নোবেল পুরস্কার, বিশেষ করে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের ব্যাপারটি দিন দিন হাস্যকর হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর বহু দেশে যখন যুদ্ধ চলছে, পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, সেই ভয় থেকে যখন শত্র“দের উপর টনকে টন বোমা ফেলা হচ্ছে, পৃথিবীর ইতিহাসে যখন সবচেয়ে বেশি মানুষ উদ্বাস্তু শিবিরে জীবন-যাপন করছে, অনেক দেশে যখন গৃহযুদ্ধ চলছে, আফ্রিকা মহাদেশের একটি বিশাল সংখ্যক মানুষ যখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, পরাশক্তিগুলো যখন শুধুমাত্র নিজেরা আক্রান্ত হবে এই আশঙ্কায় অন্যকে আক্রমণ করছে না, একে অপরের উপর পাল্টা-পাল্টি অবরোধ আরোপ করে যাচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো যখন উন্নত দেশগুলোর কাছে গোলামীতে আবদ্ধ, শক্তিই যখন পৃথিবীতে ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড বলে বিবেচিত হচ্ছে তখন শান্তিতে নোবেল প্রদান সত্যিই একটি হাস্যাস্পদ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সমষ্টিগত জীবনে সর্বত্র অন্যায় বিজয়ী হওয়ার কারণে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকেও তা প্রভাবিত করছে।
মানুষ দিন দিন হৃদয়হীন পশু হয়ে যাচ্ছে। মানুষের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে, সামান্য কারণে অপরকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। স্কুলে প্রবেশ করে একসাথে বহু কোমলমতি শিশুকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, স্কুল থেকে মেয়ে শিশুদেরকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাদেরকে হত্যা করে সেই দৃশ্য আবার গর্বসহকারে ইন্টারনেটে প্রদর্শন করা হচ্ছে, বিয়ে দিতে রাজী না হওয়া পুরো পরিবারকে ঘরে আটকিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, মানুষ খুন করে তাদের লাশ গুম করে ফেলা হচ্ছে। ধর্ষণ, অমানবিক নির্যাতন, অবিচারের কোনো শেষ নেই। নির্যাতিত মানুষের রক্ত আর কান্নায় পৃথিবীর বাতাস আজ ভারী। মানুষের এত সব হাহাকার, কান্নার ফিরিস্তি কোনো বই ধারণ করতে পারবে বলে মনে হয় না। সমষ্টি এবং ব্যক্তি জীবনের উভয় ক্ষেত্রে মানুষের এই দুরাবস্থার মধ্যে যখন কাউকে কাউকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় আর তা সানন্দে গ্রহণও করা হয়, তখন তা শুধু আমাদের হাসির খোরাকই যুগিয়ে থাকে।
শান্তিতে নোবেলের হাস্যকর অবস্থার পাশাপাশি আমাদেরকে দুঃখিতও করে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে শান্তিতে কারা নোবেল পেয়েছে সেই তালিকার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই একতরফাভাবে শুধুমাত্র পশ্চিমা সভ্যতার প্রভাবশালী ব্যক্তি বা তাদেরই অনুগত কিংবা যারা তাদেরই স্বার্থ সংরক্ষণ করে যাচ্ছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই শান্তিতে নোবেল পেয়েছে। শান্তিতে তাদের নোবেল পাওয়া নিয়ে বিতর্কও কম নয়। কিন্তু পশ্চিমাদের আদর্শের সাথে বিরোধী মনোভাবাপন্ন কোনো ব্যক্তি নোবেল পেয়েছে বলে মনে পড়ছে না। কিংবা পেয়ে থাকলে তা উল্লেখযোগ্য নয়। তাই নোবেল পুরস্কার পশ্চিমা সভ্যতার নিজেদের একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাওয়ার যোগ্যতা নেই। তাতে কে নোবেল পেল আর কে পেল না তা নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। কারণ, অশান্তিময় বিশ্বে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের প্রশ্নই আসে না। এর কোনো মূল্য নেই। তবে আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ থেকে দেওয়া এই পুরস্কারের একটা আর্থিক মূল্য থাকতে পারে- এমনটা আমাদেরকে স্বীকার করতেই হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


