(সাধ্য থাকলে সোনার মেডেলই দিতাম। কিন্তু সোনা এত দামী যে শুধু ইচ্ছা আর আন্তরিকতা থাকলেই চলেনা, এটা দেয়ার জন্যে সামথর্্য লাগে)
হঠাৎ করে মরে যাওয়া, মরন পরবর্তীকালে মালুম করতে না পারা কখন মরলাম, কিভাবে মরলাম এবং সর্বোপরি একটি আস্ত পরকালের সামনে পড়া; এই পুরো ঘটনাচক্র একজন মার্কসবাদী তরুনের জন্য নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। ঘটনার সূচনালগ্নে অনুভুত হচ্ছিল একটি তীব্র গোলকধাঁধা যেখানে একইসাথে অসীম পরিমাণ অন্ধকার এবং দূর্বোধ্যতা বিরাজমান ছিল। সময়ের সাথে সাথে অন্ধকার একটু কমে আসলেও দূর্বোধ্যতা মোটেও পাল্লা দিচ্ছিল না তার সাথে। ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে থাকে গাছের চারা ঢেকে রাখা কিছু বাঁশের খাচা যারা মাঝে মধ্যেই নড়ে উঠছিলো বাতাসের স্পর্শে। ক্রমহ্রাসমান অন্ধকার বাঁশের খাচা গুলিকে নগ্ন নারী-পুরুষে রূপান্তরিত করলো। যতো দ্রুত বলা হলো ততো দ্রুত ঘটলো না এসব ঘটনা। এটি দীর্ঘ সময় ধরে ঘটলো। পার্থিব জগতের সময় নিরুপণ সংক্রান্ত হিসাব-কিতাবে ওই দীর্ঘ সময় সম্পর্কে আন্দাজ করা সম্ভব নয়। নগ্ন নারী-পুরুষ গুলি রহস্যময় কোন কিছুর তাড়নায় কেপে কেপে উঠছিলো কিছ ক্ষুণ পর পর। তাদের নগ্নতা, কাপুনি এবং সবকিছূর মাঝখানে ঘাপটি মেরে থাকা রহস্যময়তা দেখতে দেখতে নিজেকেও নগ্ন আবিস্কার করে মইন। অত্যন্ত অস্পষ্ট ও আবছায়ভাবে দৃশ্যমান এইসব নগ্ন নারী-পুরুষের সাথে নগ্নতার সমস্বত্ততাবোধ একটু হলেও কমিয়ে দেয় তার ভয়কে। যে ভয়াবহ বিচ্ছন্নতা ও একাকিত্বের বোধ শুরু থেকেই বিহবল করে রেখেছিল তাকে তা থেকে মুক্ত হয়েই মাথাটাকে সক্রিয় করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। বুঝতে পারে অত্যন্ত ধীর গতিতে অবসান ঘটতে যাচ্ছে এই দীর্ঘ, কান্তিকর রাতের। ভোরের জন্য ব্যাকুলতা বাড়তে থাকে তার।
অস্বাভাবিক এবং হতচকিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট এরকম একটি ভোরের আগমনে মইন নিশ্চিত হয় যে, সে কোন দূঃস্বপ্ন দেখছে না। যদিও রাতটি ছিল অসম্ভব দীর্ঘ কিন্তু ভোর হওয়া পরবর্তী সময়গুলো দ্রুত চলে যাচ্ছিল। অত্যন্ত চড়া এবং আকৃতিতে তুলনামূলক বড় একটি সূর্য আবির্ভূত হলো। দেখা গেল একটি বড়ো মাঠ। এটি এত বড় যে বিশালতা নিয়ে কোন ধারণা লাভ সম্ভব নয়।আর এই পুরো মাঠ জুড়ে গিজগিজ করছিলো মানুষ। ওখানে যে আসলে কতো মানুষ সে সম্পর্কেও কোন ধারণা লাভ সম্ভব নয়। অতিদ্রুত সূর্য মাথার ওপর চলে আসলো এবং উত্তরোত্তর বড় হতে লাগলো। মইনের মনে হলো তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে তার চুলগুলি পুড়ে পরস্পরের সাথে লেগে গেল। একই রকম ঘটনা ঘটলো ওখানে উপস্থিত সকলের ক্ষেত্রেই, তারা প্রত্যেকেই অজানা কোন গন্তব্যের দিকে দৌড়াতে শুরু করলো।
ভয়াবহ পরিমাণ আতংক উৎপাদিত করে সব ঘটনা স্পষ্ট হলো কিছুনের মধ্যেই। এই অবস্থান পরজগতে এবং অসংখ্য মানুষের দৌড়াদৌড়ি করা এই জায়গার নাম হাশরের মাঠ। মনে হচ্ছে দূর্বোধ্যতা এবং রহস্যময়তাই ভালো ছিলো। আস্ত পরজগত, তাও ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত বয়ানের কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন; এ উদ্ভট পরিস্থিতি মইনকে অসহায়ত্বের সর্বশেষ সীমায় পৌছে দেয়। হয়তো স্বপ্ন দেখছে এরকম একটি ক্ষীন প্রত্যাশা তৈরি হয় তার মধ্যে। ঘটনা বুঝতে একটি চিমটি কেটে বসে হাতে। তীব্র রোদে টসটসে হয়ে থাকা হাতে নখের স্পর্শ লাগা মাত্রই 'টুস' করে একটি শব্দ হয়ে ফেটে যায় চামড়া এবং গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করে।
দুই.
খেগড়াঘাট গ্রামে পা রাখার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মান্দারের বাপ সম্পর্কে চালূ গল্পটি শোনা হয়ে গিয়েছিলো মইনের। অতি বৃদ্ধ বয়সেও শারিরীক সমতা এবং মাছ ধরার েেত্র বিশেষ দক্ষতা এই গ্রামবাসীর কাছে তাকে আলাদা করে রেখেছিলো। তার সম্পর্কে চালু বিখ্যাত গল্পটি সবকিছুকে ছাপিয়ে তার অন্য একটি পরিচয়কে হাজির করে, তা হচ্ছে সারল্য। গল্পটির শিরোনাম,
মান্দারের দয়া আছে,
একটু বেশি বয়সে বিয়ে করা মান্দারের বাপের বড় সন্তান পূত্র মান্দার। তারবউ মারা গেছে বেশ আগে। মান্দার এবং স্বামী পরিত্যাক্তা কন্যা হোমায়রা (শিশু কন্যাসহ) নিয়ে তার সংসার। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত দুই বিঘা জমি এবং মাছ ধরার আয় এ দুয়ে মিলে কোনমতে সংসার চলে যায়। এ গল্পটির উৎপত্তির কেন্দ্র ঐ দুই বিঘা জমি। পূত্র মান্দারের কাছে হোমায়রার এ বাড়ীতে অবস্থান বাড়তি উৎপাত। তাকে বিতাড়নের নানারকম উপায় বের করাই মূলত: মান্দারের কাজ। নিজের অবর্তমানে হোমায়রা ও তার শিশু কন্যার ভবিষ্যত চিন্তায় ঐ দুই বিঘা জমি হোমায়রার নামে লিখে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন মান্দারের বাপ। বীর পূত্র মান্দার পিতার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রচেষ্টা বিপুল বিক্রমে প্রতিহত করে তাকে অভিনব শাস্তি দেয়। তাকে বাড়ির মধ্যেও পুকুরটিতে ফেলে চুবানো শুরু করে। পানিতে চুবিয়ে রাখে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না বুদবুদ উঠে যায়। কয়েকবার শ্বাস নিতে দিয়ে আবার চুবিয়ে ধরে। ঘন্টাখানেক ধরে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। এক পর্যায়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাকে বাড়ীর উঠোনে ফেলে রেখে চলে যায়। প্রতিবেশীদের শুশ্রসায় জ্ঞান ফিরে পেয়ে মান্দারের বাপ প্রথম যে কথাটি বলে তা হলো আমাগো মান্দারের দয়া আছে। ব্যাখ্যা হিসেবে সে যে বক্তব্য হাজির করে, তা এরকম-
মান্দার তাকে পানিতে চুবিয়ে রাখলেও মরার আগে ঠিকই টেনে তুলেছে। সে তো চাইলে তাকে মেরেও ফেলতে পারতো। সেেেত্র ঐ জমির মালিক মান্দারই হতো। সুতরাং মান্দার কর্তৃক প্রদর্শিত দয়া অবশ্যই উল্লেখ করার মতো।
খেগড়াগাট গ্রামে মইনের তৃতীয় দিনের বৈকালিক অবস্থান ছিলো আগের দুদিনের মতোই। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যেটি ঘটে তা হচ্ছে মান্দারের বাপের সাথে তার সাাত। বিকেল থেকেই বাজারের একমাত্র ময়রা সামান্নানার(সামাদ+নানা) দোকানে বসেছিলো সে। শ্রাবন মাসে গ্রামের কাদার ব্যাপারে সে সম্যক ধারণা লাভ করেছিলো আগের দুদিনেই। যে কারনে কোথাও যাওয়ার ব্যাপাওে তার তেমন কোন আগ্রহ ছিলো না। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টি, আদা চা এবং স্টকে থাকা পর্যাপ্ত সিগারেট, সবকিছু মিলিয়ে আরামেই ছিলো সে। আরাম প্রসূত উচ্চমাগর্ীয় চিন্তা-ভাবনারও যথেষ্ট আমদানি ছিল। নদীর দিকে তাকিয়ে, ঝুম বৃষ্টি, নদীর ওপাওে কোমর পানিতে দাড়িয়ে থাকা ধানগাছ দেখতে দেখতে এক ধরণের পরাবাস্তব ভাবালুতা পেয়ে বসে তাকে। দৃশ্যটিকে সত্যি বলে মনে হয় না তার। বরং জলরং এ আঁকা
ধানক্ষেত আর বৃষ্টির ছবি অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। পঞ্চমবারের মতো লাল চায়ে চুমুক লাগাচ্ছিল সে। অন্ধকারে কাঁদা ভেঙে একটি হারিকেন ও দুটি পা'কে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। আরো কাছে আসলে একটি হাড্ডিসর্বস্ব কৃষ্ণকায় কৃশ শরীরও দৃশ্যমান হয়। ময়রা সামান্নানা চিনিয়ে দেয় এই হচ্ছে মান্দারের বাপ।
তিন.
কতকাল আর এভাবে দৌড়ানো যায় বুঝতে পারে না মঈন । পাহাড় পর্বত পেরিয়ে, পাথুরে খাড়া ঢাল আর রোদে জ্বলা হলুদ ঘাস ডিঙ্গিয়ে অবিরাম দৌড়ানো। সে হয়তো থেমে যেতো। কিন্তু থেমে গেলেই একা হয়ে যাবে এ ভয় তার পা দুটোকে থামতে দেয়না। হয়তো অন্যদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। দু একবার মইনের মনে হয় অন্যদের দিকে তাকানো উচিৎ, কথা বলা উচিৎ এবং তারা যে কাজ করছে তার ব্যাখ্যা খোজা উচিৎ। কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যেহেতু এভাবে বলা হয়নি, সে আশা পরিত্যাগ করে সে।তাদের পথ চলায় একটু বৈচিত্র নামে। নীলের জগত থেকে তারা একটি উজ্বল লাল জগতে পৌছায়। চারিদিকে সবকিছুই টকটকে লাল। সবার দৌড়ের গতি কমে আসে। যেন আপনা-আপনি সবাই বুঝতে পেরেছে যে তাদের আর বেশিক্ষণ দৌড়াতে হবেনা। আবারো একটি বিশাল মাঠে এসে দৌড় পুরোপুরি থেমে যায়। প্রায় এরকম একটি মাঠ থেকেই দৌড় শুরু করা হয়েছিল। টকটকে লাল মাঠের মধ্যে তুষার শুভ্র বিরাট দাড়িপাল্লা দেখা যায়। ধাঁ করে মনে পড়ে যায় মইনের; এর নাম মিযান।এখানে সব মানুষের পাপ-পূন্যের ওজন করা হবে। নতুন করে দূঃশ্চিন্তা পেয়ে বসে তাকে। দুনিয়াতে সে ছিলো মার্কসীয় মতাদর্শী। প্রচলিত ধর্ম-কর্ম মানেনি। সুতরাং মাপামাপির পর তকে পাপী ঘোষণা করে দোযখে ভরে দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এর মধ্যেই কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক ফেরেশতা এসে তাকে ধরে ফেলে। নিয়ে যায় মিযানের কাছাকাছি। তারা ঘটায় এক আশ্চর্য ঘটনা। দুদিক থেকে টানাটানি করে তার মধ্যে থেকে আরেকজন মইন কে বের করে। দুজনের মধ্যেই সে নিজেকে উপলব্ধি করে। পাল্লার দু দিকে বসিয়ে দেয়া হয় দু'জন মইনকে। পাল্লায় কোন পরিবর্তন বুঝতে পারেনা সে। নামিয়ে ফেলা হয় তাদের। একজন মইন এর মধ্যে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ একজন এস ডান হাতে একটি সাদা কাগজ ধরিয়ে দেয়। স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। পূণ্যের ওজন বেশি হওয়ায় তাকে বেহেশতে পাঠানোর রায় দেয়া হয়েছে।
নানা ধরণের দুঃশ্চিন্তা, শ্রান্তি ও হতাশা পানি হয়ে যায় নিমিষেই। ভারী উৎফুল্ল হয়ে ওঠে সে। বেঁচে থাকতে বেহেশতের বর্ণনা সবসময় হাস্যকর মনে হলেও সেগুলো আকর্ষনীয় ছিল নিঃসন্দেহে। আয়তনয়না হুর, অনাস্বাদিত শরাবের স্বাদ এবং আরো সব বিনোদন প্রক্রিযা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তার চোখে। হিন্দি গানের সুরে শীষ দিতে দিতে পথ চলা শুরু করে।
লাল জগত পেরিয়ে সবুজের জগতে সে পড়ে সে এবং অন্যান্য বেহেশতবাসীরা। ধীরে সুস্থ্যে এগোয় তারা। কোন তাড়া নেই, শ্রান্তি নেই। সামনের পথ সবুজ থেকে আরো সবুজতর হতে থাকে। আশ্চর্যরকম প্রশান্তিদায়ক সেই সবুজ। পৃথিবীর মতো সুন্দর হয়ে ওঠে সবকিছু। বিস্তৃত পর্বতমালা, ফাঁকে ফাঁকে চমৎকার স্বচ্ছ ঝর্ণা এবং সবচেয়ে সুন্দর যেটি তা হচ্ছে ঝকঝকে নীল আকাশ। পরজগতে নীল আকাশ দেখতে পাওয়ার আশ্চর্য অভিজ্ঞতা বিমোহিত করে ফেলে মইনকে।
অনেক দুর থেকে একটি বিশাল গেটের উপরিভাগ দৃশ্যমান হয় তাদের সামনে। যৌক্তিক কারণেই পুরো জমায়েতের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়। গেটটি বেহেশতেরই গেট। যতই তারা এগায় সোনালী রঙা গেটের চমৎকার কারুকার্য ততই স্পষ্ট হতে থাকে। সোনা রঙা গেট আর চারিদিকে সবুজের প্রাবল্য, তারা দেখতে থাকে; তাদের চোখে যতখানি ধরে। গেটের পুরো সম্মুখভাগ জুড়ে দন্ডায়মান অসংখ্য নারী-পুরুষ ফেরেশতা। সকল বেহেশতবাসীকে প্রবেশ করতে হবে মূল গেট দিয়ে। একটি ভেতরে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত বেহেশতি ফেরেশতাদের প্রধান নির্বাহীর কাছে আমলনামা দাখিল করে ছাড়পত্র পেলেই ভেতরে ঢোকা সম্ভব হবে। লাইন ধরে একে একে ভেতরে ঢোকা শুরু করে। লাইনে টান পড়তে থাকে, মইনও এগোতে থাকে। একটি নতুন মাত্রায় প্রবেশিত হওয়ার উত্তেজনা বিহবল করে রাখে তাকে। একসময় চলে আসে তার পালা। প্রধান নির্বাহী অসম্ভব সুদর্শনা এক নারী। চমৎকার হাসি দিয়ে সবার আমলনামা জমা রেখে ছাড়পত্র ধরিয়ে দিচ্ছেন। মইন কাছে আসা মাত্রই তার মুখের হাসি মুছে যায়। একজন সহকারীর কাছে দ্বায়িত্ব হস্তান্তর করে মইনকে নিয়ে একপাশে সরে আসেন। আমলনামাটি পড়েন খুটিয়ে খুটিয়ে। দুঃশ্চিন্তায় তার কপালে ভাজ ফুটে ওঠে। এ ধরণের কোন ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার নুন্যতম প্রস্তুতি ছিলনা মইনের। ঘটনা বুঝতে না পেরে পুরোপুরি বিদিক হয়ে যায় সে।
আপনার এই ছায়াটিই ঝামেলা তৈরি করেছে, বলেন সুদর্শনা এবং আঙ্গুল দিয়ে মইনকে তার ছায়াটি দেখান। ' ডান হাতে আমলনামা লাভকারী প্রত্যেক বেহেশতবাসী ছায়ামুক্ত হয়ে যায়। অন্যদের দিকে তাকিয়ে দেখুন।' আবার শোনা যায় তার মিষ্টি কন্ঠস্বর। অন্য সবার দিকে তাকিয়ে মইনের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষ কিন্তু কারোরই কোন ছায়া নেই।
প্রধান নির্বাহী এবং আরো কয়েকজন অফিসিয়াল পরামর্শ করতে বসেন। ওয়েটিং রুম মতো একটি জায়গায় কাঠের বেঞ্চিতে বসিয়ে রাখা হয় মইনকে। দেখতে পায় বেহেশতে প্রবেশ সংক্রান্ত নীতিমালার একটি বিরাট বই উল্টেপাল্টে দেখছেন তারা। পাল্টাপাল্টির এক পর্যায়ে একটি জায়গায় তাদের চোখ থির হয়। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে মইনও পরিস্কার পড়তে পারে।
'আত্মহত্যাকারীগণকে সনাক্ত করা যাইবে তাহাদের ছায়া দেখিয়া। তাহারা কখনোই ছায়ামুক্ত হইতে পারিবেনা। অবশ্যই ছায়া সহযোগে কেহ বেহেশতে প্রবেশ করিবে না।'
মইন বুঝতে পারে তাকে আত্মহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু এ জাতীয় কোন ঘটনা সে ঘটিয়েছে বলে মনে করতে পারে না। প্রধান নির্বাহী যখন ফিরে এসে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা শুরু করেন তখন সে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে এবং কাকতালীয় ভাবে প্রতিবাদের রসদও যুগিয়ে ফেলে। তারা যেখানে দাড়িয়ে ছিল সেখান থেকে ভেতরের অনেক কিছুই পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কিছুদুর সামনে একটি শান বাঁধানো পুকুরের ঘাটে গল্পকার কায়েস আহমেদ কে বসে থাকতে দেখে। মইনের পরিস্কার কায়েস আহমেদ আত্মহত্যা করেছিলেন।
উনি আত্মহত্যাকারী, উনি যদি ভেতরে ঢুকতে পারে সেেেত্র আমিও অবশ্যই ভিতরে ঢুকতে পারবো'। প্রতিবাদের সুরে বলে ওঠে মইন। ' কে বলেছে আপনাকে যে তিনি আত্মহত্যাকারী? আত্মহত্যা যাতে না করতে হয় সেজন্য বেঁচে থাকতেই শরীরটাকে মেরে ফেলেছিলেন তিনি। তাকে বরং আত্মরক্ষাকারী বলা যায়। তিনি ছায়ামুক্ত হয়েই এখানে এসছিলেন।' একটানা বলে শেষ করেন।
সে রাতটা ওয়েটিং রুমের বেঞ্চিতে বসে মশার কামড় খেয়েই কাটাতে হয় মইনকে।
চার.
যেহেতু গ্রামের প্রায় প্রতিটি লোকের কাছে বিশ্বস্ত মান্দারের বাপ এবং যুবকেরা পছন্দ করে তার সংগ; সংগঠন তৈরি করতে এ লোকটি কার্যকর হওয়ার কথা। মান্দারের বাপকে কেন্দ্র করে পার্টির একটি গ্রুপ গঠনের পরিকল্পনা করে মইন। খুব দ্রুত মান্দারের বাপের সাথে খাতির তৈরি করে তার কুড়েটিতে ঘন ঘন যাতায়াত ঘটতে থাকে। দুর্মুখেরা অবশ্য হোমায়রার মসৃন তক, আলুথালূ বেশবাস আর কালীর মতো সুগঠিত শরীরের কোন ভূমিকা আবিস্কার করতে পারে তবে বুকে হাত দিয়ে ঈমানসে বলতে পারে মইন, এ ঘটনা নিয়ামক ছিল না ঘন ঘন যাতায়তের পেছনে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ঐ সৌন্দর্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল তাকে। তার দোষটা কোথায়? কাকতালীয় ঘটনাবলীর ফের সে ঠেকাবেই বা ক্যামনে? অত সস্তা শাড়ি লাগাতার কয়েক বছর পরলে তাতো মসলিনের মতোই হবে।আর এটাতো নির্ঘাত অঘটন যে গোসল করে আসার সময়ই তার সামনে পড়লো। দ্বিতীয় দফাতেই চোখ বন্ধ করলো সে। করতে হতোই। নচেৎ ওই আগুনেই তার চোখ দুটি ভস্ম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
' কেন যে বাপু ভন্ডামী কর? তুমি পূর্নিমার চাঁদ দেখে মুগ্ধ হবে, সবুজ ধানক্ষেত তোমাকে বিমোহিত করবে আর ফিনফিনে শাড়ির তলায় মাইকেল এ্যাঞ্জেলোর ভাস্কর্য দেখে থমকাবে না তাতো হয় না।
আচমকা কেঁপে ওঠে মইন। ওগুলো কি গায়েবী আওয়াজ ছিল? তাই হওয়ার কথা। যিশু, মুসা, মুহম্মদ বা মুনসুর হাল্লাজেরা যদি গায়েবী আওয়াজ আদৌ লাভ করে থাকে তাহলে ওই শব্দগুলোও গায়েবী ছিল।
সকাল বেলাটা সাধারণত সমান্নানার দোকানে বসেই আলাপ-সালাপ হতো মইন এবং মান্দারের বাপের। অনেক বেলা পর্যন্ত মান্দারের বাপ না এলে একটু দূঃশ্চিন্তাই বোধ করে সে। তখনই দূঃসংবাদটি শোনে।গ্রামের লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রাতে মাছ ধরার সময় মান্দারের বাপ পানিতে মুতেছে। পানিতে বাস করে হযরত খিজির (আঃ)। তার অভিশাপে মান্দারের বাপের মুত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সে বাড়িতে শুয়ে ককাচ্ছে। ঘটনা বুঝতে মইন দ্রুত তাদের বাড়ির দিকে যায়। গিয়ে দেখে ঘটনা সত্যি। গতরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত মান্দারের বাপ ওই কর্মটি সারতে পারেনি।তাকে দেখেই বুড়ো হাউ-মাউ করে ওঠে। সে জানায় অনেক দিন ধরেই পেশাব করতে একটু সমস্যা হচ্ছিল, কিন্তু আজকের মতো এত অসুবিধায় পড়তে হয়নি। যন্ত্রনায় মোচড়াতে থাকে বুড়ো মানুষটা। মান্দার বাড়িতে নেই। সারা গ্রামে ঢোল পিটিয়ে বেড়াচ্ছে যে, খিজিরের গায়ে মুতে তার বাপের আর রক্ষা নেই, তার সময় শেষ হয়ে গেছে। হোমায়রা বাপের হাত ধরে বিচলিত হয়ে বসে আছে। তার শিশুকন্যা ভয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। মইন বুক টানটান করে দাড়ায়। ভরসার ভঙ্গিতে তাকায় হোমায়রার দিকে। বলে, ' কোন চিন্তা করবেন না। এটা এক ধরণের অসুখ। এর চিকিৎসা আছে। আমি দেখছি কি করা যায়।
একটি ভ্যান যোগাড় করে মান্দারের বাপকে থানা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে পেশাবের চাপে মান্দারের বাপের পেট ফুলে উঠেছে বেলুনের মতো। চেচামেচি শুরুর দিকের নিরিহ আকার ছেড়ে প্রকট হয়েছে। একটি রাবারের নল মান্দারের বাপের পুরুষাঙ্গ দিয়ে প্রবেশ করিয়ে মূত্রথলি পর্যন্ত পৌছানো হয়। কয়েক মুহুর্তের অপেক্ষা শেষে ঝলক দিয়ে রাবারের ক্যাথেডার মাথা দিয়ে নির্গত হতে থাকে প্রায় 24 ঘন্টা ধরে জমে থাকা পেশাব। খিচ মেরে থাকা শরীর স্বাভাবিক হতে থাকে। মইনের হাত ধরে বুড়ো। তার সমুদয় কৃতজ্ঞতা তখন চোখ দিয়ে গড়াচ্ছে, জল হয়ে।
ওখানকার ডাক্তাররা মইনকে ডেকে নিয়ে জানান, এটি প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা। প্রস্টেট গ্রন্থির মাংশ বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পেশাব বের হচ্ছে না। আপাতত ক্যাথেডার লাগিয়ে কাজ চালানো হল কিন্তু এ সমাধান খুবই সাময়িক। সমাধান হচ্ছে অপারেশন করা। ডাক্তার 60 হাজার টাকা যোগাড় করে মান্দারের বাপকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেন। রাবারের ক্যাথেডার, নতুন কেনা একটি প্লাস্টিকের বালতিসহ মান্দারের বাপকে নিয়ে বাড়ি ফেরত আসা হয়।
মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা করতে বসে মইন খেয়াল করে আশু সমাধান করতে হবে এরকম তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তার সামনে-
1. অনেক দিন ধরেই এ গ্রামে পড়ে আছে। তার দ্রুত ঢাকায় চলে যাওয়া উচিৎ। সামগ্রিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড, টুকটাক ব্যবসা-বানিজ্য যা আছে, তার যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
2. মান্দারের বাপের সুস্থ্যতার জন্য করণীয় প্রসঙ্গে। সেক্ষেত্রে টাকা সংগ্রহের জন্য ওই দুই বিঘা জমি বিক্রি করতে হবে। মান্দার অবশ্যই বাধা দেবে। তাছাড়া বহুত সময়ও নষ্ট হবে এবং অন্যান্য এত জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হবে যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া চরম বোকামী হবে।
3. হোমায়রার প্রতি সৃষ্ট ভালোবাসাকে কতখানি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে? তার কন্যাটির প্রতিও অনেক মায়া অনুভুত হচ্ছে।
ভাবনা চিন্তার পরিসমাপ্তিতে সিদ্ধান্ত আসে যে সে ওই পরিবারকে না জানিয়েই ঢাকা চলে যাবে এবং যত দ্রুত সম্ভব দিন গুলো ভুলে যাবে। ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হয়। শেষবারের মত দেখে আসতে যায় বুড়ো ও হোমায়রাকে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই চিৎকার শোনা যায়। আবারো বুড়োর পেশাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ওখান থেকেই ঘুরে উল্টো দিকে রওনা হয় মইন। আবারো এই ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়লে তার ফিরে যাওয়াটাই অনিশ্চিত হবে। মান্দারের বাপের চিৎকারের জোর কি আরেকটু বাড়লো? কানে আঙ্গুল দিয়ে দ্রুত পা চালায় মইন। শালার ব্যাটা বুড়ো চেচাতেও পারে! চেচানিটা একদম মাথার মধ্যে ঢুকে যায়। অনেক দুর এসেও তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। বুড়োর করুণ মুখ আর ফুলে ওঠা পেট চোখের সামনে ভাসে এবং ভাসতেই থাকে। সে একটু উদ্যোগ নিলেই কি বুড়ো ভাল হয়ে যেত? মাছ ধরতে যেত আগের মত? শিশুকন্যার হাত ধরা হোমায়রার ম্লান মুখটাও ভাসে এইবার। তার বয়সী এই মেয়েটির কি একটা সুন্দর জীবন পাওনা ছিলো না? দ্রুত এসব ক্ষতিকর চিন্তা থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। একবার বাসে উঠতে পারলেই ঝামেলা শেষ। শেষ পথটুকুতে মইনের মনে হয় তার পায়ে শেকল পরানো হয়েছে। মরিয়া হয়ে তখন তাকে অন্য একটি প্রচেষ্টা নিতে হয়। বাস পর্যন্ত পৌছাতে যে-কোন ধরণের উত্তেজনা আমদানী করা জরুরি হয়ে পড়ে। বিষে বিষক্ষয় পদ্ধতি। এতক্ষণ ধরে চোখের সামনে পাক খেতে থাকা করুণ মুখ হোমায়রা; এই দৃশ্যপটটি বদলে দিয়ে ভেজা গায়ের হোমায়রার শরীরটি আনে। আর তারপর, চোখের পাপড়ি দিয়ে সহজেই খুলে ফেলে শতচ্ছিন্ন, জীর্ণ শাড়িটি। আর তাকে ভাবতে হয় না। বাকী পথটুকু ডুবে থাকে সে কোমল, মসৃন একটি শরীরের মধ্যে যেমন করে ছেলেবেলায় ঝাপিয়ে পড়তো চরের নিটোল পলি কাদায়। এক সময় হাতের নীচে বাসের শীতল রডের স্পর্শ অনুভব করে।
পাঁচ.
যেহেতু বেহেশত আর দোযখের মাঝামাঝি কোন জায়গা নেই, আযাবের ফেরেশতারা চলে আসে মইনকে নিতে। তারা যখন ধরে টানতে থাকে অমানবিক ভাবে, প্রধান নির্বাহী তখন হতাশ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকান। আটাশ বছর ধরে জমা হওয়া 66 কেজি রক্ত, মাংস, মগজ, চামড়া আর হাড়গুলোকে গ্রহণ করার জন্য দোযখের আগুন তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




