somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ‘গীতাঞ্জলি’ পাঠ

১২ ই অক্টোবর, ২০১৮ ভোর ৬:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ডিসেম্বর, 1991, ঢাকা।
==============
অলংকরণ: জসীম অসীম:
===============
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে আর কেউ ‘নোবেল পুরষ্কার’ পায়নি। তাই আমি নিজেই আবার এই পুরষ্কার পাওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। 1989 সালে।
আমাদের বাড়ির মাহাম্মদ জ্যাঠা বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের পরে বিগত 75 বছর ধরেই আর সাহিত্যে বাঙ্গালিদের ‘নোবেল’ দেওয়া হয়নি। এই শূন্যতাই আমি এখন পূরণ করতে চাই।
1913 সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর আর বাঙ্গালীর খবর নেই?
এ বিষয়ে তিতাশ চৌধুরী সম্পাদিত ‘অলক্ত’ সাহিত্য পত্রিকায়ও প্রকাশিত একটি লেখা দেখলাম। কুমিল্লা শহরের রাণীর দিঘীর দক্ষিণপাড়ের তিতাশ চৌধুরীর ‘বৈশাখী’ বাসায় তখন আমার প্রায়ই যাওয়া হতো। তিনি অবশ্য ‘গীতাঞ্জলি’কে উঁচুমানের কাব্যগ্রন্থ মানতে নারাজ।
1988 সালেও কুমিল্লার অনেক বইয়ের দোকানে আমি ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থটির খোঁজ করেছি। এমনকি 1989 সালের প্রথম দিকেও। অবশেষে দীর্ঘদিন চেষ্টার পর 1989 সালের শেষের দিকেই কিনতে পেলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ।
কতোদিন ধরে এই গ্রন্থ খোঁজ করেছিলাম। অবশেষে পেলাম কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জের এক বইয়ের দোকানে। সম্ভবত ‘সুলতানিয়া লাইব্রেরী’তে।
প্রথম যেদিন শত কবিতার এই গ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ কিনেছিলাম, গ্রন্থটি হাতে পেয়েই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই পড়তে শুরু করলাম। এ গ্রন্থের প্রতিটি শব্দে স্রষ্টার প্রতি এতোই প্রেম, পড়তে গেলেই এখনো আমার চোখের জল বের হয়ে যায়।
কোনো কোনো লেখা লেখা হয়েছে শান্তিনিকেতনে, কোনোটির নিচে আবার লেখা রয়েছে বোলপুর...। আর তারিখ তো সব লেখাতেই রয়েছে। এই গ্রন্থ হাতে পাওয়ার পর পরই আমি আমার কবিতায় ‘স্থান-কাল’ লিখে রাখতে শুরু করি। আর দিনের পর দিন ধরে মুখস্থ করতে থাকি ‘গীতাঞ্জলি’র একেকটি গান অথবা কবিতা।
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে,
অন্তর মম বিকশিত কর,
আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা,
আজি বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে,
আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,
আজি গন্ধবিধুর সমীরণে,
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে,
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ,
আমারে যদি জাগালে আজি নাথ,
আমার নয়ন ভুলানো এলে,
আমার মিলন লাগি তুমি,
আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে,
আমার চিত্ত তোমার নিত্য হবে,
আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই,
আমি হেথায় থাকি শুধু,
আরো আঘাত সইবে আমার,
আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে,
আনন্দেরি সাগর থেকে এসেছে আজ বান,
একটি নমস্কারে প্রভু একটি নমস্কারে,
একলা আমি বাহির হলেম
তোমার অভিসারে,
এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে,
এই করেছ ভাল নিঠুর এই করেছো ভালো,
কত অজানারে জানাইলে তুমি কতো ঘরে দিলে ঠাঁই,
কথা ছিল এক তরীতে কেবল তুমি আমি,
কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে,
কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ,
কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো,
চিত্ত আমার হারাল আজ,
জগতে আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ,
মরণ যেদিন দিনের শেষে আসবে তোমার দুয়ারে,
মেঘের পরে মেঘ জমেছে,
যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিভে যায় বারে বারে,
যেথায় তোমার লুট হতেছে ভুবনে,
রূপসাগরে ডুব দিয়েছি,
শেষের মধ্যে অশেষ আছে,
সভা যখন ভাঙবে তখন,
সীমার মাঝে অসীম তুমি,
সুন্দর তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে,
হেথা যে গান গাইতে আসা আমার,
হে মোর দেবতা ভরিয়া এ দেহ প্রাণ,
হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে...ইত্যাদি।

প্রায় মুখস্থ করে ফেললাম যেন ওই কাব্যগ্রন্থটি। তারপর যখন ‘গীতাঞ্জলি’র গানগুলোও সুরে সুরে শুনতে লাগলাম, তখন আর এসব গান ভুলে কে? যেখানে কী না দিনের পর দিন মহৎ একজন কবি হওয়ার এবং ‘নোবেল’ পুরষ্কার পাওয়ার স্বপ্ন বুকের ভিতর লালন করেছি আমি। আর এর প্রমাণও রাখলাম একবার। 1991 সালে।
প্রথম ঢাকায় এলাম পড়তে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির সময় আমার মৌখিক পরীক্ষা নিলেন মরিয়ম ম্যাডাম। তিনি আমাকে অনেক প্রশ্নের পর হঠাৎই বললেন, রবীন্দ্র কবিতা কি পড়া আছে তোমার?
আমি বললাম, ‘গীতাঞ্জলি’ পুরো কাব্যগ্রন্থই প্রায় মুখস্থ আমার। ম্যাডাম তো তাজ্জব। বললেন, যেমন...! আমি ‘গীতাঞ্জলি’র কয়েকটি গান তাকে আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিলাম। আমি শোনালাম:
‘আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে;
চলেছে গরজি, চলেছে নিবিড় সাজে।
হৃদয়ে তাহার নাচিয়া উঠিছে ভীমা,
ধাইতে ধাইতে লোপ ক’রে চলে সীমা,
কোন্ তাড়নায় মেঘের সহিত মেঘে,
বক্ষে বক্ষে মিলিয়া বজ্র বাজে।
বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।
পুঞ্জে পুঞ্জে দূর সুদূরের পানে
দলে দলে চলে, কেন চলে নাহি জানে।
জানে না কিছুই কোন্ মহাদ্রিতলে
গভীর শ্রাবণে গলিয়া পড়িবে জলে,
নাহি জানে তার ঘনঘোর সমারোহে
কোন্ সে ভীষণ জীবন-মরণ রাজে।
বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।
ঈশান কোণেতে ওই যে ঝড়ের বাণী
গুরু গুরু রবে কী করিছে কানাকানি।
দিগন্তরালে কোন্ ভবিতব্যতা
স্তব্ধ তিমিরে বহে ভাষাহীন ব্যথা,
কালো কল্পনা নিবিড় ছায়ার তলে
ঘনায়ে উঠিছে কোন্ আসন্ন কাজে।
বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।’
আমার কণ্ঠে ‘গীতাঞ্জলি’র এমন উপস্থাপনা দেখে মরিয়ম ম্যাডাম আমাকে নিয়ে গেলেন রোকেয়া ম্যাডামের কাছে। রোকেয়া ম্যাডামকে আমি শুনিয়ে দিলাম:
‘অন্তর মম বিকশিত কর
অন্তরতর হে।
নির্ম্মল কর, উজ্জ্বল কর
সুন্দর কর হে।
জাগ্রত কর, উদ্যত কর,
নির্ভয় কর হে।
মঙ্গল কর, নিরলস নিসংশয় কর হে।
অন্তর মম বিকশিত কর
অন্তরতর হে।
যুক্ত কর হে সবার সঙ্গে,
মুক্ত কর হে বন্ধ,
সঞ্চার কর সকল কর্ম্মে
শান্ত তোমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত কর হে।
নন্দিত কর, নন্দিত কর
নন্দিত কর হে।
অন্তর মম বিকশিত কর
অন্তরতর হে!’
তারপর প্রায় সব ম্যাডাম এবং শিক্ষকগণ একই সঙ্গে দিলেন হাততালি। আমি ভীষণই শিহরিত হলাম। উপস্থিত ম্যাডামদের একজন ছিলেন একটু বয়স্ক। বললেন, ওর আর কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। ভর্তি করিয়ে নিন।
ভর্তির অনেকদিন পরে ক্লাসে এসে পরিচয় হলো সহপাঠি আবিদ হোসেনের সঙ্গে। তখন কথায় কথায় আবিদও বললো, ‘গীতাঞ্জলি’র অনেক গানই তার প্রিয়। বিশেষ করে ‘অন্তর মম বিকশিত কর অন্তরতর হে। নির্ম্মল কর, উজ্জ্বল কর সুন্দর কর হে।’
বাড়িতে গিয়ে আব্বাকে আমার এই ঘটনা বলাতে আব্বা তো খুব খুশিই হলেন। কিন্তু আব্বা হতাশাও ব্যক্ত করলেন। বললেন, শিল্পকলায় কিংবা চারুকলায় পড়ে নাকি পেশাগত জীবনে খুব ভালো করা যায় না। এমনকি আজকাল ধনী লোকের সন্তানেরাও নাকি বি.এ, বি.এস.এস ধারায় পড়ে না। তারা নাকি বি.এসসি, বি.কম. ইত্যাদি পড়ে। আর অতি শিক্ষিত ও ধনীদের সন্তানেরা নাকি ইঞ্জিনিয়ারিং, এল.এল.বি ও মেডিকেল কলেজগুলোতে ডাক্তারিই পড়ে।
আব্বার মুখে এ কথা শুনে আমার মনটা খুব খারাপই হয়ে গেলো। আব্বা পরোক্ষভাবে আমাকে বি.কম-টি.কম পড়ার ইচ্ছের কথাই বুঝালেন। কিন্তু মা আমার কোনো কাজে কোনোদিনও বাধা হননি। অথচ আব্বা উত্তরে গেলে বলবেন, ওদিকে সাপ। দক্ষিণে গেলে বলবেন, সেদিকে পাপ। আব্বা কোনো বিষয়কেই সরলভাবে দেখতে শিখেননি। অথচ আবার তিনিই অফিস থেকে ফেরার পর আমার কাছ থেকে মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ নিয়ে দীর্ঘসময় ধরেই পড়তেন।
আমাদের গ্রামের পশ্চিমের গ্রামের নাম এলাহাবাদ। শৈশবে আমি কতো গিয়েছি ওই গ্রামে। আমার তখন প্রায়ই মনে হতো ওই গ্রামে কোনো একসময় হেঁটে বেড়াতেন রবীন্দ্রনাথ। এমনকি আশেপাশের আরও আরও গ্রামে। সাইচাপাড়া, ফুলতুলি, লক্ষীপুর, ছেপাড়া, ধামতি, মোহনপুরে। এমনকি বেগমাবাদেও। আর এটা আমার বারবারই মনে হতে লাগলো এই ‘গীতাঞ্জলি’ পাঠের পরই। ‘গীতাঞ্জলি’ পাঠের পর আমি এক ধরনের পাগলই হয়ে গেলাম। ভবের পাগল নয়, ভাবের পাগল।

কম্পোজ-ঋণ: সাদিয়া অসীম পলি।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১৮ সকাল ৮:৪৩
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হে কাক! কালো কাক!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:১৭



আমার জীবনে আমি কোনো দিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারিনি। কিন্তু রাস্তা ঘাটে এই কাজটি করতে অনেককেই দেখেছি। আজ পান্থপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, তখন আমার প্রস্রাব পেলো। রাস্তায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নোটবুকের প্রথম পাতা

লিখেছেন  ব্লগার_প্রান্ত, ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:২৬



সব ঋতুতেই সন্ধ্যেবেলাটা স্বর্গীয়। সূর্যের শেষ আলোটুকু মেঘেরা ভাগ করে নেয়।সেই আলো, একেকদিন একেক রংয়ের।আজ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়ালাম। একটা ছোট্ট দোয়েল, একটু পরপর সতর্ক হয়ে শিস দিচ্ছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাহরা তাবাসসুম রোজা (পরী)

লিখেছেন সনেট কবি, ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:০৫



যাহরা তাবাসসুম রোজা(পরী) থাকে
পিতা রাজীব নুর ও মাতা সুরভীর
স্নেহের ছায়ার তলে। অন্তরে গভীর
রয়েছে তাদের কন্যা, সুপ্রিয় সন্তান।
পরীর নির্মল কান্তি সারল্যের তাকে
করেছে গ্রহণযোগ্য নয় যে অস্থীর
অযথা চঞ্চলতায়।ভাল আপুজীর
মাঝে আছে অনুপমা গুণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি কেন মুসলিম?

লিখেছেন সনেট কবি, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ৭:১১



আমি কেন মুসলিম? কারণ আমার
বিশ্বাস, ইসলামের সব কথা ঠিক,
এর বিপরীত কিছু নয়তো সঠিক,
সেজন্য মানি না আমি সেরকম কিছু।
তুলনা করেছি আমি অন্যের কথার
কিছুতে আমার মন ফিরেনি সে দিকে
ইসলাম মান্যতায় থেকে প্রাত্যহিক
ঘুরিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট্ট সোনামনিদের জন্য ছড়ায় ছড়ায় বাংলা অক্ষর পরিচয় (ইসলামী ভাবধারায় লেখা), পর্ব-০১

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ৯:৫৬



ছোট্টমনিদের জন্য সচরাচর বাজারে যেসব বই পাওয়া যায়, মনোপুত হয় না। আমার এই প্রচেষ্টাও খুব যে ভালো কিছু হয়েছে, তাও মনে হয়নি। আসলে এটা প্রাথমিক প্রচেষ্টা। পরামর্শ এবং সহযোগিতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×