পথ শিশুদের সেবাশ্রম তৈরী পুরস্কার সরূপ পুলিশের রিমান্ড।পুলিশ গত ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার রাজধানীর রামপুরা থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে চারজনকে গ্রেপ্তার করে।পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে খবরে প্রকাশ যে মানবপাচারকারীদের হেফাজত হতে মো. মোবারক হোসেন, মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, মো. বাবুল, মো. আব্বাস, মো. স্বপন, মো. আকাশ, মো. মান্না ইব্রাহিম আলী, মো. রাসেল, মো. রফিক ও মো. ফরহাদকে উদ্ধার করা হয়।পুলিশের ভাষ্যমতে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, তারা মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য। তারা রাজধানীসহ আশপাশ জেলা শহর হতে শিশু সংগ্রহ করে পাচার করে আসছে।
আদালতের শুনানিকালে ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের সাথে কথা বলেন। ম্যাজিস্ট্রেট প্রশ্ন করেন, তারা কীভাবে শিশুদের সংগ্রহ করতেন? জবাবে আসামি আরিফুর বলেন, 'ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে যেমন- সদরঘাট, কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা কমপক্ষে ২ থেকে সর্বোচ্চ ৩ মাস বিভিন্ন ছিন্নমূল বাচ্চাদেরকে পর্যবেক্ষণ করে। যদি দেখা যায় একই বাচ্চা দিনের পর দিন একই স্থানে থাকছে এবং অন্য কোথাও যাচ্ছে না, তখন আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা তাদেরকে আমাদের শেল্টারে আসার জন্য বলতো। যারা আগ্রহী হতো তাদেরকে নিয়ে আসা হতো।' এরপর আদালত ওইসব আসামিদের আর কোনো বক্তব্য শুনতে চাননি। আদালতের বাইরে এসে ওই চার আসামির আত্মীয়-স্বজন এবং উদ্ধারকৃত ১০ শিশুর মধ্যে ছয় শিশুর অভিভাবকদের সাথে কথা বললে বেরিয়ে আসে নিঃস্বার্থভাবে সমাজসেবা করতে গিয়ে ফেঁসে যাওয়া ওই চার তরুণের ভাগ্য বিড়ম্বনার কথা। পরবর্তীতে প্রত্যকের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
আরিফুর রহমানের বড় বোন বলেন গত প্রায় তিন বছর ধরে তার একমাত্র ভাই ছিন্নমূল বাচ্চাদের উন্নত জীবনদানের জন্য অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সে তাদের পরিবারকে কোনো সময় দিত না। আমরাও তার কাছে সময় চাইনি। আমরা চেয়েছি তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হোক। কিন্তু আজ এটা কি হচ্ছে? বলেই তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।
একই দিন ১০ শিশুর মধ্যে ৯ জনের সাথে সাংবাদিকরা কথা বললে সবাই একবাক্যে আটককৃতদের প্রশংসা করে। ওইসব বাচ্চাদের মধ্যে স্বপন, বাবলু, আকাশ, রফিক, রাসেলকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমরা সেখানে কেমন আছো? উত্তরে জানায়, সেখানে বেশ ভালো আছে তারা। তোমরা আবারো সেখানে ফিরে যেতে চাও কি না। শিশুরা বলে, হ্যাঁ আমরা ফিরে যেতে চাই।
ফাউন্ডেশন থেকে বলা হয় এই প্রতিষ্ঠানে ৪০০ ওপরে স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন। তাদের বেশির ভাগ বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। তাদের অবসর কেটে যায় পথশিশুদের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে। গ্রেফতারকৃত আরিফুর রহমান অন্য রকম গ্রুপের এক্সিকিউটিভ অফিসার। জাকিয়া তিতুমীর কলেজের অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। গ্রেফতারকৃত হাসিবুল ওই দিনই স্বেচ্ছায় সেবাদানের জন্য এসেছিলেন। শুভ বনশ্রীর শেল্টারহোমের ম্যানেজার ছিলেন।
ঘটনার সময় ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারও সেখানে ছিলেন। পুলিশ যখন সেখানে প্রবেশ করে তখন ম্যানেজারের ফোন পেয়ে বাকি তিনজনও সেখানে ছুটে যান। পুলিশ তখন তাদেরকেও গ্রেফতার করে। পুলিশকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে তারা কোনো অনৈতিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত নন। কিন্তু পুলিশ তাদের কোনো কথাই শোনেনি। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী বলেন, তারা যখন কাগজপত্র নিয়ে থানায় যান তখন থানা পুলিশ তাদেরকে পাত্তাই দেয়নি। ওসির রুমে ঢুকবেন সেই সুযোগও তারা পাননি। তারা বলেন, তাদের বয়স কম হওয়ায় পুলিশ তাদেরকে কোনো পাত্তাই দেয়নি।
তারা বলেন, রাজধানীতে তাদের একটি স্থায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বনশ্রীর ওই শেল্টার হোম ছাড়াও আরো কয়েকটি ভাসমান স্কুল রয়েছে। শাহবাগ, সদরঘাট এবং কমলাপুর স্টেশনে তারা তিনটি ভাসমান স্কুল পরিচালনা করেন। আগারগাঁওয়ের কুমিল্লা বস্তিতে তাদের একটি স্থায়ী স্কুল রয়েছে, যেখানে ৩০টি শিশু রয়েছে। মজার স্কুল নামে এগুলো পরিচিত। তারা বলেন, এ স্কুলগুলোতে অধ্যয়নরত যেসব শিশুকে একটু মেধাবী মনে হয় এবং যাদের কোনোই পরিচয় নেই, বা পরিবারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই তাদেরকেই বনশ্রীর ওই শেল্টার হোমে নেয়া হতো, যেখানে তাদেরকে সব ধরনের সুযোগসুবিধা প্রদানের চেষ্টা করত এই প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবীরা। খেলাধুলাসহ বিনোদনের জন্যও ব্যবস্থা ছিল। মাঝে মধ্যে তাদেরকে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে নেয়া হতো। কম্পিউটারসহ তাদেরকে নানা কাজ শেখানো হতো। স্বেচ্ছাসেবীরা বলেন, মোবারক যে অভিযোগ করেছে তা সঠিক নয়। মোবারক বলেছে, তাদেরকে রাতদিন ওই প্রতিষ্ঠানে আটকে রাখা হতো। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবীরা বলেছেন, তাদেরকে একা একা বাসার বাইরে যেতে দেয়া হতো না। দিনভর তাদেরকে দেখাশোনার জন্য ম্যানেজার থাকতেন। আর দিনের বেলায় যখনই যে সময় পেতেন ওই বাসায় গিয়ে তারা পথশিশুদের সাথে আড্ডা দিতেন, গল্প করতেন। একত্রে খেতেন, খেলাধুলা করতেন। আবার পড়াশুনা ও হাতের কাজ শেখাতেন।
তারা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের যে স্বেচ্ছাসেবীরা রয়েছেন তাদের পকেটের টাকা এবং তাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের অনুদানের মাধ্যমেই এ সংগঠন চলে আসছে। অনেক স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন যারা আজ বড় বড় চাকরি করেন। তারা নিয়মিত এখানে অনুদান দিয়ে আসছেন। শেল্টার হোমে যে শিশুগুলো থাকত তাদের প্রত্যেকের পেছনে মাসে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়। এই ব্যয় ওভাবেই জোগাড় করা হতো।কি দোষ ছিল এই ‘অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ পথশিশু আর আমরা কতিপয় বেসরকারি সংস্থার ভার্সিটি পড়ুয়া স্বেচ্ছাসেবক ছাত্রছাত্রীদের?
কি অপরাধ তাদের, তারা ছিন্নমূল শিশুদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল?। যাদের অভিবাবক কেউ ছিল না, যেই শিশুরা কিছুদিন আগেও খিদের জ্বালা সইতে না পেরে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করত,চুরি করত, পেপার বিক্রি করত আবার কখনো কখনো মানুষ নামে অমানুষদের মার হজম করত।
ওদের দোষ কি ছিল এটাই যে; ওরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে পথশিশুদের লেখাপড়া করানো সহ সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করত?
ওরা মানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিল মানবপাচারের জন্য নয়।
যাই হোক আমি বাংলাদেশের আইন এবং বাংলাদেশ পুলিশের উপর যথেষ্ট সম্মান রেখে বলছি; আমি চাই আপনারা এই মামলার সঠিক বিচার করুন। আত্মমানবতার সেবায় এসে যেন ওদের শুধু শুধু অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে জেল খাটতে না হয়।




সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




