somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকার (ধারাবাহিক রোমাঞ্চ গল্প, তৃতীয় পর্ব)

২৫ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৪:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অবাক হল রেইন্সফোর্ড । 'এখানে বড় কোন শিকারের প্রাণী আছে না কি?'

মাথা নাড়লেন জেনারেল । 'সবচেয়ে বড় ।'

'সত্যি?'

'আসলে সত্যি বলতে কী প্রাণীটা এখানকার নয় । এটা আমাকে বাইরে থেকে আমদানী করতে হয় ।'

'কী জানোয়ার আপনি আমদানী করেন জেনারেল? বাঘ?'

হাসলেন জেনারেল । 'না, বাঘ শিকার আমার কাছে, তার আকর্ষণ হারিয়েছে কয়েক বছর আগেই । বাঘ শিকারের সব সম্ভাবনা আমি শেষ করে ফেলেছি । আমার কাছে বাঘ শিকারে আর কোন থ্রিল নেই । কোন সত্যিকারের বিপদ নেই । আমি, মি. রেইন্সফোর্ড; আমি কেবল বিপদের স্বাদ নেয়ার জন্যই বেঁচে আছি ।

পকেট থেকে একটা সোনার সিগারেট কেস বের করে তা থেকে একটা রুপালী প্রান্ত লাগানো কালো সিগারেট বারিয়ে ধরলেন জেনারেল । ধুপের মত একটা সুগন্ধী সে সিগারেটে ।

'চমৎকার জমবে আমাদের শিকার,' বললেন জেনারেল । 'আপনার সঙ্গ পেলে আমার খুবই ভাল লাগবে ।'

'কিন্তু শিকারটা কী ?'-- শুরু করেছিল রেইন্সফোর্ড ।

'আমি বলব আপনাকে,' বললেন জেনারেল । 'আপনি চমৎকৃত হবেন তাতে কোন কোন সন্দেহ নেই । যথাসম্ভব বিনয়ের সাথেই বলছি, আমি একট একেবার নতুন জিনিস আবিষ্কার করে ফেলেছি । আরেক গ্লাস পোর্ট ঢালতে পারি আপনার জন্য ?'

'থ্যাংক ইউ জেনারেল ।'

দুটো গ্লাসই ভরলেন জেনারেল । 'ঈশ্বর কিছু মানুষকে কবি, কিছু মানুষকে রাজা, কিছূ মানুষকে ভিখারি করে বানিয়েছেন, আর আমাকে তিনি বানিয়েছেন শিকারী করে । আমার বাবা বলতেন, আমার হাত একেবারে ট্রিগারের জন্য তৈরি করা । উনি খুব ধনী এবং খুব শিকার পাগল লোক ছিলেন, ক্রিমিয়াতে প্রায় আড়াই লাখ একর জমি ছিল তাঁর ।

আমার যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স, তখন চড়ুই পাখি শিকারের জন্য মস্কো থেকে আমার উপযোগী ছোট্ট একটা বন্দুক বানিয়ে আনেন তিনি । বন্দুকটা দিয়ে যখন আমি বাবার কিছু প্রাইজ পাওয়া তিতিরকে গুলি করে মেরে ফেলি তখন একটুও রাগ না করে বাবা আমার নিশানার প্রশংসা করেন । দশ বছর বয়সে আমি ককেশাসে আমার প্রথম ভালুকটা মারি । আমার গোটা জীবনটাই একটা মস্ত বড় শিকার অভিযান বলতে পারেন ।

সেনাবাহিনীতে যোগ দেই, কারন অভিজাত ঘরের ছেলে হিসেবে সেরকম কোন ক্যারিয়ার প্রত্যাশা করা হত আমার কাছে । ওখানে একটা কসাক ঘোরসওয়ার ডিভিশনের কমান্ড এসে পড়ে । কিন্তু সবসময়ে আমার আসল আগ্রহ ছিল শিকারে। আমি সমস্ত ধরনের জানোয়ার পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তে শিকার করেছি । আমি জীবনে কত প্রাণী মেরেছি তার হিসাব দেয়া অস্ম্ভব ব্যাপার ।'

সিগারেটে টান দিলেন জেনারেল ।

'রাশিয়াতে বিপর্যয় ঘটার পরে আমি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেই, জারের একজন অফিসার হিসেবে দেশে থাকাটা একেবারেই নির্বুদ্ধিতার কাজ হত । বেশিরভাগ অভিজাত রাশিয়ান সর্বস্বান্ত হয়েছিল । কিন্তু আমি সৌভাগ্যবশত আমেরিকার কোম্পানির শেয়ার কিনে রেখে ছিলাম । অতএব আমাকে মন্টি কার্লোতে কোন চায়ের দোকান বা প্যারিসে ট্যাক্সি চালাতে হয় নি ।

স্বাভাবিকভাবেই আমি শিকার চালিয়ে যাই--আপনাদে দেশে গ্রিজলি ভালুক, গঙ্গা নদীতে কুমীর, পুর্ব আফ্রিকাতে গন্ডার । আফ্রিকাতে থাকার সময়েই কেপ বাফেলোর গুঁতো খেয়ে ছ'মাস বিছানায় পড়ে থাকতে হয় । সুস্থ হয়ে উঠে আমাজন অববাহিকায় জাগুয়ার শিকার করতে শুরু করি, আমি শুনেছিলাম যে ওরা নাকি খুব ধুর্ত হয়, দুঃখের বিষয়ে যে ব্যাপার তা নয়,' দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কসাক । আসলে ওরা শক্তিশালী রাইফেলধারী বুদ্ধিমান কোন শিকারীর সাথে টিকতেই পারবে না ।

প্রচন্ড মাথাব্যাথা নিয়ে একদিন শুয়ে আছি আমার তাঁবুতে, এমন সময় একটা ভয়ংকর চিন্তা এল । শিকার ব্যাপারটা পানসে হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে ! আর শিকার মনে আছে আপনার, আমার জীবনের ধ্যানজ্ঞান । আমি শুনেছি অনেক আমেরিকান ব্যাবসায়ী, ব্যাবসা ছেড়ে দেয়ার পর পাগল হয়ে গেছে ।'

'হ্যাঁ, ব্যাপারটা অনেকটাই তাই,' সায় দিল রেইন্সফোর্ড ।

হাসলেন জেনারেল । 'পাগল হওয়ার কোন শখ ছিল না আমার,' বললেন তিনি । 'আমাকে একটা কিছু করতে হবে । এখণ মি. রেইন্সফোর্ড, আমার মনটা সবসময়েই বিশ্লেষনধর্মী, সন্দেহ নেই সেজন্যই আমি শিকারকে এত উপভোগ করেছি ।

'তাতে সন্দেহ নেই, জেনারেল জারফ ।'

'তো,' বলে চললেন জেনারেল । 'আমি নিজেকে জিগ্যেস করলাম কেন শিকারে আর উৎসাহ পাচ্ছি না আমি । আপনি আমার থেকে বয়সে ছোট মি. রেইন্সফোর্ড, এবং এত শিকার করেননি । কিন্তু উত্তরটা আশা করি আন্দাজ করতে পারছেন ।'

'কারনটা কী ?'

'কারন, খুব সহজভাবে বলতে গেলে শিকার ব্যাপারটাই আর আমার কাছে স্পোর্টিং নেই । খুব সহজ হয়ে গেছে ব্যাপারটা । আমি সবসময়েই শিকারকে ঘায়েল করতে পারছি । এবং কোন কিছুতে শতকরা একশোভাগ নিঁখুত হওয়ার থেকে বেশি বিরক্তিকর ব্যাপার আর নেই ।'

আরেকটা সিগারেট ধরালেন জেনারেল ।

'আসলে কোন জানোয়ার আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না । কোন বড়াই করছি না আমি, এটা একটা গাণিতিক নিশ্চয়তা । একটা জানোবার হচ্ছে চারটে পা আর তার অন্ধ প্রবৃত্তি । প্রবৃত্তি, বুদ্ধির সাথে কখনো পেরে উঠতে পারে না । যে মুহুর্তে এই সত্যটা যখন বুঝলাম সেটা অত্যন্ত ট্র্যাজিক মুহুর্ত ছিল আমার জন্য ।'

সামনে টেবিলের উপর ঝুঁকলো রেইন্সফোর্ড, তন্ময় হয়ে শুনছে সে জেনারেলের কথা ।

'আমার মাথায় তখন চিন্তাটা এল যে আমাকে ঠিক কী করতে হবে,' বলে চললেন জেনারেল ।

'আর সেটা কী ?'

জেনারেল হাসলেন, একজন মানুষ যে কি না সাফল্যের সাথে কোন বাধা পেরিয়েছে তার শান্ত হাসি । 'আমাকে একটা নতুন প্রাণী আবিষ্কার করতে হল ।

'একটা নতুন প্রাণী ? আপনি ঠাট্টা করছেন ?'

'একেবারেই না । আমি শিকারের ব্যাপারে কখনো ঠাট্টা করি না । আমার একটা নতুন প্রাণীর দরকার ছিল । আমি সেটা পেয়েছি । তাই আমি এ দ্বীপটা কিনে এই বাড়িটা বানিয়েছি । আর এখানেই আমি শিকার করে থাকি । এই দ্বীপট এই উদ্দেশ্যের জন্য একদম নিঁখুত । অসংখ্য বুনোপথে ভরা জঙ্গল আছে এখানে, আরো আছে পাহাড়, জলাভুমি--'

'কিন্তু প্রাণীটা জেনারেল?'

'প্রাণীটা আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর শিকারের অণুভুতি দেয় । এর সাথে দুনিয়ার আর কোন শিকারের তুলনাই হয় না । রোজই আমি শিকার করি । কোন একঘেয়েমি ধরে না, কারন এখন আমি এমন শিকার পেয়েছি যে আমার সাথে বুদ্ধিতে পাল্লা দিতে পারে ।'

রেইন্সফোর্ডের বিস্ময় তার মুখেই ফুটে উঠেছিল ।

'শিকারের জন্য আমার আদর্শ প্রাণী চাই,' ব্যাখ্যা করলেন জেনারেল । 'আদর্শ শিকারের বৈশিষ্ট্য কী ? প্রাণীটার অবশ্যই সাহস, ধুর্ততা থাকতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এটা আমার সাথে চিন্তায় পাল্লা দিতে পারবে ।'

'কোন জানোয়ারের চিন্তা করার ক্ষমতা নেই,' বাধা দিল রেইন্সফোর্ড ।

'প্রিয় বন্ধু,' বললেন জেনারেল । 'একটা প্রাণী আছে যেটা চিন্তা করে ।'

'কিন্তু আপনি বলতে চাইছেন না--'গলায় কথা আটকে গেল রেইন্সফোর্ডের ।

'এবং কেন নয়?'

'আপনি সিরিয়াস আমি ভাবতেই পারছি না । এটা একটা ভয়ংকর রসিকতা করছেন আপনি ।'

'কেন আমি সিরিয়াস হবো না ? আমি শিকারের কথা বলছি ।'


(চলবে)

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ৯:৪৭
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ ইলিশ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:২৬


ইলিশ!ইলিশ!! রূপালী ইলিশ, কোথায় তোমার দেশ? 
ভোজন রসিকের রসনায় তুমি তৃপ্তি অনিঃশেষ। 

সরষে- ইলিশ, ইলিশ-বেগুন আরও নানান পদ
যেমন তেমন রান্না তবুও খেতে দারুণ সোয়াদ

রূপে তুমি অনন্য ঝলমলে ও চকচকে।
যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানবাধিকার' (অণু গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

'মানবাধিকার' একটা এনজিও। তারা বিদেশী সহায়তা নিয়ে মানুষ, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করে। আজ তারা একটা বড় সমাবেশ করছে প্রেসক্লাবে। সমাবেশে সাংবাদিকসহ নানান পেশার মানুষ অংশ নিয়েছে। টিভি সাংবাদিকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু দ্বিতীয় রিফাইনারি (ERL-2) টা করে দেখান , সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গতকাল নাটকীয়তায় ভরা একটা দিন আমরা পার করলাম । রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন ঝড় বয়ে গেল। পুরো সোশ্যাল মিডিয়া যেন দুই ভাগে ভাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×