somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কেতাবী কচকচি; কেন আমি বইমেলা, মানুষকে বইমুখী করবে এমন ধারনায় বিশেষ আশাবাদী নই

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১০:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বছর ঘুরে আবার এসেছে বইমেলা । অনেকে আশাহত যে এইবার মাটিতে (আগের আরো অনেকবারের মত) আবর্জনার মাত্রাটা নাকি একটু বেশিই (অবশ্য আবর্জনা কেবল মাটিতেই পড়ে না, দোকানের তাকে সেসব অনায়াসে শোভা পায়, যদিও সেসব কথা বলতে গেলে বজ্যর্ের সংজ্ঞা নিয়ে বাহাস করতে অনেকেই তেড়ে আসবেন ) । অনেকে আবার কালো পোশাকধারী নিরাপত্তা রক্ষীদের দেহতল্লাশীতে বিব্রত-বিস্মিত-ক্ষুদ্ধ ।

আশা করি আপনাদের মনে আছে, এই কয়েক মাস আগেও আমাদের এই ব-দ্বীপ গ্রামটিতে গাঁয়ে-মানে-না-আপনি-মোড়ল হবার ননস্টপ-কাছা-খোলা রেসলিং এ আমাদের সবারই দীগম্বর হবার অভাবিত সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল । জটলা যখন ভাঙলো, ধুলো যখন সরলো এবং খাজাঞ্চিখানার এক কান্ডারি যখন হাল ধরলেন তখন দেখা গেল পানি অনেক ঘোলা হয়ে গেছে ।

চিরকালই অনাথ আমরা এই আমজনতা অবশেষে আরেকরকমের মুরুবি্ব পেলাম । কিন্তু বইমেলা সার্কাসটা (সার্ক মেলার মতই) এতো অল্পসময়ে নতুন মুরুবি্বদের প্রায়োরিটি লিস্টে ঠিক ওইভাবে, মানে ঠিক ওরকম ইজ্জত কা সওয়াল হয়ে উঠলো না । তাঁদের প্রাধিকারের তালিকায় আরো অনেক রাষ্ট্রিক জরুরী কর্মকান্ড জমা হয়ে আছে । মুরুবি্বদের বেশি দোষ দেয়াটা বোধহয় উচিৎ হবে না । দায়সারা ভাবে হলেও তারা আয়োজন করেছেন, সেজন্য কিছুটা ধন্যবাদ তাঁরা পাবেন । মেলা বসেছে, যদিও আটশো টাকার কাগজ অনেক জায়গায় হয়ে গেছে বাইশ শো টাকা (শোনা কথা) ।

না, আয়োজন বা নিরাপত্তা নিয়ে কোন ক্যাঁচাল নামছি না আমি । আমি যে ব্যাপারটা আরেকবার বলতে চাই তা হচ্ছে বইমেলা নিয়ে আমাদের আকাশছোঁয়া হ্যাংলা প্রত্যাশা । একুশের বইমেলা আমাদের ঠিক কী দিতে পারবে? অন্যভাবে বলতে গেলে কোন বইমেলা কী দিতে পারে ?

আমাদের প্রকাশনা শিল্পে (কুটির শিল্প বললে ভাল হয়) যে তিনটি ইভেন্ট আছে তা হচ্ছে 1) নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু 2) বইমেলা 3) ঈদসংখ্যা (শেষটা অবশ্য পত্রিকার বেলায় খাটে বেশি) । এগুলোই ঘিরেই আমাদের পাবলিশিং ক্যালেন্ডার আবর্তিত হয় । প্রকাশনার জন্য এগুলোই হচ্ছে হাই টাইড । ইন্ডাস্ট্রির পয়েন্ট থেকে ধরলে ঠিক আছে, সব শিল্পেরই কিছু মৌসুম-চ্যাম্পিওন্স লিগ থাকে । ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার মত ফ্রাংকফুর্ট গাড়িমেলাও গাড়ি শিল্পের একটা কী-ইভেন্ট । বয় স্কাউটদের যেমন থাকে জাম্বোরি ।

বইমেলা একটা কাজ করতে পারে না । সেটা হচ্ছে কোন বইমেলা কখনো পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে পারে না । মেলায় যাওয়াটা অভ্যাস বা গরজের ব্যাপার । গবাদী পশুর হাট বসলেও এই লোকগুলো ঠিক এই ভাবেই যেত । তারা যায়, বই উল্টে দেখে । দোকানীকে বলে হিমু-গোপালভাঁড়-সর্বশেষ নোবেল পাওয়া বইটার কপি চাই । তারা জিজ্ঞাসা করে অভ্যাসবশে, তারা শুনেছে, তারা পড়েছে প্রথম আলোতে রুচিশীল মানুষেরা ওসব বই পড়ে থাকেন । তাদের ইস্কুল পড়ুয়া ছেলে-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা ওসব বইয়ের আব্দার করেছে, তাই তারা কিনছেন ।

মানুষ কত বই কিনে পড়তে পারে? এতো পেপসোডেন্ট বা কোলগেট টুথপেস্ট নয় যে একবার ব্যাবহার করলেই বুঝে যাবো জিনিসটার স্বাদ এরকম । বই সেরকম ব্যাপার না হওয়াতে আমাদের সেই আগের অভিজ্ঞতা দিয়ে যাচাই করার সুযোগ কম, কখনো বা প্রায় অসম্ভব । বই আমাদের হয় কিনতে হয়, হয় নতুন নয় সেকেন্ডহ্যান্ড । নয় আমরা ধার নেই বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে, নয়তো (এখনো আছে বাংলাদেশে এই প্রথা, আমাদের যে অবস্থা তাতে এ প্রথা থাকা উচিৎ ) আমরা বই ভাড়া নেই । অবশ্য ই-বুকের সুর্য পাঠকের দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে ধীর গতিতে । কিন্তু বাঙ্গালী পাঠকের জন্য এখনো তা ধর্তব্যের বাইরে ।

বই থাকে লাইব্রেরিতে । লাইব্রেরি কনসেপ্টটাই এমন ভাবে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল । লাইব্রেরি বলতে আমরা বুঝি বইয়ের দোকান/ছাপাখানা/ বা প্রকাশনা সংক্রান্ত একটা কিছু । অনেকটা নাইট ক্লাব বা ডিস্কোথেকের মত ব্যাপার । সিনেমায় দেখেছি, বইতেও পড়েছি, গল্প শুনেছি অনেক, কিন্তু সত্যিকারের (লেন্ডিং জেনারেল ) পাবলিক লাইব্রেরিতে পদার্পন করিনি এই দেশে । না দেখা জিনিস, ধোঁয়াটে জিনিস তো এভাবে মনের ভিতর নানান আকার পাবেই ।

আমাদের সরকারী মালিকানাধীন গ্রন্থাগার পদবাচ্য যা কিছু আছে তা আসলে ইন্সটিটিউশনাল বা প্রফেশনাল লাইব্রেরি । ব্যাবস্থাপনার দিক থেকে ধরলে সেগুলো লাইব্রেরি নামের কলংক এবং প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল । এবং যদি সেগুলোর ম্যানেজমেন্ট, কালেকশন নিয়ে কোন প্রশ্ন নাও উঠত তবু সেগুলো আমজনতার কাজে আসতো না বিশেষ । কারন প্রবেশাধিকারের নিষেধাজ্ঞা, দুই সংগ্রহের একমুখীতা এবং ধার দেওয়ার কোন ব্যাবস্থা না থাকা ।

এই শেষ বৈশিষ্ট্যটা পাবলিক লাইব্রেরিকে অন্যান্য লাইব্রেরি থেকে আলাদা করে দিয়েছে । সেখানে সবমানুষের প্রবেশাধিকার থাকবে, সবধরনের বই থাকবে, ওপেন শেলফে এবং মানুষ সেখান থেকে নির্দিষ্ট সংখক বই-জার্নাল-সিডি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ধার নিতে পারবে । মানুষ যদি বিশ্টা বই পড়ে তো অন্তত একটা সে কিনলেও কিনতে পারে ।

সেইজন্যই 'প্রিয়জনকে বই উপহার দিন' টাইপের ফালতু স্লোগান ফেলে (ওটা তো বোধহয় এমনিতেও বাদ), কেন মেলায় তিরিশ হাজার মানুষ আসছে রোজ, কেন চলি্লশ হাজার আসছে না এধরনের ফালতু পরিসংখ্যান না জপে, কেন শুক্রবারে বই বিক্রি বিষ্যুদবারের চেয়ে বেশি সে চিন্তায় কপালে ভাঁজ না ফেলে, গোড়ার গলদে আসি ।

সাধারন মানুষ মোটের উপর নাদান রয়ে গেছে ।

তার মুল কারন সে পড়তে শেখেনি (শিখেছে অল্প ও একদেশদর্শীভাবে) ।

মানুষ পড়তে শেখেনি কারন সে সুযোগ পায়নি ।

এই বই মেলা তাকে পড়তে শেখাবে না, মেলা যত চটকদার-চমকদার-পদভারে গমগমে হোক না কেন ।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:০৬
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মেড ইন বাংলাদেশ ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:২২


দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটা আমাদের দেশে ঋতুভেদে বদলায়। তবে ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী সময়ে আমরা এক নতুন ধরনের সিজনাল দেশপ্রেম দেখলাম। একে বলা যেতে পারে "রিটার্ন টিকিট দেশপ্রেম"। যারা দেশে বিদেশে আরাম-আয়েশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের কৃষি আধুনিকায়ন রোডম্যাপ: একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিপত্র রূপরেখা : পর্ব -১ ও ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:১১


প্রস্তাবিত রূপরেখা: কৃষিকে জীবিকানির্ভর খাত থেকে প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু-সহনশীল
ও বৈশ্বিক বাজারমুখী বাণিজ্যিক শিল্পে রূপান্তরের জাতীয় কৌশল প্রস্তাবনা ।

বাংলার মাঠে প্রথম আলোয়
যে ছবি আসে ভেসে
কাঁধে লাঙল, ঘামে ভেজা মুখ
কৃষক দাঁড়ায় হেসে।

সবুজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুদের পর্যবেক্ষণ, শিশুদের ভালোবাসা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩


Two for joy!

আমার চার বছরের নাতনি আলিশবা আমাকে ব্রীদিং এক্সারসাইজ করতে দেখলে সে নিজেও শুরু করে। যতটা পারে, ততটা মনোযোগের সাথে অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। আমি ওকে দেখলে কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি ধার্মিক না মানুষ?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

ধার্মিক হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
ধার্মিক হওয়া সহজ। বিজ্ঞানী হওয়া সহজ কথা নয়। পিএইচডি করা সহজ কথা নয়। সেই তুলনায় কোরআন মূখস্ত করা সহজ। জন্মগত ভাবে আমি বাপ মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

×