প্রথমেই বলে নেই- লেখাটি আমার নিজের নয়। কপি করেছি। তবে অনুনোমোদিত কপি নয়। লেখাটি বর্তমান সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এখানে হুবহু তুলে ধরছি।
লেখাটি বিশেষ ব্যবস্থায় ছাপানো আজকের দেশেরপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। লেখিকা: রুফায়দাহ পন্নী, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দেশেরপত্র:
মূল লিংক
ষোল কোটি বাঙালিকে যাবতীয় বিভেদ, দলাদলি, ধর্মব্যবসা ও ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার নিমিত্তে দৈনিক দেশেরপত্রের উদ্যোগে সারা দেশব্যাপী সভা-সেমিনার আয়োজিত হচ্ছে। এরই সুবাদে কয়েকটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে আমি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা যেমন রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নওগাঁ অঞ্চলে ভ্রমণ করেছি। এই অঞ্চলগুলোর মাটি ও মানুষকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি, জানার চেষ্টা করেছি, নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ফলে তাদের সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে আমি মোটামুটি একটি বাস্তব ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছি। সেখান থেকে ফিরে নিতান্তই নিজের দায়বদ্ধতার কথা চিন্তা করে পাঠকদের জন্য কিছু কথা শেয়ার না করে পারছি না। এখানে আমি চেষ্টা করব উত্তরাঞ্চলের মানুষগুলোর প্রধান একটি দুর্গতি তথা পানি সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে যুক্তিযুক্ত আলোকপাত করার।
কুড়িগ্রাম-এ দৈনিক দেশেরপত্র আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করার জন্য রংপুর থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম। কিছুদূর এগোতেই পৌঁছলাম কয়েকবছর আগে উদ্বোধন হওয়া তিস্তা ব্রিজে। গাড়ি যখন ব্রিজের মাঝ বরাবর, তখন তিস্তা নদীটি ভালোভাবে দেখার জন্য গাড়ি থেকে নামলাম। কিন্তু যা দেখলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সে দৃশ্য প্রকাশ করার কোন ভাষা আমার নেই। শুধু এটুকুই বলে রাখি যে, যে স্রোতস্বিনী তিস্তা নদী একদা পুরো উত্তরবঙ্গকে শাসিয়ে বেড়াতো, মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে আজ সে নিজেই অস্তিত্বের সঙ্কটে পতিত হয়েছে। এ যেন নদী নয়, ধু ধু বালুচর। তারপর আমি যখন ক্রমাগত উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলাগুলোতে একের পর এক প্রবেশ করছিলাম, অবাক হয়ে দেখলাম এই অঞ্চলগুলোর একটি নদীও এখন জীবিত নেই। সব ক’টা নদী ধু ধু মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। সেগুলোতে না শস্য উৎপাদনের কোন উপায় আছে, না অন্য কোন কাজের। মাটি ফেটে এমন চৌচির প্রান্তরে পরিণত হয়েছে যেখানে হাঁটাচলারও কোন সুযোগ নেই। নদীর ধার বেয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটলেও কোন কোন জায়গায় এক ফোঁটা পানি চোখে পড়ে না। যুক্তি দেখাতে পারেন- শুকনো মৌসুম, কিন্তু শুকনো মৌসুমেও নদী এভাবে শুকিয়ে যাবার কথা নয়, যেমনটা দেখে এলাম। যে ক্ষেতগুলো অতীতে সোনাভরা ফসল উপহার দিয়েছে, দেখলাম পানির অভাবে কীভাবে তা শুকিয়ে আছে, ফসলগুলো মরে যাচ্ছে, গাছপালাগুলো রূক্ষ হয়ে আছে। বাংলার সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, উর্বর মাটি কীভাবে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেটা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ হয়তবা বিশ্বাসই করতে পারবেন না। আমরা সবাই জানি এমন অবস্থা সৃষ্টির কারণ কী। কারও দ্বিমত নেই যে, বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তই মূলত এহেন অবস্থার পেছনে দায়ী। এক সময়ের উচ্ছ্বলা যৌবনা তিস্তা এখন অপমৃত্যুর পথে। আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদী নীতিমালাকে বৃদ্ধাংগুলি এবং মানবতার প্রতি বিদ্রুপ করে তিস্তার ভারত অংশে গজলডোবার সবক’টি গেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পানি সরিয়ে নিজের সেচ কাজ এবং বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের ১২৫ কিলোমিটার তিস্তা অববাহিকায় জীবনযাত্রা, জীব-বৈচিত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ৬০ হাজার ৫০০ হেক্টর বোরোর জমিতে পানি নেই। অর্ধ লাখ জেলে পরিবারে শুরু হয়েছে উপোস থাকার দিন। ওদিকে প্রমত্তা পদ্মা এখন ধুধু বালুচর, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে পানি নেই পদ্মায়। একসময় প্রবল খরস্রোতা করতোয়া নদীর অস্তিত্ব বিলীনের পথে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদী পানিশূন্য এবং বিশাল চর জেগে ওঠায় সেচ সুবিধা এখন হুমকির মুখে। অন্যদিকে নওগাঁর এক সময়ের খরস্রোতা আত্রাই নদী এখন মৃতপ্রায়। ৫০ কিঃ মিঃ দৈর্ঘ্যরে এ নদীটি ভারত থেকে এসে নওগাঁ জেলায় প্রবেশ করে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। কিন্তু বাঁধ নির্মিত হবার কারণে এতদঞ্চলের নিুভূমি যেখানে এক কালে নদীর কলকল ধ্বনীতে মুখরিত হয়ে থাকতো এখন তা স্তব্ধ হয়ে গেছে। পরিণত হয়েছে স্মৃতিবিধুর ইতিহাসে।
নদীর পানিপ্রবাহ হলো প্রকৃতির খেলা। এটা প্রাকৃতিক সম্পদ। সমস্ত মানবজাতি এর ভোগদার, কেবল ভারত বা বাংলাদেশ নয়। সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, মেঘমালা ও ঝর্ণাধারা সবই স্রষ্টার সৃষ্টি। স্রষ্টা এগুলো কোন নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠি বা কোন নির্দিষ্ট দেশের অধিবাসীদের জন্য দান করেন নি। কারণ, তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির জন্যই রয়েছে সমান ভালোবাসা। কিন্তু এ সত্যটি যেন ভারত মেনে নিতে পারছে না।
এখন প্রশ্ন হলো ভারতের এই একচোখা নীতিকে কোন আইন বৈধতা দেয় কি না। না, দেয় না। প্রচলিত আন্তর্জাতিক নদী সংক্রান্ত আইনে পরিষ্কারভাবে বলা আছে যে, প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভীন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য কোন রাষ্ট্রের ক্ষতি না করেই তা ব্যবহার করতে হবে (অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদী সংক্রান্ত হেলসিংকি নীতিমালা, ৪ ও ৫ নং অনুচ্ছেদ)। সুতরাং বাংলাদেশকে মরুকরণের উদ্দেশ্যে ভারত যে একচোখা নীতির অনুসরণ করে চলেছে সেটা চূড়ান্ত অন্যায়, যা আন্তর্জাতিক আইনকে লঙ্ঘন করে।
আবার যদি ধর্মীয় দিক দিয়েই বিবেচনা করা হয়, তবুও ভারতের এমন আচরণ হতাশাব্যঞ্জক হিসেবেই প্রতিয়মান হবে। ভারতের অধিকাংশ মানুষ হলো সনাতন ধর্মের অনুসারী। তারা যদি তাদের ধর্মীয় বিধানকেও মান্য করতেন তাহলেও এমনটি করা সম্ভব ছিল না। কারণ, ধর্মীয় বিধান অনুসারেও এহেন কাজ মারাত্মক অন্যায়। সনাতন শাস্ত্রে মানুষের পানির চাহিদা পূরণার্থে নানান কর্মোপদেশ দান করা হয়েছে। শাস্ত্রে উল্লেখিত মহর্ষী মনুর একটি উক্তি হচ্ছে- “সকল দান অপেক্ষা জলদানই উৎকৃষ্ট; অতএব মুখ্য প্রযতœ সহকারে কূপ, জপী ও তড়াগাদি খনন করাইবে। সলিলপূর্ণ কূপ খননকর্ত্তার পাপের অর্দ্ধাংশ বিলুপ্ত করিয়া থাকে। যাহার জলাশয়ে ব্রাহ্মণ, সাধু, মনুষ্য ও গোসমুদয় জলপান করে, তাঁহার সমুদয় বংশ পাপ হইতে নির্মুক্ত হইয়া থাকে। গ্রীষ্মকালে যাঁহার জলাশয়ে সকলেই অপ্রতিষিদ্ধ হইয়া জলপান করিতে পারে, তিনি, কদাচ বিপদে নিপতিত হয়েন না (মহাভারত, অনুশাসন পর্ব পৃ: ১০০৯; পঞ্চষষ্ঠিতম অধ্যায়)। যে ধর্মে পানির চাহিদা মেটানোর জন্য পুকুর নির্মাণের কথা বলা হয়েছে সেই ধর্মের অনুসারী হয়ে কীভাবে কোটি কোটি মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে পানি থেকে বঞ্চিত করে রাখা যায়, তা মোটেও বুঝে আসে না। সুতরাং এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে ন্যায্য পানি থেকে বঞ্চিত করে রাখছে তারা প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও ধর্মীয় আইন উভয় আইনেরই বরখেলাপ করছেন। কিন্তু এই অন্যায়কে মোকাবেলা করার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। গত ৪২ বছরে এই চেষ্টা কম হয় নি। এটাকে ইস্যু করে বহু রাজনীতি হয়েছে, লংমার্চ, মিটিং-মিছিল, জনসভা ইত্যাদি হয়েছে। তবে তার দ্বারা তেমন কোন সুফল জাতি পায় নি। বস্তুত এভাবে সুফল পাওয়া সম্ভবও নয়। আবার বিগত দিনগুলোতে দেখা গেছে, যখন যেই সরকারই ক্ষমতায় থেকেছে, তাদের বিরুদ্ধেই কয়েকটি অভিযোগ উঠেছে। তাহলো- তাদের পররাষ্ট্রনীতি দুর্বল, তারা ক্ষমতার লোভে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে চায় না, তাদের সদিচ্ছার অভাব ইত্যাদি ইত্যাদি। বস্তুত বাংলাদেশের কোন সরকারই তেমনটি নয়। বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় আছে, তাদেরও সদিচ্ছার কোন অভাব আছে বলে আমি মনে করি না।
উত্তরবঙ্গে সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মীর সাথে পরিচিত হয়েছি। তাদের সাথে মিটিং করতে বসে বুঝেছি যে, না, সাধারণত যেমনটি ভাবা হয় তেমনটি নয়। তাদেরও মনে কষ্ট-হাহাকার বাসা বেঁধে আছে, তাদেরও কিছু আবাদী জমি এখন পানির অভাবে চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে। তারাও এই বাংলারই মানুষ। কাজেই বিরোধিপক্ষে গিয়ে শুধু সরকারকে দোষারোপ করার কোন মানে নেই। সরকার ভারতের দালালী করে- কথাটি ঠিক নয়। তারাও অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বুঝতে হবে, এশিয়ার সুপার পাওয়ার হিসেবে খ্যাত ভারত আসলে আমাদের কতটুকু মূল্যায়ন করে। ন্যায্য দাবি আদায়ের তীব্র আশা নিয়ে গিয়ে আমাদের নেতানেত্রীরা অসহায়ের মতো ফিরে আসেন। এটা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে যেমন সত্য, খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তেমন সত্য। কিন্তু বিষয়টিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে সক্ষম না হওয়ায় বিগত বছরগুলোতে এই ইস্যুটিকে নিয়ে শুধু শুধু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে দেশের বৃহৎ এই সমস্যার মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, আদৌ পারি নি, ভবিষ্যতেও পারব না। পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে, পানি নিয়ে গবেষণা করে শত চেষ্টা করলেও কেয়ামত পর্যন্ত আমরা পানি পাব না, যদি না ভারতের মনস্তাত্বিক কোন পরিবর্তন ঘটে।
![]()
সম্পাদকের নিজ ক্যামেরায় তোলা তিস্তার ছবি
![]()
তিস্তার ধু ধু বুক
![]()
প্রমত্তা তিস্তা আজ মরুসম
![]()
তিস্তা
তবে উপায় যে নেই তা কিন্তু নয়। একমাত্র উপায় হলো, ষোল কোটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। হীনস্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাতির বৃহৎ স্বার্থজড়িত বিষয় নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করা হয় তা বন্ধ করতে হবে। আমাদেরকে একটি প্লাটফর্মের উপর দাঁড়াতে হবে। আসুন আমরা যাবতীয় বিভেদ-বিসম্বাদ ভুলে ষোল কোটি বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হই। ঐক্যবদ্ধ হই যাবতীয় অন্যায় ও যুলুমের বিরুদ্ধে। ষোল কোটি বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হলে আমরা আর অবমূল্যায়নের পাত্র হব না, বরং যে কোন পরাশক্তি আমাদেরকেই সমীহ করে চলবে। ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য কারও দারে দারে ঘুরতে হবে না।
অন্যদিকে বন্ধুপ্রতিম দেশের তকমা এঁটে বসে থাকা ভারতকেও বলব, “তোমরাও মানুষ, আমরাও মানুষ। তোমাদের দেশেও হিন্দু আছে, আমাদের দেশেও হিন্দু আছে। আমরা মঙ্গায় পড়লে শুধু মুসলমানরাই মরে না, তোমাদের জাতভাই হিন্দুরাও মরে। এরকম অবিচার করার শিক্ষা স্রষ্টা তোমাদের ধর্মগ্রন্থেও দেন নি, আমাদের ধর্মগ্রন্থেও দেন নি। নদীতে বাঁধ দেবার কোন প্রয়োজন নেই। নদীকে তার স্বাভাবিক গতিপথের উপর ছেড়ে দিন। সে তার আপন গতিতে প্রবাহিত হবে, দু’ পাড়ের মানুষকে সে সমানভাবে প্রশান্তি বিলিয়ে যাবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান আমরা সবাই ভাই-ভাই, একই আদম-হাওয়ার সন্তান। কাজেই একজনকে না খাইয়ে রাখার ব্যবস্থা করে তার খাবার অন্যজনের খাওয়ার মধ্যে কোন স্বার্থকতা নেই।”
পরিশেষে উত্তরবঙ্গের এই করুণ বাস্তবতাকে বিবেচনা করে এটাই কামনা করি যে, যত দ্রুত সম্ভব বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হোক, সেই সাথে প্রতিবেশি দেশ ভারতও নীতি-নৈতিকতাবোধ অর্জন করুক।
সূত্র: দেশেরপত্রের ফেসবুক পেজ।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মে, ২০১৪ দুপুর ১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



