somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার প্রথম ফটোগ্রাফি: ১৯৯২

২৬ শে জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৯:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কণ্ঠশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি-র সামনে প্রায়ই এসে বসতেন। এটা ১৯৯২ সালের কথা। কখনো গানও গাইতেন। আমরা তার গানও শুনতাম। কিন্তু তার গান শুনে কখনোই তাকে টাকা দিতাম না। তার শরীর দেখলেই বুঝতে পারতাম, তিনি কতোটা অভাবে রয়েছেন। কিন্তু আমরা তাকে টাকাপয়সা দিতাম না। একদিন টি.এস.সি-তে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম আমরা কয়েক বন্ধু। কয়েকজন থিয়েটারের কর্মী, বাকিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। সহসা আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন অভিনেতা কাউসার চৌধুরী। তিনি বললেন, আপনারা আসুন। আমরা সবাই মিলে কণ্ঠশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়ার কন্ঠে গান শুনবো। আমরা গেলাম। সুফিয়া কয়েকটি গান গাইলেন। সর্বশেষ গাইলেন, ‘পরাণের বান্ধব রে, বুড়ি হইলাম তোর কারণে।’ কণ্ঠশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়ার গান শেষ হতেই অভিনেতা কাউসার চৌধুরী বললেন, আপনারা এতক্ষণ কাঙ্গালিনী সুফিয়ার গান শুনেছেন। এবার সবাই মিলে তাকে কিছু টাকা দেন। আমরা আগে ভাবিনি যে, তার গান শুনে তাকে টাকা দিতে হবে। হয়তো এ কথা শুনলে আগে কেউ কেউ তার গানই শুনতে চাইতো না। কিন্তু যেহেতু গান শুনে ফেলেছি, আর কাউসার চৌধুরী স্বয়ং টাকা দিতে বললেন, তখন তো আর না দিয়ে উপায় নেই। এবার আমরা সবাই মিলে তাকে কিছু টাকা দিলাম। একজন একটু দেবো কী দেবো না ভাব দেখাতেই কাউসার চৌধুরী দিলেন তাকে ধমক। বললেন, আপনাদের বড় লোকের পোলাপানের এই বড় দোষ। অথচ আমার কাছে ছিলো মাত্র নাস্তার টাকাটাই। সেখান থেকেই সামান্য বাঁচিয়ে আমিও টাকা দিলাম। তারপর কাউসার চৌধুরীকে বললাম, কাউসার ভাই-আমার বইয়ের ব্যাগে একটি ক্যামেরা রয়েছে। আমি কাঙ্গালিনী সুফিয়ার কয়েকটি ছবি তুলতে চাই। তিনি সম্মতি দিতেই আমি কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। কাউসার চৌধুরী বললেন, এ ক্যামেরা তোমার! আমি বললাম, না। এটি আমার ছাত্র আলাউদ্দিনের ক্যামেরা। কিন্তু আমার ফটোগ্রাফির ভীষণ নেশা। তাই সঙ্গে ক্যামেরা রাখি এবং মাঝে মাঝে ছবি তুলি। তিনি বললেন, আরে এতো ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরা। এ দিয়ে তো তুমি ফটোগ্রাফি শিখতে পারবে না। তুমি একটি এস.এল.আর ক্যামেরা কিনে ফটোগ্রাফি করো। আমি আর কিছুই বলিনি তাকে। কয়েক দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে দেখলাম ভিডিও ক্যামেরায় কয়েক বিদেশীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছেন কাউসার চৌধুরী। সঙ্গে আছেন রামেন্দু মজুমদারও।
বুঝলাম, সিনেমাটোগ্রাফিতেও কাউসার চৌধুরীর বেশ দখল রয়েছে। অথচ সেই ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরাই ছিলো আমার ফটোগ্রাফি শেখার প্রথম ক্যামেরা। আমার ছাত্র আলাউদ্দিনের আব্বা আবদুর রাজ্জাক সৌদি আরব থেকে এ ক্যামেরা এনেছিলেন। কোম্পানীর নাম ছিলো সম্ভবত ‘ইয়াশিকা’ই। মডেল নম্বর মনে নেই।
তারপর লাইব্রেরীতে ফটোগ্রাফির বই নিয়ে পড়তে থাকলাম এক্সপোজার, শাটার স্পিড, অ্যাপারচার...ইত্যাদি বিষয়ে। কিন্তু এস.এল.আর ক্যামেরা পাই কোথায়! এছাড়া তখন ফিল্মের দামও ছিল আমার ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। ফিল্মের একটি রোলে মাত্র ৩৬টি ছবি তোলা যেতো। ক্যামেরার ‘ভিউ ফাইন্ডার’ ও ‘রেঞ্জফাইন্ডার’ তখন আমাকে পাগল করেই দিয়েছিল। একদিন এক সাংবাদিকের কাছে ‘নাইকন’ ক্যামেরা দেখলাম জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পাঠাগারে। তিনি ঠিক কোন পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন, আজ আর মনে নেই। তবে অখ্যাত কোনো পত্রিকা ছিলো সেটি। তার কাছে এগিয়ে গিয়ে আমার ‘ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরা’টি দেখিয়ে বললাম, এ ক্যামেরায় কি ফটোগ্রাফির চর্চা সম্ভব! তিনি না বলে আমাকে হতাশই করে দিলেন। তিনি দেখালেন যে, তার ক্যামেরার শাটার স্পিড ১/৫০০ থেকে অনায়াসে ৩০ সেকেন্ড বা তার বেশি। আর এই সুবিধা ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরায় নেই। তিনি বললেন, তোমার ক্যামেরাটি অটোমেটিক এক্সপোজার লক ক্যামেরার মতোই। তাই শিখতে হলে ক্যামেরা তোমার লাগবেই। এ কথা শুনে মন আমার খুব খারাপ হয়ে গেলেও প্রথমকার সেই ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরাতেই আমি ছবি তুলে গেলাম দিনের পর দিন। ঢাকার রাস্তায় হেঁটে হেঁটে তোলা সেসব সাদাকালো আর রঙ্গিন ছবিগুলোর অনেকগুলো এখনো আমার কাছে রয়েছে। তবে কালের ¯্রােতে অনেক আবার হারিয়েও গিয়েছে। ছবি তোলার পর নেগেটিভ ফিল্মকে পজিটিভ করার জন্য ডেভেলপ করতে হয়। ছাত্রজীবনে এই ডেভেলপের পয়সা আমার প্রায়ই পকেটে থাকতো না। ঢাকায় ফিল্মের রোল বইয়ের ব্যাগে নিয়ে দিনের পর দিন আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। পরে কুমিল্লায় এসে সাপ্তাহিক ‘আমোদ’ পত্রিকার বাকীন ভাইয়ের কাছ থেকে এস.এল.আর ক্যামেরা যদিও পেলাম, তখন দেখা দিলো আবার নতুন আরেক ভয়। ছবি তোলায় গলদ হলে এস.এল.আর ক্যামেরায় তোলা অনেক ছবিই নষ্ট হয়ে যায়। যদিও তখন আলোকচিত্রী মনজুর আলম বেগ-এর ‘ফটোগ্রাফি’ বিষয়ক বইপত্রগুলো আমার প্রায় মুখস্থই হয়ে গিয়েছিলো, তবু ‘গোমতি নদীর এপার ওপার’ ঘুরে ছবি তোলার পর ল্যাবে গিয়ে ফিল্ম ডেভেলপ করানোর সময় ভয়ে বুকের ভিতরটা হিম হয়ে থাকতো। ৩৬টা ছবির মধ্যে কতোটি ছবি আবার বাতিল হয়ে যায়, সেই ভয়ে। একবার এমন অনেক ছবিই কোনো কারণে নষ্ট হওয়ায় মন খুব খারাপই হলো আমার। আসলে তখন বাকীন ভাইয়ের ক্যামেরার শাটার স্পিড অপশনে ত্রুটি দেখা দিয়েছিলো। তিনি শাটার স্পিডের সাউন্ড শুনেই বুঝে নিলেন। আমার হাতে তার ক্যামেরার সমস্যা দেখা দেওয়ায় কিছুই বললেন না। বরং কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি ক্যামেরাটি ঠিক করে আবার আমার হাতে তুলে দিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই আমি আবার নেমে গেলাম ছবি তোলার কাজে। তখনকার দিনে না ছিলো কোনো মোবাইল এবং হাতে হাতে এতো ডি.এস.এল.আর ক্যামেরা। তাই যখন ছবি তুলতে বের হতাম, মানুষ অনেক সম্মান করতেন। আর যুবতী মেয়েদের কাছে এই ফটোগ্রাফার এবং ফটো সাংবাদিকরা ছিলেন ঈর্ষনীয় মানুষ। আমি যখন বাকীন ভাইয়ের এস.এল.আর ক্যামেরা আর তার ৮০-২০০ জুম ল্যান্সটি নিয়ে গহীন গ্রামে কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো বনেদী হিন্দু পাড়ায় চলে যেতাম, সুন্দরী মেয়েদের লাইন পড়ে যেত আমাকে দেখতে। জিন্স শার্ট-জিন্স প্যান্ট আর লাল নতুন একটি সাইকেল নিয়ে আমি যখন পাখির ছবি তুলতে বের হতাম, তখন যেন নিজেই নিজেকে ঠিক চিনে উঠতাম না। আর আমার প্রিয় জায়গা ছিলো ভারত-বাংলাদেশের অরন্যে ঘেরা সীমান্ত অঞ্চলগুলো। বাকীন ভাইকে এ কথা কখনোই বলিনি আমি। কারণ তখন তিনি আমার এবং ক্যামেরার নিরাপত্তার চিন্তায় হয়তো উদ্বিগ্ন থাকতেন। তাই। তবে অনেকেই বিয়ে, জন্মদিন...ইত্যাদি ছবি তুলে দেয়ার প্রস্তাব দিতেন। ওই ধরনের ছবির দিকে কখনোই আমার নেশা ছিলো না। ২০০৪ সাল থেকে আমি একেবারেই ছেড়ে দিলাম ফটোগ্রাফি। কিন্তু আজও আমার মনে পড়ে আমার ছাত্র আলাউদ্দিনের সেই ফিক্সড ল্যান্স ক্যামেরার কথা, যা দিয়ে আমার ফটোগ্রাফি চর্চার শুরু হয়েছিল। আলাউদ্দিন পরে আত্মহত্যা করেছিলো। বেঁচে থাকলে তাকে আজ ধন্যবাদ জানাতাম। প্রথম ক্যামেরা দিয়ে আমাকে সহায়তা করার জন্য। আর বাকীন ভাইকে তো ধন্যবাদ জানানোর কিছুই নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০১৯ ভোর ৬:৪৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নক্ষত্রের বিদায়!

লিখেছেন এম টি উল্লাহ, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ ভোর ৬:৫২


দেশবরেণ্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি, সাবেক স্পীকার, সাবেক মন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য, ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার স্যার রাত ৪ টা ১০ ঘটিকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা আলোচনায় থাকারই কৌশল মাত্র

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৮

চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া সাবেক স্বৈরশাসক ও বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা দেওয়াল গাঁথ

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৩১


একটা দেওয়াল গাঁথ.. দেওয়াল
কুৎসিত ভাবনার পাথারে
দৃষ্টি ভঙ্গির অন্তরে অন্তরে
একটা দেওয়াল গাঁথ.. দেওয়াল।
ও কুৎসিত তোমার, বোধ শক্তি শূন্য
দৃষ্টি ভঙ্গি কতটা রেখেছ অন্ধ
হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি কেমনে তুমি
এভাবেই পার কুৎসিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মান্তরের ক্ষুধা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:০৮




ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, সেই সাথে গুমোট আকাশ। মেঘাচ্ছন্ন  আবহ । একটানা টুপটাপ আওয়াজ ছাড়া চারদিক সুনসান।বৃষ্টি তার ক্লান্তি কাটাতে  যেই একটু থমকে দাঁড়িয়েছে অমনি বুনো শালিকেরা নেমে এলো খাবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা খাদক ছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আজকে সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু একটা এমন তথ্য দিলেন যেটা শুনে বাংলাদেশের আমজনতা রীতিমতো ক্যালকুলেটর হাতে বসে গেল। কথা হচ্ছে শেখ হাসিনার খাবার খরচ নিয়ে। কোন সালে কত টাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×