শহরজুড়ে পুঁতিময় গন্ধ। বাইকের পেছনে বসে চুপচাপ ভাবছিল আবির
রাতের শহর, গন্তব্য মিরপুর, এলিটের ফাঁকা বাসা। গেট-টুগেদার: সাপ্তাহিক ক্লান্তিগুলো এখানে এসে ধোঁয়ায় ওড়ে, সুরায় শুদ্ধ হয়।
বিজয় সরণির সিগন্যাল ছাড়ার ঠিক আগে বাইকার হঠাৎ বলল, “জ্বী মামা, ঠিকই বলেছেন, গন্ধ আসতাছে।”

আবির চমকে উঠল। “আপনি কি মাইন্ড রিডিং করেন?”
“আমার লিসেনিং সেন্স হাইটেন্ড, মার্ভেলের সুপার হিরোদের মত।”
“ভালো, সব কিছু শুইনেন না, নিতে পারবেন না।”
“তা ঠিক বলেছেন, শুরুতে এইটা বেশ এনজয় করতাম। নিজেরে সুপার হিরো ভাবতাম, একটা নামও দিয়া ফালাইছিলাম। প্রথম ধাক্কা খাইলাম, মায়ের কথা শুনে। আমারে নিয়া চিন্তিত, আবার চিন্তিত না।”
“কেমন স্ববিরোধী হয়ে গেল না কথাটা!”
“আমাদের জীবনটাই তো স্ববিরোধিতায় পূর্ণ,” বলল বাইকার।
“যাক, বল, তোমার স্ববিরোধী গল্প, আমি ভালো লিসেনার।”
“একমাত্র ছেলে আমি, মায়ের বুড়াকালের একমাত্র পেনশন স্কিম।”
“ও! বুঝছি।” মাথা নাড়াল আবির।
আবির সোহরাওয়ার্দী থেকে দুটো স্টিক টেনে বাইকে উঠেছিল। তার ঘোর লাগছে।
“আচ্ছা, মামা, তোমার এই হাইটেন্ড লিসেনিং সেন্স কি বাই বার্থ?”
“না মামা, বাই ডেথ,” বলল বাইকার।
আবিরের ঘোর সামান্য কাটল। “বুঝলাম না।”
“শোনেন তাইলে লাস্ট ঘটনাটা,” বাইকার বলল।
“সেদিন মা মোবাইলে কল করল। মায়ের হার্টের সমস্যাটা বাড়ছে, জরুরি কিছু ওষুধ কিনতে হবে। বাসা ভাড়া দেওয়ার পরে হাতে তেমন টাকা-পয়সাও নাই। আগে রাতে দশটা ট্রিপ পাইতাম। এখন পাঁচটাও পাই না। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রাতে রাইড শেয়ার না করলেও চার দিন ধরে বাড়তি ট্রিপ মারছিলাম।”
বাইকার মিরপুর রোডে গিয়ার শিফট করল।
“পঞ্চম রাতে একটা ট্রিপ পেলাম। গন্তব্য: বনানী কবরস্থান। ছিনতাইকারীরা ধরল। গলায় ছুরি বসায়া দিছিল। বাইকটা নিতে পারে নাই। এত রক্ত ঝরছিল… একসময় চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল। নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার আগে শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরতেছিল—মায়ের ওষুধের টাকা। মায়ের বুড়াকালের একমাত্র পেনশন স্কিম রাস্তায় মইরা যাচ্ছে।
ভোরে ঠিকই উঠে দাঁড়াইলাম। শরীরে কোনো গরম নাই, পালস নাই। কিন্তু আমি হাঁটতে পারতেছি। ভোরের আলোয় শরীরটা কেমন যেন অচেনা লাগছিল। বেলা হতে ছায়ার পথ ধরে গিয়ে পকেটের রক্তমাখা টাকাগুলো মায়ের নম্বরে বিকাশ করলাম। তখনই টের পেলাম, আমার হাইটেন্ড সেন্স।”
বাইক ষাট ফুটের কাছাকাছি চলে এল।
“সেই থেকে রাতের ভয় দূর হয়ে গেল। রাতেই, শুধু রাতেই বাইক চালাই, এ শহরজুড়ে। কিছু স্পেশাল কাস্টমারও জুটে গেছে।”
বাইক থামল।
“কখনো যদি মনে হয়, আপনার কিছু শোনা দরকার, স্মরণ করবেন।”
আবির পকেট থেকে ভাড়ার টাকাটা দিল। বাইকার টাকাটা নিয়ে ইউটার্ন করে শহরের স্রোতে মিশে গেল।
আবির খেয়াল করল, শহরের সেই পুঁতিময় গন্ধটা আর নেই। বাতাস একদম পরিষ্কার। যেন বাইকার যাওয়ার সময় শহরের সব দুর্গন্ধ নিজের সঙ্গে নিয়ে গেছে।
আবির ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতের তালুতে বাইকারের ফেরত দেওয়া দশ টাকার ছেঁড়া নোটটা তখনো অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



