somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চারতাস 1 (ধারাবাহিক ওয়েস্টার্ন গল্প )

২৫ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ সকাল ১০:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোন মানুষ যদি পোকার খেলায় চারটে তাস টানে তখন তার এরকম একটা কিছু আশা করা উচিৎ । বেন টেইলর সম্ভবত সত্যি কথাই বলেছিল, যে তার ভাগ্য ফুরিয়ে গেছে । সে যাহোক, নিজের বলে একটা জায়গা হয়েছে তার, এটা সে রক্ষা করবে, যা থাকে কপালে ।

না, জায়গাটার কোন দোষ নেই । ঘোড়ায় চড়ে উপত্যাকায় পয়লাবার ঢুকেই অ্যালান রিং বুঝেছিল বাড়ি এসেছে সে । এটাই সে জায়গা, এখানেই সে থামবে । দশ বছর ধরে পশ্চিম চষে বেড়ানোর পর যদি কোথাও ডেরা বাঁধতে হয় এটা সে জায়গা ।

কেবিনটাও দেখে মনে হল ভাল । যদিও টেইলর বলেছিল জায়গাটা তিন বছর ফাঁকা পড়েছিল । বাড়িটা দেখে মনে মজবুত আর শক্তপোক্ত করে বানান, যদিও বাড়িটার চারপাশে উপত্যকায় কোমর সমান উঁচু হয়ে ঘাস জন্মেছে, কিন্তু তার মধ্যে নাল না পরান টাট্টুঘোড়া, মানে বুনো ঘোড়া চলার ট্রেইল তৈরি হয়েছে সে দেখতে পাচ্ছে । কিছু হরিণের পায়ের দাগও আছে । এর পাশে একটা নাল পরান ঘোড়ার ছাপও দেখতে পেল অ্যালেন ।

শেষ ট্র্যাকটা বাড়ির দরজা পর্যন্ত গিয়ে সেখানে শেষ হয়েছে । আরও দেখা যাচ্ছে খুব ছোট্ট পায়ের কেউ একজন হেঁটে গিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েছে । কেন একজন মানুষ একটা জানালা দিয়ে দুবার উঁকি দেবে? বিশেষ করে একটা খালি বাড়ির জানালায় ? নিজেই গিয়ে উঁকি মেরে দেখল সে, ধুলো ধুসরিত অন্ধকার ঘরের ভেতরটা বিপরিৎদিকের একটা জানালার গলে আসা আলোয় দেখা যাচ্ছে । দক্ষহাতে বানান একটা টেবিল, একজোড়া চেয়ার আর একটা পুরনো ফায়ারপ্লেস দেখতে পেল সে ।

'তুমি কখনও ফায়ারপ্লেসটা বানাওনি বেন টেইলর,' বিড়বিড় করল রিং । 'তাস আর ইস্ত্রি ছাড়া আরকিছু চালাওনি জীবনে । তুমি কখনও তোমার জীবনে এত সুন্দর বা প্রয়োজনীয় জিনিস বানাওনি ।'

লালচে পাথরের খাড়া ক্লিফটার নীচে, ঘাসে ঢাকা একটা তাক মতন জায়গায় বসে আছে কেবিনটা, ফিট পঞ্চাশেকেরও কম দূর দিয়ে বইছে ক্লিফ থেকে নেমে আসা একটা নালা । ঝিরঝির করে নালার পানির এসে পড়ছে একটা বেসিনে, তারপর সেখান থেকে এঁকেবেঁকে সিকি মাইল দূরের আরেকটা বড় নালায় এসে পড়েছে সেটা ।

কেবিনের চারধারে অনেকগুলো লম্বা স্প্রুস, দুটো সাইকামোর আর নালাটার ধারে একটা শিমুল গাছ । বেশ কিছু গুজবেরি ঝোপ আর দুটো আপেল গাছও আছে এখানে । আপেল গাছগুলোর ডালপালা ছাঁটা হয়েছে ।

'আর তুমি এ কাজটাও করনি বেন টেইলর !' গম্ভীর ভাবে স্বগতোক্তি করল অ্যালেন রিং । 'গাছপালা সম্বন্ধে আমার আরও কিছু জানা থাকলে ভাল হত ।'

সময়, চকিত হরিণীর মত ছুটে চলল । গোলাঘরের মধ্যে পাওয়া একটা লম্বা হাতলের নিড়ানি দিয়ে ঘরের চারপাশের ঘাসগুলো ছেঁটে ফেলল সে, কেবিনের চালের একটা ফুটো মেরামত করল যেটা দিয়ে ইঁদুরের পাল ঢুকত ঘরে । এমন কী আশপাশের বেশ কিছু ঝোপও ছেঁটে ফেলল সে । সবশেষে গোলাঘরটা মেরামত করল রিং ।

যেদিনটায় ঘরসাফাইয়ের কাজে মন দিয়েছে, সেদিনটাতেই গেইল ট্রুম্যান ঘোড়ায় চেপে হাজির হল এখানে । একটা চেয়ারের বসবার জায়গাটা মেরামত করে শেষ করে এনেছে রিং, যখন লাল টাট্টু ঘোড়ায় সওয়ার মেয়েটাকে দেখে সোজা হল সে । গাদা করে রাখা কাটা ঘাস আর পরিস্কার জানালা দেখে মুখ হাঁ হয়ে গেছে মেয়েটার । রিং দেখল মেয়েটা পিছলে নামল জিন থেকে তারপর একছুটে কেবিনের জানালার কাছে এসে উঁকি দিল । যন্ত্রপাতি ফেলে উঠে এল অ্যালেন ।

'কাউকে খুঁজছো ম্যা'ম?'

আধপাক ঘুরে ওর দিকে তাকাল মেয়েটা, ওর বড় বড় নীল চোখে অভিযোগের ছোঁয়া । 'কী করছো তুমি এখানে ? এভাবে হুট করে ঢুকে পড়ার মানে কী?'

হাসল অ্যালেন, কিন্তু ব্যাপারটা ধাঁধায় ফেলছে ওকে । বেন টেইলর কোন মেয়ের কথা বলেনি, এরকম কোন মেয়ের কথা তো নয়ই । 'কী আশ্চর্য ! আমিই এখন জায়গাটার মালিক । তাই আমি থাকার মত করে একটু মেরামত করে নিচ্ছি বাড়িটাকে ।'

'তুমি এর মালিক?' বিস্মিত, ব্যথিত কন্ঠস্বর তার । 'তুমি এটার মালিক হতেই পারোনা ! ও কখনও এ জায়গাটা বিক্রি করতোনা । কখনোইনা !'

'আসলে ও ঠিক আমার কাছে বিক্রি করেনি ম্যা'ম.' কোমল গলায় জানাল রিং । ' ও আসলে পোকার খেলায় বাজিতে হেরে গেছিল আমার কাছে টেক্সাসে থাকতে।'

'পোকার খেলায়?' রীতিমত আতংকিত দেখাল মেয়েটাকে । 'হুইট বেইলি পোকার খেলত? বিশ্বাস করিনা আমি !'

'যে লোকটার কাছে থেকে আমি জায়গাটা পেয়েছি তাকে সবাই বেন টেইলর বলেই চেনে ম্যা'ম।' পকেট থেকে জমির দলিলটা বের করল রিং । 'সত্যি বলতে কী ও বলেছিল বটে, যদি কেউ হুইট বেইলি সম্বন্ধে জিগ্যেস করে তো, বলতে গুয়াডালুপসে সীসের বিষক্রিয়ায় হুইট বেইলি মারা গেছে ।'

'হুইট বেইলি মারা গেছে?' বিস্ময়ে হতবাক মনে হল মেয়েটাকে । 'তুমি ঠিক জান? ওহ!'

শাদা হয়ে গেল মেয়েটার মুখ, মনে হল ভেতরে একটা কিছু নিভে গেল তার । হতাশ একটা ভঙ্গি করে উপত্যকাটার দিকে ফিরল সে । অদ্ভুত, ব্যাপারটা প্রথমবারের মত লক্ষ্য করল অ্যলেন রিং । একটা পরিচিত কিছুর উপস্থিতি অনুভব করল সে ।

ওর সামনে লম্বা ঘাসে ঢাকা উপত্যকা, শরতের ছোঁয়ায় কিছুটা বাদামী রং নিয়েছে । আর ওর ডান দিকে কুচকাওয়াজে পিঠ সোজা করে দাঁড়ানো সৈনিকের মতই সটান দাঁড়িয়ে আছে স্প্রুস গাছের বীথি, তারও খানিক দূরে উঠে গেছে পাহাড়ের ঢাল । আরও একটু দূরে আরও ডানে পাহাড়ের শেষ মাথায় আরেকটা বড় উপত্যকা মিলিয়ে গেছে দূরের ঘন নীলাভ-বেগুনি রংএর রেখায় । এখানে সেখানে দেখা যাচ্ছে শিমুল গাছের সোনালী বীথি, ঠান্ডায় শিমুল পাতা সোনালী রং নিয়েছে ।

কোন কথা দিয়ে একে প্রকাশ করা যায়না । এ একটা ছবি, এমন ছবি যা একজন মানুষ কেবল স্বপ্ন দেখতে পারে, কিন্তু আঁকতে পারেনা ।

'এটা-এটা সুন্দর, তাই না ?'

মেয়েটা ফিরল ওর দিকে, এবং মনে হল প্রথমবারের মত ওকে ভাল করে দেখল । গম্ভীর ধুসর চোখ আর একরাশ লালচে-বাদামী চুল মাথায় দীর্ঘদেহী এক তরুন, নিঃসঙ্গ, ঘোড়সওয়ারের ভাবটা লেগে আছে ওর চেহারায় ।

'হ্যাঁ, জায়গাটা সুন্দর ।' আমি এতবার এসেছি এ দৃশ্য দেখতে, হ্যাঁ কেবিনটাকেও । আমার মনে আমার দেখা সবচয়ে সুন্দর জায়গা এটা । আমি অনেক স্বপ্ন দেখতাম-' হঠাৎ খেই হারিয়ে চুপ করে গেল সে । ' ওহ, আমি দুঃখিত, এভাবে বলাটা ঠিক হয়নি আমার ।'

ওর দিকে ফিরে গম্ভীরভাবে বলল মেয়েটা. 'এখন আমার যাওয়াই উচিৎ, এখন তুমি এটার মালিক ।'

ইতস্তত করল অ্যালেন । 'ম্যা'ম,' বলল সে জায়গাটা আমার, এবং আমি কোন কিছুর বিনিময়ই এটা বদল করবনা । কিন্তু দৃশ্য, সেটার ওপর কারো মালিকানা নেই । যার চোখ আছে এবং যে দেখতে যায় সেই দেখতে পারে । অতএব তুমি যখন খুশি আসতে পারো দেখতে ।'

হাসল রিং, 'আসলে আমি বাড়িটা মেরামত করছি ভেতর থেকে যাতে বাড়ি বাড়ি মনে হয় জায়গাটা । লাল হল সে 'আর এব্যাপারে আমার তেমন ধারনা নেই, কারন সারাটা জীবন বলা যায় বাংক হাউজেই কাটিয়েছি আমি ।'

সহানুভুতির আসি হাসল মেয়েটা । 'নিশ্চয়ই! খুব ভাল লাগবে সাহায্য করতে, শুধু,'-হাসি মুছে গেল তার-'তুমি এখানে থাকতে পারবেনা । রস বিলটনের সাথে তোমার দেখা হয়নি, হয়েছে কী ?'

' কে সে? কৌতুহলী হয়ে জিগ্যেস করল রিং । এগিয়ে আসা ঘোড়সওয়ারদের দিকে মাথা নাড়ল সে । 'ওই লোকটার কথা বলছ ?'

দ্রুত ঘুরে তাকিয়ে মাথা নাড়ল মেয়েটা । 'হুঁশিয়ার থেকো ! ও টাউন মার্শাল । ওর সাথের লোক দুটো হচ্ছে আছে বেন হেগেন আর স্ট্যান ব্রুল ।'

ব্রুলের কথা ওর মনে আছে, ব্রুলের কী ওর কথা মনে আছে ?

'তো যাই হোক, আমার নাম অ্যালেন রিং,' নীচু গলায় বলল সে ।

'আমি গেইল ট্রুম্যান,' জানাল মেয়েটা । 'আমার বাবা, টল টি ব্র্যান্ডের মালিক ।'

শাদা হ্যাট পরা বিলটন বিশালদেহী মানুষ । দেখে ঠিক পছন্দ হলনা রিংএর এবং বুঝল ব্যাপারটা আসলে দু'তরফা । ব্রুলকে সে চেনে, তাহলে গাট্টাগোট্টা লোকটা বেন হেগেন । ব্রুল পাল্টেছে সামান্য, একটু পাতলা হয়েছে সে, কিন্তু ওর কুঠারের মত মুখটা সেই আগের মতই সরু আর বিষাক্ত ।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:৪৪
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সী পার্ল এবং চারপাশ

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৪


খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। সূর্য তখনও জাগেনি। ব্যালকুনিতে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষন। সামনে সাগর আপনমনে ঢেউ তুলে নাচছে। একজন মানুষও নাই সাগরপাড়ে। এমন নিরিবিলি সাগরপাড়ই চেয়েছিলাম। যেখানে পুরোটাই আমার থাকবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয়

লিখেছেন এমএলজি, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪০

= ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয় =

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়া (NVIDIA)-তে কর্মরত, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ বিজ্ঞানী ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

জলসার আসর

লিখেছেন নিচু তলাৱ উকিল, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

রঙ্গিন শহররের বুকে তাম্বু টাঙিয়ে বসিয়েছি জলসার আসর।
ধর্মীয় বয়ানের ফাঁকে;
গলির মাথায় বেজে উঠছে উলুধ্বনি।
এদিকে তুমি আর আমি ডুবে আছি কলকির ধোঁয়ায়।
নোনতা ঘামের ব্যবচ্ছেদে পুটিমাছের বুক চিরে মেখে দিয়েছি পাঁচ প্রহরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ শেষ জীবনে

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯



ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রপতি পদে আনভীর সোবহানকে দেখতে চাই।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪২


সায়েম সোবহান আনভীর। এক বিশাল বিজনেস টাইকুন, বসুন্ধরা গ্রুপের যোগ্য কান্ডারী। আহা, কী তার ব্যক্তিত্ব! দেখতে যেমন সুন্দর, চরিত্রও যেন মাশাআল্লাহ্ ফুলের মতো পবিত্র। আর বসুন্ধরা গ্রুপের কথা তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×