
বাপ্পি মজুমদার ইউনুস
বাংলাদেশের জনৈক কবি বলেছিলেন, লাশকাটা ঘরে শুয়ে যখন জীবনের হিসাব মেলানোর কবিতা লিখেছিলেন তখনও কি তিনি জানতেন তাকেও একদিন ওই ঘরে যেতে হবে। আসলে কাকে কোন জীবনের পথে টেনে নিয়ে যায় কেউ তা বলতে পারে না। জীবনের মানে কী? আমরা এখানে কেন এসেছি? জীবনের প্রকৃতি বা বাস্তবতা কী? জীবনের তাৎপর্য কী? জীবনের সবচেয়ে অর্থপূর্ণ ও মূল্যবান বিষয় কী? আমরা কিসের জন্য জীবন ধারণ করছি? আমরা কেনই বা পৃথিবীতে এলাম? এ উত্তর খুঁজেছে মানুষ সৃষ্টির আদিকাল থেকেই। এ প্রশ্নকে ঘিরেই উৎপত্তি বিভিন্ন মতবাদের। কেউ বিজ্ঞানের ভিত্তিতে এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করেছেন। আবার কেউ খুঁজেছেন ধর্মের ভেতরে। এ কারণে জন্ম নিয়েছে অনেক দর্শন অনেক বিশ্বাস। কিন্তু কেউ কাউকে আজ পর্যন্ত সত্যায়িত করেনি। জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে যার যে মতই থাকুক না কেন সব মতবাদই ক্ষুধাকে খাবার দিয়ে নিবারণ করতে বাধ্য হয়েছে। এখানেই সব মতবাদ একটি সরল রেখায় গিয়ে মিলিত হয়েছে। আর এ কারণেই আদিকাল থেকেই মানুষকে জীবনের জন্য বেছে নিতে হয়েছে পেশা। জীবন ধারণের প্রয়োজনে এলো চাহিদা। জীবনের প্রয়োজনের কারণেই জীবনের বাঁকে বাঁকে পেশার বদল হয়। পেশা এক সময় নিয়ে যায় জীবনের অতল সাগরে। কেউ কিনারায় আবার কেউ অতল গহিনে। এই অসীম অনন্ত চাহিদা বা নিজের অমানসিকতা নিয়ে যায় এক অন্ধ ঘরে- যার দরজা নিজেই বন্ধ রাখে।
একটু পেছনে ফিরে দেখি। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন ভূখ। একটি মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। পারেনি দুর্নীতি ও ফ্যাসিস্ট মুষ্টি, নিপীড়নের শ্বাসরোধী অবস্থা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করতে। আমরা এক বিভীষিকাময় অবস্থায়; কিন্তু আমলাতন্ত্র ও শোষক ছাউনির উচ্চাভিলাষ আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে সেই দুর্নীতি, সহিংসতা, উৎকণ্ঠা বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেঁকে বসেছে। চক্রান্তের পথে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, হচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে দ-ধরের। কিন্তু দুর্নীতির জোয়ার ভাসছে অবাধে। অবাধে প্রবেশ করছে প্রতিটি অঙ্গে অঙ্গে। দুর্নীতি আজ বৃষ্টি হয়ে বর্ষণ হচ্ছে আমাদের জাতীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সর্বস্তরে। বর্ষার স্ফীত নদীর মতো দুই কূল প্লাবিত করে দুর্নীতি আজ সমাজের সর্বস্তরে প্রাসাদ গড়েছে। লোভ-লালসার জিহ্বা লেহন করে চলছে আমাদের অর্থনীতির সম্ভাবনাময় সব পুষ্পিত শাখা-প্রশাখা।
দুর্নীতি আজ দেশের একটি স্বাভাবিক ও সর্বগ্রাসী নিয়মে পরিণত হয়েছে। দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জন্যই শিল্পকারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে সব ধরনের নিয়োগ সঙ্কীর্ণ দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়া হয়েছে। অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ, কর্মবিমুখ লোকগুলো সব প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে জেঁকে বসেছে। এ দুর্নীতির বদ্ধ পথ ধরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে চলছে, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে। এ অনিশ্চিত অবস্থা ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগে ক্ষমতাসীনরা ও লক্ষ্যচ্যুত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার পালাবদলে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শ্রমিক সংগঠনগুলো ব্যবহার করে। ক্ষমতার রাজনীতির জন্যই দুর্নীতি আজ সর্বস্তরে।
দেশের সর্বত্রই অনিশ্চয়তা বিরাজমান। এ অনিশ্চয়তাই রাজনীতির ক্ষেত্রে অরাজনীতিবিদ পেশিশক্তির আবির্ভাবকে সাহায্য করে। গণতন্ত্রের সামান্য নাম-নিশানাটুকু মুছে অতীতের পরিত্যক্ত ব্যবস্থাগুলোকে ফিরিয়ে আনে। কারও কোনো প্রতিবাদ করার জোর থাকে না। পাকিস্তান আমলে বিরোধী কণ্ঠস্বর মানেই ছিল দেশদ্রোহী ও ভারতীয় দালাল। বাংলাদেশে এর এখন ভাষান্তর ঘটেছে। একদিকে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, তার ওপর আবার দুর্নীতির ছোবল, ধ্বংস করছে যুব সমাজকে। মাদকবাজদের দখলে আজ সোনার বাংলা।
তাহলে কি ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে, দুর্নীতিকেই নীতি হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠিত করলাম, আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে, আমাদের পারিবারিক জীবনে, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে এবং আমাদের জাতীয় জীবনে? তাহলে আমাদের কি মেরুদ-হীনভাবে বাঁচতে হবে? প্রশ্ন ফাঁস, জাল সার্টিফিকেট বিতরণ করছে অযোগ্যদের জন্য, জাল সনদে প্রতারক শিক্ষকতা করছেন, মালিক সেজে বসেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক সেজে নেশাখোরদের মধ্যে নেশার জন্য বিক্রি করছেন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, নেশাদ্রব্যে মারা যাচ্ছে মাতাল। এই যখন সমাজের হালচিত্র, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন-বিধিবিধান, নিয়মকানুন তদারককর্তা সবই কি হাওয়া হয়ে গেল? তা না হলে সমাজে এত অনিয়ম বাসা বাঁধে কীভাবে?
শিক্ষক নিয়োগে পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়েছে। তা না হলে জাল সনদে একজন প্রতারক শিক্ষক, শিক্ষকতার মতো চাকরি পেলেন কীভাবে? বেতনই বা তার হচ্ছে কী করে? যোগ্য ও প্রকৃত মেধাবীরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই শিক্ষক হতে চান। যখন ডোনেশন আর উৎকোচের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন মুখ থুবড়ে পড়ে মেধা। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেকে জাল সনদ দিয়ে শিক্ষকতা করছেন। এদের মধ্যে দেড় শতাধিক এরই মধ্যে শনাক্ত হয়েছে- তথ্যকোষ থেকে পাওয়া। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাদের কারণে অনিয়মের মাত্রা যে দিন দিন বেড়েই চলেছে তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। ফার্মেসি থেকে দেদারসে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ওষুধ বিক্রি হয়, ফার্মেসির দোকানদার ডাক্তার সেজে বসেছেন, এমনকি মুদি দোকানেও এন্টিবায়োটিক পাওয়া যায়। ক্লিনিকগুলোর অধিকাংশেই অনিয়ম। কেন এত অনিয়ম? বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ডায়াগনস্টিকগুলোর কোনটি কীভাবে চলছে তা অবশ্যই স্বাস্থ্য প্রশাসনের জেলা পর্যায়ের শীর্ষকর্তার অজানা নয়।
দেশের এ ভয়াবহ পরিস্থিতি কারও কাম্য হতে পারে না। ক্ষমতাসীন দলের কর্ণ প্রশংসাবাক্যে বধির। তাই আহ্বান জানাই পশ্চাতের বাধাবন্ধনহীন তরুণদের। আমাদের রক্তের কণিকা এখনও শীতল হয়নি যে, আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারব না। অকৃতার্থ অতীতের বোঝায় তারা যুক্তদেহ নয়। একমাত্র তারাই সাহসের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে গর্ব করতে পারে। তাই একমাত্র তারাই জনতাকে সমবেত করার গুরুদায়িত্ব বহনে সক্ষম। আপনারা সংগঠিত হন এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে জনতার শাসন কায়েমের সংগ্রামে অগ্রসর হোন। আপনাদের সংগঠন শক্তি এবং চেতনার মশাল চারদিকের দুর্যোগের ঘন অন্ধকার দূর করে আলোকিত পথের সন্ধান দিতে পারে। দুর্যোগ ও দুঃশাসন থেকে এ মুহূর্তে দেশবাসীকে মুক্ত করতে পারলে, হতাশার মধ্য দিয়ে শক্তি উপাসক এবং পেশিনির্ভর রাজনীতি ফের রঙ্গমঞ্চে নতুন অভিনয়ে অবতীর্ণ হবে। পোশাকের পরিবর্তন হবে, চরিত্রের পরিবর্তন ঘটবে না; জাতির ভাগ্য ফিরবে না। আসুন ঐক্যবদ্ধ জনতাকে নিয়ে তিমিরাভিসারী তরুণরা এ সর্বনাশী দুর্নীতি থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাই। জয় আমাদের সুনিশ্চিত, কারণ আমরা ন্যায়ের পক্ষে। আমাদের রক্তে শহীদের রক্ত বহমান। এ বিজয়ে আমাদের শপথ নিতে হবে আরও একটি বিজয়ের, না হলে আমাদের অনেক কিছু হারাতে হবে। মেরুদন্ড হীনভাবে বাঁচতে হবে জাতিকে।
বাপ্পি মজুমদার ইউনুস
সম্পাদক- আমাদের নাঙ্গলকোট ডটকম
সভাপতি- সবুজ দিগন্ত ফাউন্ডেশন
লেখকের ফেইসবুক ক্লিক করুন এখানে
সাংবাদিক,কলাম লেখক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


