কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ পত্রিকার বয়স প্রায় ৬০ বছর হলো। ১৯৫৫ সালের ৫ মে এ পত্রিকা প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।
যখন আমি ‘আমোদ’-এ সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলাম, তখন সম্পাদক শামসুন নাহার রাব্বী আমাকে অন্যভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি হলাম ভিন্নজাতের এক মানুষ। খুবই অস্থিতিশীল। নিজের সিদ্ধান্ত ছাড়া কারোর সিদ্ধান্তেই চলতে পারি না। তাই তিনি তার ইচ্ছেমতো-মনমতো একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমাকে গড়তে পারেননি।
‘সাপ্তাহিক আমোদ’-এ কাজ করার সময়ে শামসুননাহার রাব্বীকে আমি খুবই কাছ থেকে দেখেছি। একবার তিনি আমাকে কাজের ফাঁকেই কলম থামিয়ে বলেন, ‘অসীম, তোমার সম্ভাবনা কিন্তু অফুরন্ত। তুমি তোমার সমূহ এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাও। জীবনটাকে নিয়ে এভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় থেকো না। সাংবাদিকতা যখন করতে এসেছো, সিরিয়াসলিই করো।’
আমি তাঁকে দুষ্টুমী করে বললাম, সবটা জীবনই তো পরে আছে খালাম্মা, পরেও সিরিয়াস হওয়া যাবে।
তিনি বললেন, পরে কী হবে তা আমরা কেউ জানি না। কে কতোদিন বাঁচবো, তাও জানি না। তাহলে? তাছাড়া তোমার বয়স এখন কতো ? আমি বললাম, ছাব্বিশ।
তিনি বললেন, এখনও তো পয়ত্রিশই হয়নি। অথচ কবি কবি কাজী নজরুল ইসলামের নির্বাক জীবনই স্থায়ী হয়েছিল ৩৫ বছর। নজরুল কি যৌবনে কোনোদিনও ভেবেছিলেন শেষ জীবনে তিনি এমন স্তব্ধ হয়ে যাবেন?
আরেকদিনের কথা। সেদিন শামসুননাহার রাব্বী খালাম্মার সঙ্গে আমার কথা হয় বিয়েতে ‘যৌতুক’ দেওয়া নিয়ে। ‘যৌতুক’ কেন দেয়া-নেয়া হয়, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে।
আমি বললাম , খালাম্মা, যৌতুক হলো ‘ঘুষ’। এর বিলোপ কোনোদিনও হবে না। প্রকরণ হয়তো বদলাবে। কিন্তু দূর হবে না। অফিস-আদালতে যতদিন ঘুষ থাকবে, পরিবার পরিজনেও যৌতুক বেঁচে থাকবে ততদিন এবং এর জন্য আমি কিছু সুবিধাখোর মানুষকেই অপবাদ দিলাম। তিনি বললেন, যৌতুক বলি আর ঘুষই বলি, সেটার লেনদেন রাজরাজাদের মধ্যেও ছিল। দিল্লীর মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে বাংলার সর্বশেষ সুবাদার ফিদাই খান মুঘল সম্রাটদের জন্য বাংলা থেকে সর্বপ্রথম সম্রাটের জন্য পাঁচ লাখ এবং সম্রাজ্ঞীর জন্য পাঁচ লাখ করে সর্বমোট দশ লাখ টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কেন? এটা ছিল এক ধরনের তোষামোদীই আর কী! অথচ এ টাকা পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ আরও গরীব হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এই সুবিধা প্রদানের প্রথার সঙ্গে পরিবার ব্যবস্থাপনায় যৌতুক প্রথারও খুব পার্থক্য খুব নেই। অথচ দুটোই অনিয়ম এবং সমাজের অস্থিরতা বৃদ্ধি করে।
কাজেকর্মে আমিও নাকি তখন খুব বেশিই অস্থির আর সিদ্ধান্তহীন ছিলাম, তখন শামসুননাহার রাব্বী খালাম্মা বলছিলেন। তিনি আমার অস্থিরতা নিয়ে খুব বেশিই চিন্তিত ছিলেন। খালাম্মা বাংলা ছাড়াও হিন্দি-উর্দু-ইংরেজিতেও কথা বলতে পারতেন। একদিন তাই আমাকে যা একটু রসিকতা করে বললেন, তা অনেকটাই এ রকম: ‘মুঝে তুমহারী ঈমানদারী পর ভরোসা হ্যায়, লেকিন তুম হামেশা দিমাগ কো ঠান্ডা রাখো---।’
আমি বললাম, কবি কাজী নজরুল ইসলাম শৈশবে তার এক চাচা বজলে করিমের কাছে শৈশবেই আরবী-ফারসী এবং উর্দু শিখেছিলেন। কিন্তু খালাম্মা আপনি হিন্দি শিখলেন কোথায়? তিনি হেসে জবাব দেন, কিছুটা তোমার খালুজানের কাছে, আর কিছুটা হিন্দী চ্যানেল দূরদর্শনে। যাও বললাম, তাও মুখস্থ করা বাক্যই একপ্রকার।
আমি যখন ‘আমোদ’ এ কাজ করতাম, তখন তিনি প্রায়ই বলতেন, তুমি কাজে মনোযোগী হও, তোমার মেধা আছে। মনোযোগী হলেই তুমি উন্নতি করবে। ভালো লাগলে ‘আমোদ’ এ কাজ করো, না হলে ঢাকায় গিয়ে অন্য কোনো পত্রিকায় কাজ করো। কিন্তু যেখানেই করো কাজ, সিরিয়াসলিই করো। বিকজ, জার্নালিজম অলওয়েজ প্রেসটিজিয়াস জব। মাই রিমার্কস এবাউট ইউ, প্লিজ ডোন্ট প্লে উইথ ইউর লাইফ। ইউ ক্যান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট টু ডু।
এই যে সিদ্ধান্তহীনতা তোমার, এটাই তোমার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়ে যেতে পারে। আর এই সমস্ত কথা শোনার পর আমি বলতাম, নোবডি নোউজ ইট, বাট আই নো, আই অ্যাম নট জিনিয়াস। সো আই ক্যান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট টু ডু।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০২০ বিকাল ৪:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



