্লাসমেট মামুন বলল।
"শোন, আমার বা আমাদের পুরো জীবনটাই সেকেন্ড হ্যান্ড।"
"তোরটা হইতে পারে এই সকল ফার্নিচারের মতো, আমার না। ধার করে কিনলেও নতুনই কিনি, সেকেন্ড হ্যান্ডের ধারেকাছে নাই।"
"গুড, ভেরি গুড!
দ্যাটস দ্য স্পিরিট অফ নিউলি আর্নড মানি।" সুযোগ পেয়ে খোঁচাটা দিতে ছাড়ল না সোহেল।
"এ কথা কস কেন, আমি কি কখনো তোদের সাথে সেভাবে চলছি?" বেদনার্ত হয়ে বলল মামুন, "এই যে স্পেন থেকে আসছি, এসে তোকে কল দিলাম, তোর এই সেকেন্ড হ্যান্ড বাসায় উঠলাম। চাইলেই অন্য কোনো বন্ধুর বাসা বা হোটেলে উঠতে পারতাম।"
"হুঁ, খুব পারতি। তবে এই বাসাটাকে সেকেন্ড হ্যান্ড না বলে সেকেন্ড ক্লাস বলতে পারিস।" "শোন, আমাদের পুরো জীবনটাই সেকেন্ড হ্যান্ড।" এক গ্লাস পানি নিল, হালকা চালে চুমুক দিল সোহেল। গলাটা ভিজিয়ে নিল। "এই যে তুই স্পেন থেকে আইছোস, ওইখানে অনেক পরিশ্রম করছস, এই পরিশ্রম করে টাকা-টুকা কামায়া এই দেশে এসে ফুটানি দ্যাহাস..."
"দেখালেও নিজের টাকায় দেখাই, কারো পকেট তো আর কাটি না।" খোঁচা মারতে ভুলল না মামুন।
"তুই প্রসঙ্গ পাল্টাচ্ছিস। স্পেনে যে কাজ করিস, সেটা কার জন্য?"
"কার জন্য আবার! কোম্পানির।"
"দ্যাটস দ্য পয়েন্ট! তুই তোর জীবনটা ওখানে কোম্পানির জন্য ব্যয় করছিস, এবং সেই জীবনটাই আবার নিজের জন্যই ব্যয় করছিস—যদি কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে। এইটাই সেকেন্ড হ্যান্ড জীবন!
বন্ধু সুজন, এইচএসসি পরীক্ষার আগে খুব নার্ভাস। কেন?
ও ইংরেজিতে খারাপ, পাশ করতে পারবে না। আর পাশ না করলে ওর জন্য মামার ঠিক করা চাকরিটা হবে না। ওকে ফিরে যেতে হবে আবার ওর বাপের সাথে খেতখামারে, যা আমরা কেউই চাই না, কেউই পছন্দ করি না। আমরা সবাই-ই মুক্তি চাই এই দুর্বিষহ জীবন থেকে।
জহির ওরে হেল্প করল পরীক্ষার হলে, নিজের পরীক্ষা, ক্যারিয়ার, লাইফ রিস্কে ফেলে। সুজন পাশ করল, খুব ভালো রেজাল্ট হলো ওর; জহির তুলনামূলক খারাপ করল। এই যে জহির আর সুজন জীবন বিনিময় করল, আ লিটল বিট, এইটাই সেকেন্ড হ্যান্ড জীবন।"
"দার্শনিক হয়ে গেছিস!" শ্লেষ করে বলল মামুন, "ওদের কার কী অবস্থা এখন?"
"সুজন চাকরি নিল, অল্প কিছুদিনের মাঝেই বিয়ে করে নিল। লাইফ সেটেল।"
"আর জহির?"
"জহির! ও অনেক ঘাটের পানি খেল, লিটেরালি অ্যান্ড ফিগারেটিভলি। বহুত পথ হাঁটল, হাঁটল আর হাঁটল... হারিয়ে যেতে যেতে কীভাবে যেন ও একটা ঘাট ম্যানেজ করে ফেলল।"
"ওর এই জীবনটাকেও কি তুই সেকেন্ড হ্যান্ড বলছিস?"
"না, এইটা ওর ফার্স্টহ্যান্ড—একেবারে যাপিত জীবন। আবার সেকেন্ড হ্যান্ডও বটে, চলতি পথে ওর জীবনটা ব্যয় হয়ে গেছে কারণে-অকারণে।"
"তোর আর জহিরের না একসাথে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল?"
"হ্যাঁ, ছিল। ওখানে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়, পরে আমাদের পথ আলাদা হয়।"
"গুড ফর হিম! নাউ হি হ্যাজ আ ফাকিং সেকেন্ড হ্যান্ড।"
"বাম হাতকেও সেকেন্ড হ্যান্ড বলা হয়, ওর ব্যবহারও কম না—বাঁ হাতের কারসাজি," সহাস্যে বলল সোহেল, "তা তুই হাত মারিস ফার্স্টহ্যান্ডে নাকি সেকেন্ড হ্যান্ডে?"
"তা তুমি কি কোক খেয়ে মাতাল হইছ সোনা?" হাসতে হাসতে উত্তর দিল মামুন।
"মামুন, তুইও কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড।"
"আবার কীভাবে?"
"আসলে ভুল বলছি। এ যাবৎ যত মেয়ের সাথে প্রেম করছিস, সবাই তোরে একটু করে ব্যবহার করলেও হান্ড্রেড হ্যান্ড ইউজড মাল।"
ছোট ভাই আসাদ দুটো স্টিক ধরিয়ে দিয়ে বলল, "গুরুজি লন, আমি শুরু করছি আপনার নামে।"
"জয় গুরু, জয় গুরু!"
"তুই যে মেয়েটাকে ধোঁকা দিলি তোর সাথে স্পেন নেওয়ার কথা বলে..."
"আরে নাহ, এসব মিথ্যে কথা! ওর সাথে আমার জাস্ট ফ্রেন্ডলি সম্পর্ক ছিল," এত সুইট করে মামুন বলল, বিশ্বাস না করলে জাস্ট পাপ হবে।
"সেই ফ্রেন্ডশিপ বেশ ডিপ ছিল, আই গেস। এতটা ডিপ ছিল যে সে তার স্বামী-সংসার, নার্সের চাকরি ছেড়ে দিতে চাইল। বুঝি না রে, বুঝি না! এ কী অদ্ভুতূরে জীবন!
ওর স্বামীকে স্পেনের ভিসা পেতে সাহায্য করার কথা বলছিলাম, পরে ও ওর নিজের জন্য চাইল। বলল, স্পেন গিয়া ওর স্বামী যদি ওকে ছেড়ে যায়..."
"স্যাভিয়ার তুমি, মামা!
দেখ, আবার সেই জীবন থেকে পালাবার গল্প। এই মেয়েটা কিসের আশায় জীবন থেকে খসতে চাইল? পালাতে না পারলে ওকে আবার ফিরে যেতে হবে ওর সেই নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংসারে, যা হয়তো দুই রুমের একটা ঘুপচি ঘর মাত্র।
দুই রুমে দুইটা জানালা থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। সে জানালায় আকাশ দেখা যায় না।
এই দেশে এত মানুষ, ভাগ করে দিলে ১ বর্গফুটের আকাশও ভাগে পাবে না।
হয়তো ওকে ফিরে যেতে হবে শূন্য হাতে, অসুস্থ বাবা-মায়ের সামনে, ছোট ভাইয়ের আবদার আর টিউশনের ফির মুখে।
ফিরে যেতে হবে সেই সমাজে, যেখানে টাকাই মানুষ মাপার একমাত্র ক্রাইটেরিয়া।
এই পচাগলা জীবনে ও যেতে চায়নি, আমরা কেউই চাই না, কেউই পছন্দ করি না। যেমন করে তুই পালাইছিস, মেয়েটাও পালাইতে চাইছে অর্থ ও দেহের বিনিময়ে। ওর লোভ ছিল জীবনের প্রতি, তোর লাভ।"
"তুইও তো পালাইতে চাইছিলি, পারিস নাই! এই খানাখন্দে পড়ে পচতেছিস। কী উদ্ধার করলি থেকে—তোর বা সমাজের? দেশের বার্ডেন হওয়া ছাড়া!"
"হ্যাঁ, আমিও!" স্টিকে একটা লম্বা টান দিয়ে... "এখনো পালাতে চাই, এখনো পালাই প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। ভাবছি আমার দুটো ফটোকপির জন্য না হয় আরেকটু সেকেন্ড হ্যান্ড হোক, অবসরে কাটুক না হয় আর খানিকটা সময়।"
"তুই পালিয়ে গিয়ে কী পেলি?"
"পেয়েছি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সন্তানের জন্য একটা অভাবহীন সংসার, বুড়ো বাপ-মায়ের চিকিৎসা ও মিনিমাম সেবা করার সামর্থ্য; পেয়েছি একটা স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা।"
"আর?" মুখ থেকে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করল সোহেল।
আসাদ ব্লুটুথ স্পিকারে কি একটা গান ছেড়ে দিল… “আমি আবার ক্লান্ত পথচারী” নেশা জমিয়ে দেয়ার
"পাইছি তোদের মতো গাধাদের থেকে দূরে থাকার সুযোগ, মোড়ের টংয়ের আড্ডায় না যাওয়ার সুযোগ, বর্ষায় কাদার রাস্তায় পা না রাখার সুযোগ, ডোবার নোংরা পানিতে মাছ না ধরার সুযোগ, কাদামাটিতে হা-ডু-ডু না খেলে কাপড় নোংড়া না করার সুযোগ..." মামুন স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে বের করল আর কী কী মিস করে সে। তালিকা এত বড়, মনে করতেও ভয় হয়।
ধোঁয়ার আস্তরণটা সোহেল আর মামুনের মধ্যবর্তী বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল। মামুনের শেষ কথাগুলোর পর ঘরের ভেতর একটা দীর্ঘ, অস্বস্তিকর নীরবতা ঝুলে রইল।
সোহেল ঠোঁটের কোণে জমা থাকা স্টিকটা ডিশের ওপর ঘষে নিভিয়ে দিল। সে কিন্তু রেগে গেল না। বরং তার চেহারায় এক ধরনের অদ্ভুত প্রবীণ প্রশান্তি ফুটে উঠল—যে প্রশান্তি কেবল পরাজিত বা সবকিছু বুঝে ফেলা মানুষের শেষ বয়সে আসে।
"বর্ষার কাদার রাস্তায় পা না রাখার সুযোগ..." সোহেল বিড়বিড় করে মামুনের শেষ শব্দগুলো আওড়াল, "তুই সুযোগ পাইছোস মামুন, ছাইড়া যাবার।"
মামুন কোনো জবাব দিল না। সে হাতের স্মার্টওয়াচের দিকে তাকাল। স্পেনের সময় আর ঢাকার সময়ের হিসাবটা তার মাথায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বাইরে গাড়ির হর্ন আর দূর থেকে ভেসে আসা ফেরিওয়ালার হাঁক—সবকিছুতেই এক ধরনের জীবন আছে, কিন্তু মামুনের কাছে সেটা এখন শুধুই শোরগোল।
"তুই আমাকে গাধা বললি, তাই না?" সোহেল শান্ত গলায় বলল, তবে এবার আর কোনো শ্লেষ ছিল না, "হয়তো আমি গাধাই। আমি ফার্স্টহ্যান্ড জীবন বাঁচতে গিয়ে নিজেকে সেকেন্ড হ্যান্ড বানিয়ে ফেলেছি।"
মামুন গ্লাসের শেষ পানিটুকু ঢোক গিলে শেষ করল। তারপর পকেট থেকে পার্স বের করে একটা কার্ড বের করতে গিয়ে আবার রেখে বলল, "জহির যেমন হেঁটে হেঁটে পথ খুঁজে পেয়েছিল, তুইও পেয়ে যাবি।"
সোহেল মৃদু স্বরে বলল, "আর যদি নাও পাই, আমার এই 'সেকেন্ড হ্যান্ড' জীবনটাই তো আমার নিজের গল্প। অন্য কারো লেখা চিত্রনাট্যে তো অভিনয় করছি না।"
আসাদ গানটা বন্ধ করে দিল। বারান্দা দিয়ে একঝলক বাতাস এসে ডাইনিং টেবিলের ওপর জমে থাকা ধোঁয়ার কুয়াশাটা ছড়িয়ে দিল। দুই ক্লাসমেটের মুখোমুখি বসে থাকা অবয়ব দুটি আবার স্পষ্ট হয়ে উঠল—একজন পালিয়ে গিয়েও আটকে আছে, আর অন্যজন আটকে থেকেও মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে, অনবরত।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




