somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈদের উপহার (একটি ইরাকী গল্প)

০৩ রা জুলাই, ২০০৮ রাত ১:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মূল : নূরুল জান্দালী
অনুবাদ : আশরাফ মাসরুর


আত্মবিস্মৃত হয়ে সে হাটছিল; ঠোটে লেগে ছিল কষ্টার্জিত মৃদু হাসির রেশ, খুশিতে মাতোয়ারা হবার সময় যে ক্রমশ:ই ঘনিয়ে আসছে; কাল ঈদ।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, এরই মধ্যে সে কান্ত দুটি পা নিয়ে এগিয়ে চলছে, নিরবধি। ইতস্তত: ফুটপাথের খানাখন্দের মধ্যে জমে থাকা পানি ছেড়াখোরা জুতার ফাক গলে ভিতরে ঢুকছে, পানির অস্বস্তিকর স্যাতস্যাতে শীতল স্পর্শে মেয়েটি বারবার কেঁপে উঠছে, কিছুন পরপরই সে জুতার ভেতর প্রবেশ করা পানি ঝেরে ফেলে দিচ্ছে। তালিযুক্ত জ্যাকেট দিয়ে মাথা ঢেকে সে দ্রুত পা ফেলে চলছিল। বৃষ্টিভেজা শীতল এই রাত্রি তার অবিরত এই চলায় বিন্দুমাত্রও বাধা সৃষ্টি করতে পারছে না। ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের দৃশ্যগুলি তাকে কেবল তাড়িয়ে ফিরছে; বৃষ্টি তার সকল দু:খÑকষ্টের সাথী হয়ে সঙ্গ দিতে থাকল।
এই তার প্রথম অভিজ্ঞতা; প্রধান সড়কের ফুটপাথে কোথাও রক্তের দাগ চোখে পড়ছেনা, শুনতে হচ্ছেনা কোন কান্নার আওয়াজ। নিশ্চিন্ত, ভারহীন সে চলতে লাগল, হাত দুটি দুদিকে ছড়িয়ে। হঠাৎ তার মনে হল শহীদ আব্বু তার সামনেই দাড়িয়ে আছেন, তার পানে নীরব তাকিয়ে আছেন; সে আরো দ্রুত হাঁটতে লাগল। চারদিক আলোয় ঝলসে বিজলি চমকাচ্ছে, বজ্রের হুংকারে আশপাশ যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে; খরগোশ ছানার মত, সেও বাধ্য হল একটি বোমায় বিধ্বস্ত একটি বাড়ির ধ্বংসস্তুপের আড়ালে আশ্রয় নিতে।
ছায়ার মত একটি হাসি তার ঠোটে ফুটে উঠল;―‘আজই নাকি ঈদের রাত’ ―ক্ষীনস্বরে তার স্বগতোক্তি।
-সারাটি বছর তুমি সুখে থাক’......
অশরীরি এই স্বর তাকে চমকে দিল। ভয়ে সে ঈষৎ চিৎকার করে উঠল। ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেল, তারই বয়েসি একটি বালক বৃষ্টির ছাট থেকে আত্মরার জন্য পরিতক্ত্য এই বাড়িটির আরেক কোণে দাঁড়ানো।
-কে তুমি ? শুধালো সে ভীতস্বরে।
-চিনতে পারো নি, আমি তোমার সহপাঠি আব্দুল্লাহ !’ জবাব ভেসে আসল।
-আব্দুল্লাহ ! তুমি ! আসলে তোমাকে প্রথমে চিনে উঠতে পারি নি, তুমি আমাকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। স্বস্তির শ্বাস ফেলল মেয়েটি।
-ভয় পাবার কিছু নেই। কিন্তু বলতো, এই নিশি রাতে কিসে তোমাকে এখানে নিয়ে এল ? কৌতুহলি আব্দুল্লাহ ফের শুধালো।
-আমি আব্বুকে খুজছি,.......তাঁকে ঈদের চুমু খাবো বলে ! কিন্ত তুমি এখানে এই সময় কি করছ ?’
-আমি ঈদের তালাশে ফিরছি,.......
-তা তুমি পাবে না, বহুকাল পূর্বেই সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে,......
-তোমার কল্পনার মতই, নিথর রাত, শহরও আকাশের সাথে কাঁদছে.......
-আ....হ ! কি সুন্দর আকাশ ! চাঁদের প্রস্থানে সেও কাঁদছে’.........
-আমি আম্মুকে আমার জন্য নতুন ট্রাউজার সেলাই করতে দেখে এসেছি’..... আসলে তা নতুন নয়, বরং তা আমার একমাত্র ভাই আসেমের; ওরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। আমি যতবারই এই ট্রাউজার পরিনা কেন, সে আমার সাথে আর কখনো রাগ করবে না। আমার পুরোন ট্রাউজার পড়লে আমিও কারো উপর রাগ করবো না’....
-আর আমার আম্মুকে প্রতিবেশিনীদের সাথে মিলে মিষ্টান্ন তৈরি করতে দেখে এসেছি, তার কাছে ময়দা-ঘি কিছুই ছিল না। কেবল শীতকালের জন্য জমিয়ে রাখা খাদ্যদ্রব্য বাদে তার কাছে অন্য কিছুই ছিল না, তিনি কাঁদছিলেন............ তারা তখন আটা, ঘি ও চিনি নিয়ে তার দরজায় এসে দাঁড়ায়। অত:পর সবাই মিলে গানের সুরে সুরে আটার খামিরা তৈরি করে ঈদের হালুয়া বানানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
-তো , এবার চল , ফেরা যাক। তোমার আম্মু আবার চিন্তা করবেন’.....
-না ! আমি যাবো না! আব্বুকে ঈদের চুমো না দিয়ে আমি বাসায় ফিরে যাবো না। আমাকে তিনি ডাকছেন, তার ঈদের উপহার, একমাত্র আমিই। তার একান্ত ইচ্ছা― ঈদের রাত্রটি আমি তার সাথে কাটাবো ! ....
-তোমার আব্বু শহীদ হয়েছেন, কখনোই আর ফিরে আসবেন না; তিনি জান্নাতে আছেন।...
-কিন্তু আমি তো তাকে দেখছি, ঐ তো আব্বু, বেশ কাছেই আছেন। আর দাঁড়িয়ে দাঁিড়য়ে মুচকি মুচকি হাসছেন, আমাকে কোলে নেওয়ার জন্য দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি খুবই আনন্দময় স্থানে আছেন, আমি তার কাছে যাবো।’....
-কোথায় ? আমি তো তাকে দেখছি না, এখানে কেবল ওরাই আছে। বিমান দিয়ে রাত্রির নিরব সৌন্দর্যকে পংকীল করে দেবে বলে। ওরা আবার ফিরে আসছে; এখুনি বোম্বিং শুরু হবে।.........ফিরে এসো, ফিরে এসো, এসো......তুমি ওদের শিকার হবে।
না ! বরং আমি আমার শহরের জন্য শহীদ হবো..............আর হবো― ঈদের উপহার !!!



৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×