somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেই অদ্ভুত লোকটা (রহস্য গল্প, প্রথম পর্ব)

১০ ই জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৮:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রায় সন্ধ্যা ছ'টা বাজে । সন্ধ্যার রোদ গায়ে লাগানোর জন্য বসলাম হোটেলের সুইমিং পুলের ধারে ডেকচেয়ারে ।

বাগানটা চমৎকার । অ্যাজেলিয়ার বেড চলে গেছে দেয়াল পর্যন্ত, প্রান্ত ঘেঁষে লম্বা নারকেল গাছের সারি । সন্ধ্যার হাওয়া ঝির ঝির আওয়াজ তুলছে নারকেল গাছের পাতায় । প্রায় বাদামী হয়ে আসা নারকেলের থোকাগুলো দেখা যাচ্ছে পাতার ফাঁক দিয়ে । রঙিন ছাতাগুলোর নীচে অনেকগুলো শাদা টেবিল সুইমিং পুলটার ধার ঘেঁষে পাতা , টেবিলের ধারে অনেকগুলো ডেক চেয়ার । রোদেপোড়া অনেক তামাটে চামড়ার লোকজন সেগুলোতে বসে । প্রায় ডজনখানেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে দাপাদাপি করছে পুলটায় ।

গ্লাস হাতে একটা হলুদ ছাতার নীচে বসলাম । ছেলেগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ন্যাভাল ক্যাডেট, আজ সকালেই একটা আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ভিড়েছে ডকে আর মেয়েগুলো খুব সম্ভবত ইংরেজ ট্যুরিস্ট । আমার টেবিলের চারটে চেয়ারের তিনটাই খালি । এমন সময় অদ্ভুত লোকটাকে এগিয়ে আসতে দেখলাম আমি ।

লোকটার, গায়ে ধবধবে শাদা ট্রপিক্যাল স্যুট আর ক্রিম রঙের পানামা হ্যাট, লম্বা লম্বা পা ফেলে, না ভুল বললাম, প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে, পায়ের সামনের প্রান্তে ভর দিয়ে । আমার কাছে এসে হাসলো লোকটা, বেরিয়ে পড়লো দুসারি কিছুটা অসমান আর বেশ মলিন ক্ষুদে ক্ষুদে দাঁত । জবাবে পালটা হাসলাম আমিও ।

"এক্সকিউজ মি প্লিজ, বসতে পারি এখানে?" বিদঘুটে অ্যাক্সেন্টে জিগ্যেস করলো আগন্তুক, "প্লিজ" কে বললো "প্লি-স"

"অবশ্যই, কেন নয়? বসুন এখানে"

বসার আগে চেয়ারটা গভীর সন্দেহের চোখে মেপে দেখলো, সে যেন ভার বইতে পারবে কিনা , তারপর পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ বসলো । পায়ে তার হরিণের চামড়ার শাদা জুতো, ছোট্ট ছোট্ট ছিদ্র আবার তাতে ।

"সন্ধ্যাটা চমৎকার" মন্তব্য করলো আগন্তুক "জ্যামাইকাতে সব সন্ধ্যাই চমৎকার" । আমি ঠিক বুঝতে পারছিলামনা তার অ্যাক্সেন্টটা কি স্প্যানিশ নাকি ইতালিয়ান । তবে লোকটাকে দেখে দক্ষিন আমেরিকান, বয়সও হয়েছে , প্রায় সত্তরের কাছে, আন্দাজ করলাম আমি ।
"হ্যাঁ সব কিছুই চমৎকার এখানে" সায় দিলাম আমি মাথা নেড়ে ।

"এরা কারা ?" সামনের দিকে আংগুল নির্দেশ করলো লোকটা "হোটেলের গেস্ট বলেতো মনে হচ্ছে না"

"আমেরিকান ক্যাডেট" বললাম আমি "বন্দরের ছুটি কাটাচ্ছে"

"অবশ্যই আমেরিকান, ইয়াংকিরা ছাড়া এতো হুল্লোড় আর কারা করতে পারে? আপনিও কি আমেরিকান ?"

"না" জবাব দিলাম আমি "আমি আমেরিকান নই"

একজন ক্যাডেট উঠে এলো পুল থেকে তার সংগিনী সহ । "এই চেয়ার গুলোতে কেউ আছে, বসতে পারি ?"
"অবশ্যই বসতে পারো"

চেয়ারে বসে তোয়ালের ভাঁজ থেকে থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করলো তরুন, প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরলো আমাদের সবার দিকে ।

মেয়েটা নিলোনা, আমি নিলাম একটা, কিন্তু ল্যাটিনো লোকটা সিগারেট নিলোনা ।

"ত্যাংক ইউ (থ্যাংক ইউ), আমি কিন্তু বেশি মজা পাই চুরুট ফুঁকে" বলে কুমিরের চামড়ায় বাঁধানো কেস থেকে একটা সিগার বের করে, পকেট থেকে একটা ছুরি বের করলো লোকটা, ছুরিটার লেজে একটা ছোট্ট কাঁচি দিয়ে চুরুটের গোড়াটা ছেঁটে নিলো সে ।

"আপনার চুরুটটা ধরিয়ে দেই" লাইটার বাড়িয়ে ধরলো তরুন ।

"এই বাতাসে কাজ করবেনা লাইটার"

"অবশ্যই কাজ করবে, আমার লাইটার সবসময় কাজ করে" ।

অদ্ভুত লোকটা ঠোঁটের কোনা থেকে না জ্বালানো চুরুটটা সরিয়ে নিয়ে, মাথাটা ঘোরালো এদিকে ।

"সবসময়?"

"সবসময়, এটা কখনো না জ্বলতে দেখিনি, অন্তত আমার হাতে"

"সবসময় আগুন জ্বলবে লাইটার টিপলে? তুমি তাই বলতে চাইছো??

"হ্যাঁ" জবাব দিলো তরুন ক্যাডেট, লালচে বাদামী চুলের ছেলেটার বয়স খুব বেশি হলে উনিশ বা কুড়ি, বেশ মজা পাচ্ছে সে এই আজব লোকটার রসিকতায়, রসিকতা হিসেবেই নিচ্ছে সে এটাকে, কিন্তু লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে সে ভীষন সিরিয়াস ।

"এক মিনিট প্লিজ" চুরুটটাকে সোজা করলো সে, যেন ট্রাফিক পুলিশ, ব্যাটন উঁচিয়ে গাড়ি থামাতে বলছে । "এক মিনিট" এখনও সে চেয়ে আছে ছেলেটার দিকে চোখ কুঁচকে "একটা ছোট্ট বাজি ধরলে কেমন হয় ? মানে এই তোমার লাইটারটা জ্বলে কি জ্বলেনা এর ওপরে ?"

"অবশ্যই" চটপট উত্তর দিলো ছেলেটা "বেট লাগতে আপত্তি নেই আমার" ।

"বাজি ধরতে চাও?"

"আগেই বলেছি, সবসময়েই বাজি ধরতে পারি আমি, এটা তো একটা ছোট্ট ব্যাপার"

লোকটা তার হাতে ধরা চুরুটটার দিকে মনোযোগ দিলো । আমার মনে হচ্ছে গোটা ব্যাপারটার থেকে সে একটা কিছু ফায়দা তুলতে চাইছে বা ছেলেটাকে বেইজ্জত করতে চাইছে লোকটা । কিংবা মনে হচ্ছে এমন একটা কিছু ও মনে মনে খেলা করছে যে ব্যাপারটা শুধু ওই জানে ।

"ঠিক আছে, বাজি ধরি আমরা কেমন?'

"ঠিক আছে, একডলার বাজি" বললো ছেলেটা ।

"না! না ! না! একডলার না, আমি যথেষ্ট ধনী লোক" বললো লোকটা "শোনো এই হোটেলের বাইরে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, চমৎকার গাড়ি, বলা উচিৎ দামি গাড়ি, তোমার দেশে তৈরি, ক্যাডিলাক---"

"আস্তে ভায়া আস্তে!" হেসে উঠলো ছেলেটা "বাজি ধরার মতো এতো দামের জিনিস আমার নেই , এটা পাগলামি"

"পাগলামি নয়" বললো লোকটা "তোমাকে যা করতে হবে সেটা হচ্ছে দশ বার তোমার লাইটারটা চাপতে হবে, যদি দশবারই ঠিক ঠিক মতো আগুন জ্বলে তো ক্যাডিলাকটা তোমার, একটা ক্যাডিলাক পাবার ইচ্ছে আছে তোমার ঠিক?"

"অবশ্যই, একটা ক্যাডিলাক পাবার ইচ্ছা কার না আছে ?" এখনো হাসছে ছেলেটা ।

"বেশ ভালো, তাই সই, ক্যাডিলাকই বাজি রইলো"

"আর আমাকে কি বাজি ধরতে হবে ?"

না জ্বলা সিগারটা এখনও ধরে আছে লোকটা । "আমি তোমাকে এমন কিছু বাজি ধরতে বলতে পারিনা, যেটা তুমি দিতে পারবেনা, ঠিক আছে? ।

"ঠিক আছে" বললো ছেলেটা "কি বাজি ধরতে হবে আমাকে?"

"খুব সহজ জিনিস জিনিসটা তোমার কোন কাজে লাগবেনা" বললো লোকটা ।

"বুঝলাম সহজ জিনিস, কি সহজ জিনিস দিতে হবে আমাকে?"

"খুব সহজ, বাজিতে হারলে বাঁ হাতের ছোট্ট কনি আঙ্গুলটা দিয়ে দেবে তুমি আমাকে" ।

"আমার কি দিতে হবে?" হাসিটা হঠাৎ মুছে গেলো ছেলেটার মুখ থেকে ।

"বাঁ হাতের সবচেয়ে ছোট্ট আঙ্গুলটা" আগের মতোই নির্বিকার লোকটা, তুমি জিতলে পাবে আমার গাড়ি, আর আমি জিতলে পাবো তোমার আঙ্গুল, ঠিক আছে?"
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৯:০১
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের কৃষি আধুনিকায়ন রোডম্যাপ: একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিপত্র রূপরেখা : পর্ব -১ ও ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:১১


প্রস্তাবিত রূপরেখা: কৃষিকে জীবিকানির্ভর খাত থেকে প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু-সহনশীল
ও বৈশ্বিক বাজারমুখী বাণিজ্যিক শিল্পে রূপান্তরের জাতীয় কৌশল প্রস্তাবনা ।

বাংলার মাঠে প্রথম আলোয়
যে ছবি আসে ভেসে
কাঁধে লাঙল, ঘামে ভেজা মুখ
কৃষক দাঁড়ায় হেসে।

সবুজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুদের পর্যবেক্ষণ, শিশুদের ভালোবাসা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩


Two for joy!

আমার চার বছরের নাতনি আলিশবা আমাকে ব্রীদিং এক্সারসাইজ করতে দেখলে সে নিজেও শুরু করে। যতটা পারে, ততটা মনোযোগের সাথে অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। আমি ওকে দেখলে কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি ধার্মিক না মানুষ?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮



ধার্মিক হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
ধার্মিক হওয়া সহজ। বিজ্ঞানী হওয়া সহজ কথা নয়। পিএইচডি করা সহজ কথা নয়। সেই তুলনায় কোরআন মূখস্ত করা সহজ। জন্মগত ভাবে আমি বাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানুষ' হওয়া খুব সোজা, 'মুসলমান' হওয়া কঠিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩৪



একটু আগেই ভাবছিলাম, মানুষ হওয়াটা খুব সহজ। বাবা-মা জিংজিং করে আমাদের পৃথিবীতে এনেছেন, এতে আমাদের কৃতিত্ব কোথায়! কোন কৃতিত্ব নেই। আমরা অটো ভাবেই 'মানুষ' হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি। দুইজন মানব-মানবীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

×