‘বুকটা আমার নদীর মতো নির্মল ছিল ছেলেবেলায়। জন্মও এ বাংলার মাটিতে। কিন্তু বুঝতে পারলাম না মানুষ কেন এত লোভী আর পাষাণ হয়।’ দার্শনিকের মতো করে কথা বলা এ লোকটির নাম ঠিকানা শেষ পর্যন্ত আমি জানতে পারিনি।
নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমি মানুষ। এ মানুষই আমার নাম’। কোন জেলায় জন্ম জিজ্ঞেস করলে বলেন, এ মাটিতেই জন্ম হয়েছে। তাই বলে আমি কেবল এ দেশের নাগরিকই নই , সারা বিশ্বের নাগরিক। ভারত-পাকিস্তান যাওয়া আমার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়।
কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম দিকে বসে থাকা এ লোকটির সঙ্গে কথা হয়েছিল ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে। কথা বলে মনে হয়েছিল এ লোকটি জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ একজন মানুষ। আবার মনে হয়েছিল তিনি বোধ হয় কোন গোয়েন্দা সংস্থার লোক। বিশেষ করে পত্রিকার লোকশুনে যখন তিনি তার সমস্ত ঠিকানা গোপন করে ফেললেন।
তিনি বলেন , জগৎ সংসারের অধিকাংশ মানুষই অন্যের সঙ্গে প্রতারণা করে এবং নিজের অজান্তেই আবার প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়। রেল লাইনের সীমানা প্রাচীরের দেয়ালের কোল ঘেঁষে বসে কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে হাতের সিগারেটে সুখটান দেন লোকটি। টান শেষে বলেন, রাতের বেলা ঘুম হয় না। স্টেশনের গাছের পাতা ভেদ করা শত শত পাওয়ারের বাল্বগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। আর মানুষের এ জীবন প্রদীপের কথা ভাবি। আরও ভাবি , যিনি এ দেহের ভিতর প্রাণ প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছেন, তিনিও হয়তো আমাদের এভাবেই দেখছেন। ঘর সংসার করেছেন কী না জিজ্ঞেস করলে বলেন , ঘর-সংসার হলে কি আর রেলে রেলে সারাদেশ ঘুরি ? কখনো আবার দেশ ছেড়েও যাই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কিভাবে যান ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আপনাদের মতো সমাজ দেখানো ভদ্রলোক নই। আপনারা যারা প্যান্ট-শার্ট পরা লোকদেখানো ভদ্রলোক, তাদেরই সমস্ত বাধা। পাসপোর্ট-ভিসার বাধা, সংসারের মায়ার বাধা, আরো কতো-বাধা আপনাদের। আমাদের এমন কোন বাধা নেই। সকল বাধা ছিন্ন করে আমরা ওই আল্লাহর প্রেমে পড়ে দরগায় দরগায় ঘুরি। আমাদের হারামের টাকায় বিরানী খেতে হয় না। যখন কপালে থাকে , রিজিকে লয়, আল্লাহর তরফ থেকে চলে আসে।
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কোনো ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, চোর নেতাদের দিয়ে দেশের কোন মুক্তি নেই। এ দেশের মুক্তি আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারবে না। বাংলাদেশের কত রেল স্টেশনে জীবন কাটিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংখ্যা বলতে পারবো না। মনে হয় সব স্টেশনেই গিয়েছি। স্টেশনে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, যাদের ঘরবাড়ি নেই, বাড়িতে মা নেই, যাদের জন্য সুন্দর বাড়িতে মায়েরা-মেয়েরা কিংবা বউয়েরা নরম বিছানা করে রাখে না, তারা কোথাও জায়গা না পেলে শেষ পর্যন্ত এই রেল স্টেশনেই থাকে। রেল স্টেশনে থেকে থেকে অধিকাংশ মানুষ নষ্ট হয়ে যায়। কারণ মদ আর মেয়ে মানুষের প্রতি কোনো লালসা নেই, এমন লোক রেলস্টেশনে খুব একটা নেই। রাতের স্টেশন ফাঁদ ছাড়া আর কিছু নয়। নষ্ট মহিলা, নষ্ট পুরুষ আর ব্যাগটানা পার্টির কারণে সমস্ত নিরাপত্তাই থাকে হুমকির মুখে। তবে এর ফাঁকে ফাঁকে ফেরেশতার মতো মানুষও থাকে, যাদের সঙ্গ পেলে কথা শুনলে, বেঁচে থাকতে বড় ইচ্ছে করে।
আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী , জানতে চাইলে তিনি বলেন, সৎভাবে সুন্দর মন নিয়ে মরে যাওয়াই আমার ভবিষ্যতের কামনা। এছাড়া কোনো পরিকল্পনা নেই। শখ কেবল রাত জেগে রেলগাড়ি দেখা। শেষ রাত পর্যন্ত আমি রাত দেখি, রেলগাড়ি যেন আমার সঙ্গে কথা বলে। ভারি সুন্দর সে রেলগাড়ির হাসি। কিন্তু শরীরে তার কোন জৌলুস নেই। এদেশের গরীবের রেলগাড়ি। দেখলে মনে হবে দুর্ভিক্ষের রেল। ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি মনে মনে বলি, হে আল্লাহ কবে পাঠাবে তুমি তোমার সেই রেলগাড়ি , যে রেলগাড়িতে করে তোমার কাছে যাত্রী হয়ে আসবো আমি ? কবে ?
কুমিল্লা রেলষ্টেশনে অদ¢ুত এক লোকের সঙ্গে কথোপকথন: মদ আর মেয়ে মানুষের প্রতি লালসা নেই , এমন লোক রেলস্টেশনে খুব একটা নেই
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
কোথায় পাই পাগলের শ্বশুর

পাগলের পাতা ছাগলে খায়,
দাঁতের দোষটা হাতেই যে কয়;
দেয় রে দোষটা দেয় চোখের,
মনটা যে ধোয়া তুলসীপাতা,
কেউ দেখে না রে মুখের।
মুখের কথা ঠোঁটে কয়,
ছাগল ডাকে রে ভাই, ব্যাঁ-ব্যাঁ;
পাগলের কাজ পাগল করে সই,
সাধু... ...বাকিটুকু পড়ুন
পরিস্থিতি কি জটিল?

আজকের ডায়েরী- ২০৩

খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন
Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা
সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।