
আলোকচিত্র: জসীম অসীম: 1996
স্নিগ্ধাদের গ্রামে আছে হরেক রকম পাখি। আর আছে এক পদ্মদিঘি। সেই দিঘির জলে আছে নানাজাতের পদ্মফুল। সেই মাধবপুর গ্রামে হিজল গাছের এত ছায়া! আশেপাশের সব বাড়িতেই হিজল গাছের এত ছায়ার কারণে ঠিকভাবে রোদও নামতে পারে না। এ গ্রামে কৃষিজমি প্রায় নেই। গ্রামের সবাই প্রায় ছোটবাড়ি ব্যবসায়ী। সেই গ্রামেরই মেয়ে স্নিগ্ধা।
হিজল ফুলের গন্ধে সে কোনোদিনও পড়ায় মন দিতে পারেনি। এত হিজল তমাল গাছ যে গ্রামে থাকে, সেই গ্রামের মেয়েদের কি আর লেখাপড়া হয়! কোন হারামী যে এই মাধবপুর গ্রামটায় এত অর্জুন, এত অশোক, এত অশ্বথ্থ, এত নাগেশ্বর আর এত স্বর্ণচাপার গাছ লাগিয়েছে! এতে সর্বনাশ হয়ে গেছে স্নিগ্ধার।
স্বয়ং স্নিগ্ধাদের বাড়িতেই রয়েছে পাঁচ পাঁচটি দেবদারু গাছ। আর কৃষ্ণচূড়া এবং কাঠগোলাপে ছাওয়া স্নিগ্ধার পড়ার ঘর। কতোবার সে তার বাবাকে বলেছে কিছু গাছ কেটে দিতে। অথচ তার বাবা পারলে যেন আরও কিছু গাছ লাগায়। অনেক কষ্টে মাধ্যমিক পাশ করতে পারলেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সে বারবারই অনুত্তীর্ণ হয়। রাতের বেলা অনেকেই নাকি মাধবপুর গ্রামের এইসব গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় স্নিগ্ধার নাম ধরে কাউকে নাকি ডাকতে শোনা যায়। যেন ডাক নয়, আর্তনাদ। কেউ কেউ বলেছে, এ নাকি হিজলবনের ভূতেদের কারবার।
হিজল গাছের পাশ দিয়ে একদিন রাতে বাড়িতে আসার সময় কনকও স্নিগ্ধার নাম ধরে কাউকে ডাকতে শুনেছে। ভয়ে কনক পথই হারিয়ে ফেলেছিল। পরে হিজল গাছ ধরে ধরেই আবার আধা মাইলের মত পথ পার হয়ে স্নিগ্ধাদের বাড়িতে এসেছে। শেষে ওখান থেকে নিজের বাড়িতে ফিরেছে। সেই থেকে আর কনক গঞ্জ থেকে রাতের বেলা বাড়ি ফিরে না।
অশরীরী আত্মার কণ্ঠ শুনে কনক এমনই ভয় পেয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে অনেক মানুষেরই দেখা পাওয়া গেল, যারা রাতের বেলা হিজল গাছ থেকে স্নিগ্ধার নামে ডাকাডাকি করতে শুনেছে বলে সাক্ষ্য দিতে লাগলো। সেই থেকে গ্রামে এক ভয় ঢুকে গেল। এমনকি সন্ধ্যার মধ্যেই তাই সবাই গঞ্জ ছেড়ে বাড়ি ফিরতে লাগলো। এমন হলে যে গ্রামের সবাই ব্যবসায়ী, তাদের দিন কি চলবে!
মাধবপুর গ্রামের পাশের গ্রাম ফুলতলি। ওই গ্রামে স্নিগ্ধা নামে কোনো মেয়ে নেই। কিন্তু মাধবপুরে মাত্র একজন স্নিগ্ধা রয়েছে। সারা দুপুর, সারা বিকেল যে কেমন উদাসীন থাকে। মাধবপুরে মুসলিম বসতি নেই। কিন্তু পাশের গ্রাম ফুলতলিতে মুসলিম বসতি অনেক। ওখানে মাগরিবের আযান হয়ে গেলে ইদানিং ওই গ্রামের মানুষও খুব একটা বাইরে বের হয় না। মনে পড়ে যায় তাদের হিজল গাছের মগডাল থেকে স্নিগ্ধার নাম ধরে ডাক দেওয়ার কথা।
আরে এতো হিজল গাছ! ছোট্ট গ্রাম মাধবপুরে। এরই মধ্যে একদিন সন্ধ্যায় আকাশে ভীষণ মেঘ করেছে। সেদিন ছিল আবার হাটবার। এই অবস্থায় সন্ধ্যায় মাধবপুরের সবাই বাড়ি ফিরলো না। তবে বৃষ্টির পরপরই রাত নয়টার মধ্যে ফিরে এলো সবাই, শুধু নরেশ আর পরেশ বাবু ছাড়া।
তারা দুই ভাই। এক সঙ্গে আসবে মনে করে নয়টার পরই মিষ্টি দোকান বন্ধ করে বাড়িতে রওয়ানা হলো। দুই ভাই সাহস বাড়ানোর জন্য গল্প করতে করতেই বাড়ির দিকে আসছিলো। হঠাৎ নরেশ দেখলো পরেশের কোনো জবাব নেই। নরেশের হাতে ছিলো হারিকেন আর পরেশের হাতে টর্চলাইট। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো নরেশ। কিন্তু কোথায় পরেশ! পরেশের ছায়া পর্যন্তও নেই। নরেশ চিৎকার করে ডাক দিলো, পরেশ...। পরেশ...। সেই ডাক অনেক দূর ভেসে গেল কিন্তু পরেশের আর কোনো জবাবই এলো না।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৪:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



