বাঙালি চরিত্রের অন্যতম সমালোচিত বিষয় হচ্ছে একজনের প্রতি আরেকজনের ঈর্ষা। বলা হয়ে থাকে, বাঙালিদের জাহান্নামে নাকি প্রহরীর দরকার হবে না। কেননা জাহান্নাম থেকে তাদের পালানোর সুযোগ থাকলেও একজন পালাতে গেলে অন্যরা পা ধরে টেনে নামিয়ে ফেলবে, যাতে কেউ মুক্তি না পেতে পারে। এ চরিত্রের কারণে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ জাতিটি কখনোই এগিয়ে যেতে পারলো না। ছোট্ট একটা ভূ-খণ্ডে বিশাল সংখ্যা নিয়ে হাস-ফাঁস করে মরছে। আর ব্যতিক্রম হিসেবে যারা বের হতেও পেরেছেন তাদেরকেও প্রতিনিয়ত ‘বাঙালি’ বলে গালি দেওয়া হয়। অপরকে টেনে নামিয়ে নিজে এগিয়ে যাওয়া চেষ্টার এই প্রবণতা সর্বত্র। গ্রামের একজন মেম্বার হওয়ার জন্যও একে অপরকে খুন করে ফেলে, নিজের এগিয়ে যাওয়াকে নিষ্কণ্টক করার জন্য। আর রাস্তা-ঘাটে এটাতো নিত্য-নৈমত্তিক দৃশ্য। ট্রাফিক সিগনালে কে কাকে ফেলে নিজে এগিয়ে যাবে এই নিয়ে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। ফলটা হয় এই যে- তখন গাড়ি নিয়ে এক বাঙালি আরেক বাঙালির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাস্তায় জট লাগিয়ে মাকড়সার জালে আবদ্ধ মাছির মত দাপাদাপি করে, ঘামে মরে। যেখানে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করলেই মুক্তি মিলতো সেখানে এক ঘণ্টা বসে থাকো। অবশ্য দীর্ঘ এই সময়টা তারা কাটায় একে অন্যের উপর দোষারোপ, খিস্তি-খেউড় আর ট্রাফিক পুলিশের গুষ্টি উদ্ধার করে।
এখানে, এই ভূ-খণ্ডে ব্রিটিশদের দ্বারা প্রায় দু’শো বছর সরাসরি গোলামীর পর তাদের শিখিয়ে বহু দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকরী করা হয়েছে। পার্থক্য হয়েছে এই যে, প্রভুরা আগে আমাদেরকে দুই টুকরা করে খেত আর এখন গলাধঃকরণের সুবিধার্থে টুকরার সংখ্যাটা বাড়িয়েছে নিয়েছে মাত্র। আর উপরি হিসেবে আমাদের কপালে জুটেছে চরম জাতীয় অনৈক্য ও বিভক্তি। প্রত্যেকটি দলের আলাদা আলাদা কর্মসূচি, আলাদা আলাদা এজেন্ডা। কর্মসূচিগুলোর উদ্দেশ্য সেই অপরকে ল্যাং মারা। একদল ক্ষমতায় আরোহণ করলে অন্যরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নামানোর লড়াই চালিয়ে যায়। এজন্য এমন কোন পন্থা নেই যা তারা গ্রহণ করে না। কারণ, Nothing is unfair in love and war.
অন্যদিকে আবার যারাই ক্ষমতায় গিয়ে থাকুক না কেন, তারাও বিরোধী দলগুলোর চরিত্র সম্বন্ধে সম্যক অবগত। তারাও ঐ ক্লাস পাশ করেই ক্ষমতায় এসেছে। এবার বিরোধী দলকে টেক্কা দিয়ে বেঁধে রাখতে পারলে তারা ক্ষমতায় থাকতে পারবে আর না হলে মেয়াদ পূর্তির আগেই তল্পি-তল্পা গুটিয়ে বিদায় নিতে হবে। ভাগ্য খারাপ হলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো, চৌদ্দ শিকের অন্তরালে দিনগুজার অথবা যারা নতুন করে ক্ষমতায় আরোহণ করেছে তাদের অনুগত বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যেতে হবে- যত দিন না আবার ক্ষমতা ফিরে পাওয়া যায়। সুতরাং এই সব বিষয় মাথায় রেখে বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখতে গিয়ে মেয়াদের একটি বিশাল অংশ ও শক্তি ব্যয় হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে জাতীয় উন্নয়নে।
এই সংস্কৃতির কুফল কি তা আর নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। প্রতিনিয়ত অপহরণ, খুন, গুম, অধিকার আদায় এবং দাবি-দাওয়া পূরণের নামে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য হরতাল, অবরোধ, সাধারণ মানুষের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগে বিরূপ পরিবেশ ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়ে জাতি আজ লেজে গোবরে হয়ে আটকে আছে। মাড়সার জালে আটকে পড়া মাছির মত ভোটার শ্রেণিটি ছটফট করে মরছে। আমাদের বানানো সিস্টেম আমাদেরকেই ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিয়েছে।
এই অবস্থা থেকে মুক্তির একটা মাত্র পথ আছে। অবশ্য সেটা এ জাতি গ্রহণ করবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেননা এপথ গ্রহণের জন্য যতটুকু মানসিক শক্তি, সাহস ও উদ্যম প্রয়োজন তা এ জাতির মধ্যে অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। যদি তাদেরকে বলা হয় যে, আপনারা একে অপরকে পেছন থেকে টেনে ধরার সংস্কৃতি বাদ দিন, অন্যের জন্য পথ ছেড়ে দিন, সে আগে যাক, তারপর আপনি যান। এখানেও প্রশ্ন আসবে শুরুটা করবে কে? আপনি এত মহান তাহলে আপনি আগে শুরু করেন?
আসলে আমাদেরকে পরিণামদর্শী হতে হবে। বুঝতে হবে আমি যখন আরেকজনকে টেনে ক্ষমতা থেকে নামাচ্ছি তখন আমিই ভাগ্যে যোগ করে নিচ্ছি যে, আমি যখন ক্ষমতায় যাবো সেও অনুরূপ আমাকে টেনে নামাবে। অনন্তকাল এই ধারা চলতে থাকবে আর নিজেদের সৃষ্ট এ অশান্তির আগুনে আমরা পুড়তে থাকবো।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০১৪ রাত ৮:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



