মাথা নাড়লেন জেনারেল । 'সবচেয়ে বড় ।'
'সত্যি?'
'আসলে সত্যি বলতে কী প্রাণীটা এখানকার নয় । এটা আমাকে বাইরে থেকে আমদানী করতে হয় ।'
'কী জানোয়ার আপনি আমদানী করেন জেনারেল? বাঘ?'
হাসলেন জেনারেল । 'না, বাঘ শিকার আমার কাছে, তার আকর্ষণ হারিয়েছে কয়েক বছর আগেই । বাঘ শিকারের সব সম্ভাবনা আমি শেষ করে ফেলেছি । আমার কাছে বাঘ শিকারে আর কোন থ্রিল নেই । কোন সত্যিকারের বিপদ নেই । আমি, মি. রেইন্সফোর্ড; আমি কেবল বিপদের স্বাদ নেয়ার জন্যই বেঁচে আছি ।
পকেট থেকে একটা সোনার সিগারেট কেস বের করে তা থেকে একটা রুপালী প্রান্ত লাগানো কালো সিগারেট বারিয়ে ধরলেন জেনারেল । ধুপের মত একটা সুগন্ধী সে সিগারেটে ।
'চমৎকার জমবে আমাদের শিকার,' বললেন জেনারেল । 'আপনার সঙ্গ পেলে আমার খুবই ভাল লাগবে ।'
'কিন্তু শিকারটা কী ?'-- শুরু করেছিল রেইন্সফোর্ড ।
'আমি বলব আপনাকে,' বললেন জেনারেল । 'আপনি চমৎকৃত হবেন তাতে কোন কোন সন্দেহ নেই । যথাসম্ভব বিনয়ের সাথেই বলছি, আমি একট একেবার নতুন জিনিস আবিষ্কার করে ফেলেছি । আরেক গ্লাস পোর্ট ঢালতে পারি আপনার জন্য ?'
'থ্যাংক ইউ জেনারেল ।'
দুটো গ্লাসই ভরলেন জেনারেল । 'ঈশ্বর কিছু মানুষকে কবি, কিছু মানুষকে রাজা, কিছূ মানুষকে ভিখারি করে বানিয়েছেন, আর আমাকে তিনি বানিয়েছেন শিকারী করে । আমার বাবা বলতেন, আমার হাত একেবারে ট্রিগারের জন্য তৈরি করা । উনি খুব ধনী এবং খুব শিকার পাগল লোক ছিলেন, ক্রিমিয়াতে প্রায় আড়াই লাখ একর জমি ছিল তাঁর ।
আমার যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স, তখন চড়ুই পাখি শিকারের জন্য মস্কো থেকে আমার উপযোগী ছোট্ট একটা বন্দুক বানিয়ে আনেন তিনি । বন্দুকটা দিয়ে যখন আমি বাবার কিছু প্রাইজ পাওয়া তিতিরকে গুলি করে মেরে ফেলি তখন একটুও রাগ না করে বাবা আমার নিশানার প্রশংসা করেন । দশ বছর বয়সে আমি ককেশাসে আমার প্রথম ভালুকটা মারি । আমার গোটা জীবনটাই একটা মস্ত বড় শিকার অভিযান বলতে পারেন ।
সেনাবাহিনীতে যোগ দেই, কারন অভিজাত ঘরের ছেলে হিসেবে সেরকম কোন ক্যারিয়ার প্রত্যাশা করা হত আমার কাছে । ওখানে একটা কসাক ঘোরসওয়ার ডিভিশনের কমান্ড এসে পড়ে । কিন্তু সবসময়ে আমার আসল আগ্রহ ছিল শিকারে। আমি সমস্ত ধরনের জানোয়ার পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তে শিকার করেছি । আমি জীবনে কত প্রাণী মেরেছি তার হিসাব দেয়া অস্ম্ভব ব্যাপার ।'
সিগারেটে টান দিলেন জেনারেল ।
'রাশিয়াতে বিপর্যয় ঘটার পরে আমি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেই, জারের একজন অফিসার হিসেবে দেশে থাকাটা একেবারেই নির্বুদ্ধিতার কাজ হত । বেশিরভাগ অভিজাত রাশিয়ান সর্বস্বান্ত হয়েছিল । কিন্তু আমি সৌভাগ্যবশত আমেরিকার কোম্পানির শেয়ার কিনে রেখে ছিলাম । অতএব আমাকে মন্টি কার্লোতে কোন চায়ের দোকান বা প্যারিসে ট্যাক্সি চালাতে হয় নি ।
স্বাভাবিকভাবেই আমি শিকার চালিয়ে যাই--আপনাদে দেশে গ্রিজলি ভালুক, গঙ্গা নদীতে কুমীর, পুর্ব আফ্রিকাতে গন্ডার । আফ্রিকাতে থাকার সময়েই কেপ বাফেলোর গুঁতো খেয়ে ছ'মাস বিছানায় পড়ে থাকতে হয় । সুস্থ হয়ে উঠে আমাজন অববাহিকায় জাগুয়ার শিকার করতে শুরু করি, আমি শুনেছিলাম যে ওরা নাকি খুব ধুর্ত হয়, দুঃখের বিষয়ে যে ব্যাপার তা নয়,' দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কসাক । আসলে ওরা শক্তিশালী রাইফেলধারী বুদ্ধিমান কোন শিকারীর সাথে টিকতেই পারবে না ।
প্রচন্ড মাথাব্যাথা নিয়ে একদিন শুয়ে আছি আমার তাঁবুতে, এমন সময় একটা ভয়ংকর চিন্তা এল । শিকার ব্যাপারটা পানসে হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে ! আর শিকার মনে আছে আপনার, আমার জীবনের ধ্যানজ্ঞান । আমি শুনেছি অনেক আমেরিকান ব্যাবসায়ী, ব্যাবসা ছেড়ে দেয়ার পর পাগল হয়ে গেছে ।'
'হ্যাঁ, ব্যাপারটা অনেকটাই তাই,' সায় দিল রেইন্সফোর্ড ।
হাসলেন জেনারেল । 'পাগল হওয়ার কোন শখ ছিল না আমার,' বললেন তিনি । 'আমাকে একটা কিছু করতে হবে । এখণ মি. রেইন্সফোর্ড, আমার মনটা সবসময়েই বিশ্লেষনধর্মী, সন্দেহ নেই সেজন্যই আমি শিকারকে এত উপভোগ করেছি ।
'তাতে সন্দেহ নেই, জেনারেল জারফ ।'
'তো,' বলে চললেন জেনারেল । 'আমি নিজেকে জিগ্যেস করলাম কেন শিকারে আর উৎসাহ পাচ্ছি না আমি । আপনি আমার থেকে বয়সে ছোট মি. রেইন্সফোর্ড, এবং এত শিকার করেননি । কিন্তু উত্তরটা আশা করি আন্দাজ করতে পারছেন ।'
'কারনটা কী ?'
'কারন, খুব সহজভাবে বলতে গেলে শিকার ব্যাপারটাই আর আমার কাছে স্পোর্টিং নেই । খুব সহজ হয়ে গেছে ব্যাপারটা । আমি সবসময়েই শিকারকে ঘায়েল করতে পারছি । এবং কোন কিছুতে শতকরা একশোভাগ নিঁখুত হওয়ার থেকে বেশি বিরক্তিকর ব্যাপার আর নেই ।'
আরেকটা সিগারেট ধরালেন জেনারেল ।
'আসলে কোন জানোয়ার আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না । কোন বড়াই করছি না আমি, এটা একটা গাণিতিক নিশ্চয়তা । একটা জানোবার হচ্ছে চারটে পা আর তার অন্ধ প্রবৃত্তি । প্রবৃত্তি, বুদ্ধির সাথে কখনো পেরে উঠতে পারে না । যে মুহুর্তে এই সত্যটা যখন বুঝলাম সেটা অত্যন্ত ট্র্যাজিক মুহুর্ত ছিল আমার জন্য ।'
সামনে টেবিলের উপর ঝুঁকলো রেইন্সফোর্ড, তন্ময় হয়ে শুনছে সে জেনারেলের কথা ।
'আমার মাথায় তখন চিন্তাটা এল যে আমাকে ঠিক কী করতে হবে,' বলে চললেন জেনারেল ।
'আর সেটা কী ?'
জেনারেল হাসলেন, একজন মানুষ যে কি না সাফল্যের সাথে কোন বাধা পেরিয়েছে তার শান্ত হাসি । 'আমাকে একটা নতুন প্রাণী আবিষ্কার করতে হল ।
'একটা নতুন প্রাণী ? আপনি ঠাট্টা করছেন ?'
'একেবারেই না । আমি শিকারের ব্যাপারে কখনো ঠাট্টা করি না । আমার একটা নতুন প্রাণীর দরকার ছিল । আমি সেটা পেয়েছি । তাই আমি এ দ্বীপটা কিনে এই বাড়িটা বানিয়েছি । আর এখানেই আমি শিকার করে থাকি । এই দ্বীপট এই উদ্দেশ্যের জন্য একদম নিঁখুত । অসংখ্য বুনোপথে ভরা জঙ্গল আছে এখানে, আরো আছে পাহাড়, জলাভুমি--'
'কিন্তু প্রাণীটা জেনারেল?'
'প্রাণীটা আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর শিকারের অণুভুতি দেয় । এর সাথে দুনিয়ার আর কোন শিকারের তুলনাই হয় না । রোজই আমি শিকার করি । কোন একঘেয়েমি ধরে না, কারন এখন আমি এমন শিকার পেয়েছি যে আমার সাথে বুদ্ধিতে পাল্লা দিতে পারে ।'
রেইন্সফোর্ডের বিস্ময় তার মুখেই ফুটে উঠেছিল ।
'শিকারের জন্য আমার আদর্শ প্রাণী চাই,' ব্যাখ্যা করলেন জেনারেল । 'আদর্শ শিকারের বৈশিষ্ট্য কী ? প্রাণীটার অবশ্যই সাহস, ধুর্ততা থাকতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এটা আমার সাথে চিন্তায় পাল্লা দিতে পারবে ।'
'কোন জানোয়ারের চিন্তা করার ক্ষমতা নেই,' বাধা দিল রেইন্সফোর্ড ।
'প্রিয় বন্ধু,' বললেন জেনারেল । 'একটা প্রাণী আছে যেটা চিন্তা করে ।'
'কিন্তু আপনি বলতে চাইছেন না--'গলায় কথা আটকে গেল রেইন্সফোর্ডের ।
'এবং কেন নয়?'
'আপনি সিরিয়াস আমি ভাবতেই পারছি না । এটা একটা ভয়ংকর রসিকতা করছেন আপনি ।'
'কেন আমি সিরিয়াস হবো না ? আমি শিকারের কথা বলছি ।'
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ৯:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


