আমি স্বাধীন বাংলাদেশের একজন সাধারন নাগরিক
এবং ২টি কন্যা সন্তানের জনক হিসেবে আজ কিছু বলতে চাই।

টেকনাফ এ ইয়াবা ব্যাবসার অভিযোগে
আইন-শৃংখলা বাহিনীর সাথে কথিত এনকাউন্টারে নিহত কাউন্সিলর একরাম এর শেষ সময়ের ফোনের কথপোকথন এবং মৃত্যুর মুহুর্তে গুলির আওয়াজ, তার শেষ আর্তনাদ আজ আমাকে ভীষন এলোমেলো করে দিয়েছে। মৃত্যুর কিছু আগে কন্যা এবং স্ত্রী ব্যাকুল হয়ে ফোনে একরামের খোজ নেয়া, বার বার অনুনয় করে বলা কিছু কথা, হঠাত গুলির শব্দ, ওপাশে মরন আর্তনাদ এর শব্দ, তারপর আবার গুলির আওয়াজ, এপাশ থেকে স্ত্রী, কন্যাদের বাধভাংগা চিৎকার, কান্না, আহাজারী সবকিছু আজকে এদেশের অজস্র মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ক্যাথারসিস নামক এক পৌরানিক রোগে আক্রান্ত আজ সমগ্র দেশ। যে রোগে একদিকে ভিক্টিমের জন্য কষ্ট, অপরদিকে নিজের আসন্ন/সম্ভাব্য একই পরিনতির জন্য মন জুড়ে থাকে আতংক!
আমার এক ফেসবুক ছোটভাই লিখেছে, ‘অডিও ক্লিপ টা শোনার পর থেকে মাথা তুলতে পারছি না’।
সেদিন ডেইলী স্টার এ দেয়া লিঙ্ক থেকে অডিও ক্লিপ টা শুনে আমিও চুপ করে সারাদিন কি এক স্থবিরতায় বসে ছিলাম। বার বার কানে ভেসে আসছে সেই গুলির আওয়াজ, মস্তিষ্কে বেজে চলেছে একরাম এর স্ত্রীর বুকফাটা আর্তনাদ, কন্যাদের আহাজারী।
আমার আদরের ২কন্যর দিকে তাকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে
কেঁদেছি, স্ত্রীর পাশে বিছানায় চুপ করে বসে থেকেছি।
বাবা মায়ের ঘরে গিয়ে মায়ের পাশে চুপ করে বসে
থেকেছি অনেকক্ষন। কিছু বলতে পারি নাই।
বাবার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে থেকেছি। মুখে কোন কথা আসে না। বুকের বা দিকটায় চিন চিন করে ওঠে কি এক করুন ব্যাথা।
আজ আমার স্ত্রী বড় মেয়েটাকে নিয়ে ঈদের কিছু কেনাকাটা
করতে গেলো - আমি যাই নাই, কিন্তু কোন সময় এমনটা হয়নি, সবসময় আমি সাথে যাই ঈদের কেনাকাটা করতে।
মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী, আমার চিৎকার করে কাঁদতে
ইচ্ছে করছে আর বলতে ইচ্ছে করছে:
একরাম, ভাই আমার!
তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দিয়েছে।
একরাম বা এরকম এনকাউন্টারে নিহত অসংখ্য মানুষ এর কথা ভাবি। পুলিশি অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরন এদেশে নতুন কিছু নয়। অনাদিকাল হতেই অপরাধ দমন করতে যেয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে এমন অনেকের প্রান গেছে। বিশেষ ধরনের অপরাধ নির্মুল করতে গিয়ে, সমূলে উৎপাটন করতে গিয়ে অতীষ্ঠ হয়ে, সর্বোপরি বিচার ব্যাবস্থার দীর্ঘসুত্রিতার কথা ভেবে, ফাক-ফোকর এর কথা ভেবে এমন কাজ অজস্রবার করা হয়েছে। কিন্তু আপনারা যারা দেশ চালান এবং ভবিষ্যতে চালাবেন, তারা দয়া করে আরেকবার একটু ভেবে দেখবেন কি? একরাম এর মৃত্যু, তার শেষ মুহুর্তে ফোনে কথপোকথন একবার দয়া করে শুনবেন কি? একবার কি ভেবে দেখবেন, মানুষের সবচেয়ে মুল্যবান যে সম্পদ, প্রান, যার চেয়ে দামী আর কিছুই নেই, সেই প্রান কেড়ে নেওয়ার এই বিষয় টা নিয়ে আরেকবার দয়া করে একটু ভাববেন? আসলেই কি এই সমস্ত বড় বড় অপরাধ দমন করার জন্যে আদৌ এটা কোন স্থায়ী এবং টেকসই সমাধান? বিচার ব্যাবস্থায় দুর্বলতা আছে, হাজার বার মানি। কিন্তু সেটার দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী সমাধান না করে, অন্য পথে কি কোন সমাধান আসবে? মাদক এদেশের এক ভয়ংকরতম খারাপ সমস্যা। এর পরে আছে দুর্নীতি, আছে জংগীবাদ, সন্ত্রাস, ধর্ষন আরো কত অপরাধ। এইসব কাজের অপরাধীকে প্রচলিত বিচার ব্যাবস্থায় দ্রুত শাস্তি দেয়া এবং এইসব অপরাধকে নির্মুল করা সম্ভব নয়, সেটাও মানি। কিন্তু তার বিকল্প কি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া? বিশেষ করে একাধিক স্তরের বিচার ব্যাবস্থায় যেখানে মৃত্যুদন্ডের মত সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়, নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট, এপিলেট বিভাগ, রিভিউ, সর্বশেষে মহামান্য রাস্ট্রপতির অনুমোদনে যে শাস্তি কার্যকর হয়, সেটা এভাবে নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত কোন বাহিনীর সদস্যেদের হাতে কি তুলে দেয়া যায়? প্রয়োজনে বিচার বিভাগ ঢেলে সাজান! উপজেলায়, জেলায় একাধিক বিশেষ আদালত বসান, ২০ জনের জায়াগায় ১০০ জন বিচারক নিয়োগ করুন, উর্ধতন আদালতে আলাদা একাধিক বেঞ্চ তৈরি করুন। কিন্তু তারপরেও নিয়ম মেনে এগুবেন না? কোন অবস্থায় কি পারেন এভাবে বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে কারো প্রান কেড়ে নিতে? যাদের প্রান গেছে তাদের অনেকেই হয়তো মারাত্মক রকমের অপরাধী। কিন্তু এদের মধ্যে এক জনও যদি থাকে নিরপরাধ, সেই মহাপাপ এর বোঝা কি কেউ বইতে পারবে? এমনকি যারা সত্যিকারের অপরাধী, তাদের এমন মৃত্যুও তো সমগ্র জাতিকে অপরাধী করে তোলে!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রিয় মা জননী, দয়া করে এমন অপরাধ আর হতে দেবেন না! প্রয়োজনে হাত ভাঙ্গুক, পা ভাংগুক, দরকার হলে পা এর নিচে গুলি করুক, তবুও বিচার বহির্ভুত ভাবে কারো প্রান যেন আর না নেয়া হয়! যে জিনিস সমগ্র পৃথিবীর বিনিময়েও আর ফিরিয়ে দেয়া যাবে না, সেটা কোন ভাবেই বিচার বহির্ভুতভাবে যেন আর নেয়া হয়!
আপনিই পারেন, স্বাধীনতার সুবর্ন জয়ন্তীর পুর্বে, আপনার দ্বিতীয় মেয়াদ সমাপনের এই পুর্বাহ্নে, পথভ্রস্ট এই জাতিকে আজীবনের জন্য এই হিংস্র প্রলাপ থেকে উদ্ধার করতে। তবেই, কেবল তখনই এই অপরাধী জাতির হয়ে একরামের সেই সর্বশান্ত স্ত্রী, কন্যাদের দ্বারে গিয়ে আমরা দাড়াতে পারবো। তাদের সেই ভাংগা ঘরে একে দিয়ে আসতে পারবো সভ্যতার নতুন চিহ্ন।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠক
UEHRF.ORG

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

