গতকালের FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলায় মেসি অত্যন্ত নিষ্প্রভ ছিলেন। দর্শকদের তাকে মাঠে খুঁজতে হয়েছে, তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, মাঠের সর্বকোণে বল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে সকলের নিকট দৃশ্যমান হন নাই। তবে এ কথাও সত্য যে বিপক্ষ দলের একাধিক খেলোয়াড় তাকে ঘিরে শক্ত ব্যূহ তৈরি করে রেখেছিল। Argentina shines if Messi does. কিন্তু মেসিকে গতকাল একজন ফুটবলে অনাসক্ত, হতাশাগ্রস্ত, ও জয়লাভে উদাসীন খেলোয়াড় বলে মনে হয়েছে। তবে আর্জেনটিনার গোলরক্ষক খুব ভালো খেলেছেন। জান প্রাণ দিয়ে ম্যাচের পুরো সময়টাতে তো বটেই, দ্বিতীয় অতিরিক্ত সময়ের অর্ধেক পর্যন্ত তিনি অনেকগুলো চমৎকার গোলরক্ষা করে দলকে গোলশূন্য রেখেছিলেন। এর জন্য কৃ্তিত্ব তাকে দিতেই হয়। একেবারে তীরের কাছে এসে যে গোলটিতে তরী ডুবেছিল, সেটাতে তার করার কিছু ছিল না। সেটাও তিনি প্রথম ধাক্কায় ঠেকিয়েছিলেন, কিন্তু রি-বাউন্ডে স্পেনের ৭ নং (বদলি) খেলোয়াড়টি যে দর্শনীয় শটের মাধ্যমে গোলটি অর্জন করেছিলেন, কেবলমাত্র “Hands of God” ছাড়া সেটা ঠেকানোর আর কোন উপায়ই ছিল না বলা যায়।
এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে গতকাল স্পেনিয়ার্ডরা একচেটিয়াভাবে মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছে। তাদের তুলনায় আর্জেন্টাইনদেরকে মোটেই সমগোত্রীয় মনে হয় নাই। তবুও এই একপেশে খেলায় যে আর্জেন্টাইনরা খেলাটিকে প্রায় শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য রাখতে পেরেছিল, সেটা সম্ভব হয়েছে তাদের গোলরক্ষক এবং রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের জন্য। স্পেনিয়ার্ডদের ছোট ছোট পরিচ্ছন পাস দেয়া ও নেয়ার দক্ষতা ও কৌশল অত্যন্ত দর্শনীয় ছিল। এইসব ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে মাঠের দৈর্ঘে-প্রস্থে ইচ্ছেমত অবলীলায় ছুটাছুটি করে সুসমন্বিত আক্রমণ রচনায় তাদের দলের প্রত্যেকটি খেলোয়াড় মুন্সীয়ানার স্বাক্ষর রেখেছে। অভিনন্দন স্পেন দলকে, দু'ঘণ্টার এক ছন্দময় মহাকাব্যিক ফুটবল সারা বিশ্বের ফুটবল পাগল দর্শকদেরকে উপহার দেয়ার জন্য।
Football prodigy, ১৯ বছর বয়স্ক, ১৯ নম্বর জার্সিধারী বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল এর শুধু মাঠব্যাপী ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা ও আক্রমণের কৌশলই যে চোখে পড়েছে, তা নয়। তার খেলা-পরবর্তী বিনয় এবং বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের প্রতি সহৃদয়তা ও সদাচরণও নজর কেড়েছে। ফুটবল রণে পরাজিত বিপক্ষ দলের অধিনায়ক মেসিকে খেলার পর মাঠে ভগ্নহৃদয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকতে দেখে তিনি একাই ধীর পায়ে তার দিকে হেঁটে যান। মেসিও তার চেয়ে বিশ বছরের অনুজ ইয়ামালকে দেখে সম্মানের সাথে উঠে দাঁড়ান। ইয়ামাল তার গুরু মেসিকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে ও মাথায় সমবেদনার হাত বুলিয়ে দেন। এটাই খেলোয়াড়সুলভ আচরণ, এটাই মানবিকতা। পক্ষান্তরে আর্জেন্টিনা দলের দুই একজন খেলোয়াড়ের খেলা-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের প্রতি চড়াও হওয়ার অ-খেলোয়াড়সুলভ আচরণ খুবই দৃষ্টিকটু লেগেছে। এহেন আচরণ ফুটবল খেলোয়াড় এবং খেলাপ্রিয় দর্শকদের নিন্দা কুড়িয়েছে। এর ফলে, বিশ্বকাপ হারানোর সাথে সাথে তারা তাদের শুভাকাঙ্খী ও সমর্থকদের সমর্থন ও ভালোবাসাও হারান।
খেলার শুরুতে খেলাচ্ছলে আমি বন্ধুমহলে একটা ভবিষ্যদ্বাণী রেখেছিলাম। সেটা হচ্ছেঃ Argentina 2:1 Spain। অনেকেই অনেক রকমের prediction করেছিল, তার মধ্যে মাত্র একজনেরটাই সঠিক হয়েছিল। বলাবাহুল্য, আমার prediction ভুল হয়েছিল। খেলাশেষে নিঃসন্দেহে যোগ্যতর দলই জয়লাভ করে বিশ্বকাপ নিয়ে ঘরে ফিরেছে। খেলাটি দেখেছেন, এমন কেউই এ কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারবেন না বলে মনে করি। বিজয়ী দলের প্রতি অভিনন্দন রইলো, বিজিত দলের প্রতি সমবেদনা। উভয় দলের প্রতি ভবিষ্যতে আরও পরিচ্ছন্ন ও উন্নত মানের খেলা এবং খেলার মাঠে সর্বোচ্চ মানের খেলোয়াড়সুলভ আচরণ প্রদর্শনের আহবান ও শুভকামনা রইলো।
ঢাকা
২১ জুলাই ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৪৮৯
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



