
বুঝলাম, সিনেমাটোগ্রাফিতেও কাউসার চৌধুরীর বেশ দখল রয়েছে। অথচ সেই ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরাই ছিলো আমার ফটোগ্রাফি শেখার প্রথম ক্যামেরা। আমার ছাত্র আলাউদ্দিনের আব্বা আবদুর রাজ্জাক সৌদি আরব থেকে এ ক্যামেরা এনেছিলেন। কোম্পানীর নাম ছিলো সম্ভবত ‘ইয়াশিকা’ই। মডেল নম্বর মনে নেই।
তারপর লাইব্রেরীতে ফটোগ্রাফির বই নিয়ে পড়তে থাকলাম এক্সপোজার, শাটার স্পিড, অ্যাপারচার...ইত্যাদি বিষয়ে। কিন্তু এস.এল.আর ক্যামেরা পাই কোথায়! এছাড়া তখন ফিল্মের দামও ছিল আমার ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। ফিল্মের একটি রোলে মাত্র ৩৬টি ছবি তোলা যেতো। ক্যামেরার ‘ভিউ ফাইন্ডার’ ও ‘রেঞ্জফাইন্ডার’ তখন আমাকে পাগল করেই দিয়েছিল। একদিন এক সাংবাদিকের কাছে ‘নাইকন’ ক্যামেরা দেখলাম জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পাঠাগারে। তিনি ঠিক কোন পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন, আজ আর মনে নেই। তবে অখ্যাত কোনো পত্রিকা ছিলো সেটি। তার কাছে এগিয়ে গিয়ে আমার ‘ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরা’টি দেখিয়ে বললাম, এ ক্যামেরায় কি ফটোগ্রাফির চর্চা সম্ভব! তিনি না বলে আমাকে হতাশই করে দিলেন। তিনি দেখালেন যে, তার ক্যামেরার শাটার স্পিড ১/৫০০ থেকে অনায়াসে ৩০ সেকেন্ড বা তার বেশি। আর এই সুবিধা ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরায় নেই। তিনি বললেন, তোমার ক্যামেরাটি অটোমেটিক এক্সপোজার লক ক্যামেরার মতোই। তাই শিখতে হলে ক্যামেরা তোমার লাগবেই। এ কথা শুনে মন আমার খুব খারাপ হয়ে গেলেও প্রথমকার সেই ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরাতেই আমি ছবি তুলে গেলাম দিনের পর দিন। ঢাকার রাস্তায় হেঁটে হেঁটে তোলা সেসব সাদাকালো আর রঙ্গিন ছবিগুলোর অনেকগুলো এখনো আমার কাছে রয়েছে। তবে কালের ¯্রােতে অনেক আবার হারিয়েও গিয়েছে। ছবি তোলার পর নেগেটিভ ফিল্মকে পজিটিভ করার জন্য ডেভেলপ করতে হয়। ছাত্রজীবনে এই ডেভেলপের পয়সা আমার প্রায়ই পকেটে থাকতো না। ঢাকায় ফিল্মের রোল বইয়ের ব্যাগে নিয়ে দিনের পর দিন আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। পরে কুমিল্লায় এসে সাপ্তাহিক ‘আমোদ’ পত্রিকার বাকীন ভাইয়ের কাছ থেকে এস.এল.আর ক্যামেরা যদিও পেলাম, তখন দেখা দিলো আবার নতুন আরেক ভয়। ছবি তোলায় গলদ হলে এস.এল.আর ক্যামেরায় তোলা অনেক ছবিই নষ্ট হয়ে যায়। যদিও তখন আলোকচিত্রী মনজুর আলম বেগ-এর ‘ফটোগ্রাফি’ বিষয়ক বইপত্রগুলো আমার প্রায় মুখস্থই হয়ে গিয়েছিলো, তবু ‘গোমতি নদীর এপার ওপার’ ঘুরে ছবি তোলার পর ল্যাবে গিয়ে ফিল্ম ডেভেলপ করানোর সময় ভয়ে বুকের ভিতরটা হিম হয়ে থাকতো। ৩৬টা ছবির মধ্যে কতোটি ছবি আবার বাতিল হয়ে যায়, সেই ভয়ে। একবার এমন অনেক ছবিই কোনো কারণে নষ্ট হওয়ায় মন খুব খারাপই হলো আমার। আসলে তখন বাকীন ভাইয়ের ক্যামেরার শাটার স্পিড অপশনে ত্রুটি দেখা দিয়েছিলো। তিনি শাটার স্পিডের সাউন্ড শুনেই বুঝে নিলেন। আমার হাতে তার ক্যামেরার সমস্যা দেখা দেওয়ায় কিছুই বললেন না। বরং কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি ক্যামেরাটি ঠিক করে আবার আমার হাতে তুলে দিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই আমি আবার নেমে গেলাম ছবি তোলার কাজে। তখনকার দিনে না ছিলো কোনো মোবাইল এবং হাতে হাতে এতো ডি.এস.এল.আর ক্যামেরা। তাই যখন ছবি তুলতে বের হতাম, মানুষ অনেক সম্মান করতেন। আর যুবতী মেয়েদের কাছে এই ফটোগ্রাফার এবং ফটো সাংবাদিকরা ছিলেন ঈর্ষনীয় মানুষ। আমি যখন বাকীন ভাইয়ের এস.এল.আর ক্যামেরা আর তার ৮০-২০০ জুম ল্যান্সটি নিয়ে গহীন গ্রামে কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো বনেদী হিন্দু পাড়ায় চলে যেতাম, সুন্দরী মেয়েদের লাইন পড়ে যেত আমাকে দেখতে। জিন্স শার্ট-জিন্স প্যান্ট আর লাল নতুন একটি সাইকেল নিয়ে আমি যখন পাখির ছবি তুলতে বের হতাম, তখন যেন নিজেই নিজেকে ঠিক চিনে উঠতাম না। আর আমার প্রিয় জায়গা ছিলো ভারত-বাংলাদেশের অরন্যে ঘেরা সীমান্ত অঞ্চলগুলো। বাকীন ভাইকে এ কথা কখনোই বলিনি আমি। কারণ তখন তিনি আমার এবং ক্যামেরার নিরাপত্তার চিন্তায় হয়তো উদ্বিগ্ন থাকতেন। তাই। তবে অনেকেই বিয়ে, জন্মদিন...ইত্যাদি ছবি তুলে দেয়ার প্রস্তাব দিতেন। ওই ধরনের ছবির দিকে কখনোই আমার নেশা ছিলো না। ২০০৪ সাল থেকে আমি একেবারেই ছেড়ে দিলাম ফটোগ্রাফি। কিন্তু আজও আমার মনে পড়ে আমার ছাত্র আলাউদ্দিনের সেই ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরার কথা, যা দিয়ে আমার ফটোগ্রাফি চর্চার শুরু হয়েছিল। আলাউদ্দিন পরে আত্মহত্যা করেছিলো। বেঁচে থাকলে তাকে আজ ধন্যবাদ জানাতাম। প্রথম ক্যামেরা দিয়ে আমাকে সহায়তা করার জন্য। আর বাকীন ভাইকে তো ধন্যবাদ জানানোর কিছুই নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০১৯ ভোর ৬:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



