somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কপটস: বিপদজনক ভাবে বেঁচে থাকা মিশরীয় এক শিকড়সংলগ্ন জাতিগোষ্ঠী

০৫ ই নভেম্বর, ২০১২ দুপুর ১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
কপটিক ক্রশ। মিশরের সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী জনগন কপটস (Copts) নামে পরিচিত। এদের ভাষাটিও কপটস বা ‘কপটিক’ নামে পরিচিত। কপটসদের বিশ্বাস অনুযায়ী এদের শিকড়টি প্রোথিত প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় । কপটসরা ধর্মে খ্রিস্টান হলেও তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণে ইহুদি সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে। মিশরের জনগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েও আজও কপটিকরা নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। চিহ্নিত জঙ্গীগোষ্ঠীর আক্রমনের পর্যুদস্ত কপটসরা মিশরের এমন এক শিকড়সংলগ্ন জাতিগোষ্ঠী- যাদের ভাষার বর্ণমালার মূলে রয়েছে গ্রিক ভাষার অক্ষর, যদিও কপটিক ভাষাটি প্রাচীন মিশরীয় ভাষার সর্বশেষ স্তর ....



মিশরের মানচিত্র।

খ্রিস্টপূর্ব সময়ে গ্রিকরা মিশরকে বলত Aigyptioi. যা ইংরেজিতে Egyptos অথবা Egypt. এই শব্দের উৎস প্রাচীন মিশরের শব্দ: ‘হুট-কা-তাহ’ । প্রাচীন মিশরের রাজধানী ছিল মেমফিস। ‘হুট-কা-তাহ’ শব্দ দিয়ে এই মেমফিসকেই বোঝাতো । আরবরা মিশর জয় করে ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে। মিশরীয়দের তারা বলত Gypt; এই শব্দের উৎস হল গ্রিকদের Egypt শব্দটি. এই ইজিপ্ট শব্দটিরই আর একটি আরবি প্রতিশব্দ হল qubt । এই qubt শব্দটির অর্থ-‘মিশরীয়’। Copt শব্দটির উদ্ভব এই আরবি qubt শব্দ থেকেই। আগেই উল্লেখ করেছি কপটস বলতে মিশরীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের বোঝায়।



মিশরের মানচিত্রে আলেকজান্দ্রিয়ার অবস্থান ।

আগেই বলেছি কপটিকরা ধর্মে খ্রিস্টান। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে প্রথম খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করা হয়েছিল। এই কারণে মিশরের কপটিকদের ইতিহাস আলেকজান্দ্রিয়া শহরটির সঙ্গে সর্ম্পকিত। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই ইহুদিরা বসবাস করত। এদেরই কেউ কেউ প্রথম খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেছিল। সময়টা খ্রিষ্টীয় প্রথম শতক। মিশরে রোমান শাসন চলছিল। রোমের স¤্রাট নিরো। সেন্ট মার্ক আলেকজান্দ্রিয়ায় এসে ‘চার্চ অভ আলেকজান্দ্রিয়া’ প্রতিষ্ঠা করলেন। এর ফলে মিশরের জগনের একটি অংশ নবপ্রচারিত ধর্মমতটি গ্রহন করে, ২০০০ বছর পরে যে জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল ...



সেন্ট মার্ক। মিশরে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের অর্ধ শত বছরের মধ্যেই ধর্মটি মিশরে ছড়িয়ে পড়েছিল।


গ্রিকরা খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মিশর জয় করেছিল। মিশরের নিজস্ব ভাষাটির বিকাশ হচ্ছিল। সে সময়ই গ্রিক বর্ণমালার সমন্বয়ে মিশরে নতুন এক ভাষার প্রচলন হয়। যে ভাষার নাম হয় ‘কপটিক’ ভাষা। যে ভাষাটি পরবর্তীকালে মিশরীয় কপটিকদের ধর্মীয় ভাষা হয়ে ওঠে এবং এই জন্য ২০০০ বছর পরে তাদের কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল ...মিশরে খ্রিস্টানধর্ম প্রচারিত হওয়ার ফলে মিশরে কপটিক ভাষার উদ্ভব হওয়ার ফলে কপটিক ভাষায় খ্রিস্টান ধর্মচর্চা হওয়াই স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে একজন লেখক লিখেছেন: In the 2nd century, Christianity began to spread to the rural areas, and scriptures were translated into the local language, namely Coptic. ওই সময়ের মিশরে কপটিক ভাষায় সেন্ট জন -এর লেখা বাইবেলের কিছু অংশ আবিস্কৃত হয়েছে।



কপটিক বর্ণমালা; যা আসলে গ্রিক অক্ষরেরই এক প্রকরণ। তবে অতিরিক্ত কিছু অক্ষর রয়েছে, যা গ্রিক বর্ণমালায় নেই।


ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে কপটিক ভাষাটি আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের মিশরীয় শাখা। যার শিকড় প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় প্রোথিত। খ্রিস্টীয় তেরো শতক অবধি কপটি ভাষাটি ছিল মিশরের রাষ্ট্রীয় ভাষা । তারপর মিশরের রাষ্ট্রভাষা হয় আরবি ভাষা।



কপটিক ভাষায় লিখিত একটি অনুচ্ছেদ । ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে ‘কপটিক’ শব্দটি দিয়ে লিপি বোঝায়। তার মানে গত ২০০০ বছর ধরে মিশরীয় লিপির যে বিবর্তন ঘটেছে সেটিই হল ‘কপটিক’।


গত ২০০০ বছর ধরে মিশরে কপটিক ভাষা এবং এই ভাষায় কথা বলা মানুষের সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে। এটিই স্বাভাবিক। কপটিকরা যেহেতু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, সে কারণেই গত ২০০০ বছর ধরে মিশরে ‘কপটিক’ খ্রিস্ট ধর্মটিরও বিকাশ হয়েছে। বর্তমানে অবশ্য কপটিকরা আরবি ভাষায় কথা বললেও এদের ধর্মীয় জীবনের ভাষা কপটিক।



মিশরের কপটিক জনগন।


মিশরে কপটিক গির্জা ‘কপটিক অর্থডক্স চার্চ’ নামে পরিচিত। কপটিক গির্জার নিজস্ব গির্জাপিতা বা পোপ রয়েছে। পোপ বাস করেন কায়রো শহরে। পোপকে ধর্মজীবনের বিধিবিধান অত্যন্ত কঠোর ভাবে মেনে চলতে হয় । পোপকে বছরে ২০০ দিনই উপবাসে কাটাতে হয়। এ সময় যে কোনও ধরণের পশুজাত খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ। যেমন দুধ, ডিম, মাংস, এবং চিজ তিনি পরিহার করেন। কপটিকদের ধর্মীয় আচরণে ইহুদি ধ্যানধারণার প্রভাব রয়েছে । যেমন, জুতা খুলে প্রার্থনাগৃহে প্রবেশ করা বা লিঙ্গের ত্বকচ্ছেদ। এ কারণ সম্ভবত মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই ইহুদিরা বসবাস করত। এদের মধ্যে অনেকেই প্রথম খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেছিল। মিশরের কপটিকরা অর্থডক্স, ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ে বিভক্ত। তবে ক্যাথলিকদের সংখ্যাই বেশি।



মিশরে একটি কপটিক গির্জা।

কপটিকরা কেবল মিশরে নয়, উত্তর আফ্রিকার অন্যত্রও রয়েছে। এরা শিকড় আঁকড়ে ধরে রেখেছে বলে চিহ্নিত জঙ্গীগোষ্ঠীর আক্রোশের শিকার ...



ইথিওপিয়ার কপটিক মা ও শিশু।

মিশরে কপটিকদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি। আরও দশ লক্ষ কপটিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, ব্রাজিল এবং এশিয়া ও আফ্রিকার নানা দেশে ছড়িয়ে আছে। মিশরে নানা প্রদেশে কপটিকরা বাস করলেও কোনও প্রদেশেই এরা সংখ্যা গরিষ্ঠ নয়।



ইউরোপে একটি কপটিক গির্জা।

এই পোস্টে শুরুতে বলেছি কপটিকরা মিশরের জনগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েও আজও কপটিকরা নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। এবং এই স্বকীয়তার জন্যই এরা উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর রোষের শিকার। চিহ্নিত কিছু জঙ্গীগোষ্ঠী ১৯৯০ সাল থেকে এদের ওপর নির্মম হত্যা নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। কপটিকদের ওপর অমানবিক আক্রমনের বিরুদ্ধে তাদের মুসলিম প্রতিবেশিরা তীব্র প্রতিবাদ করেছে যদিও তবে এতে লাভ হয়নি। একটি সূত্র এ বিষয়ে লিখেছে:

This violence horrified Muslim neighbors who were quick to condemn the attacks, but these condemnations did little to stem the attacks - it certainly did not move the government to actually treat the Copts like real citizens worthy of protection. (দেখুন: Click This Link)



বিপদজনক ভাবে বেঁচে থাকা মিশরীয় শিকড়সংলগ্ন কপটস জাতিগোষ্ঠীর এক বিয়ের অনুষ্ঠান ...



মিশরের কপটিকরা জনসংখ্যার ১০% হয়েও এরা চিহ্নিত জঙ্গীগোষ্ঠার আক্রোশের শিকার। এ প্রসঙ্গে একজন লেখক পিটার বার্জার লিখেছেন ...

Muslims (including leading imams) not only loudly condemning the attacks, but forming protective patrols around Coptic churches. And Muslims and Christians joined together in interfaith celebrations on Tahrir Square. But there have been attacks on Copts since then.



ইতিহাস কথা কয়?

ছবি: ইন্টারনেট।

তথ্যসূত্র:

Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
http://en.wikipedia.org/wiki/Coptic_history
http://st-takla.org/Coptic-church-1.html
Click This Link
http://www.omniglot.com/writing/coptic.htm
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০১২ বিকাল ৩:০২
২১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিলেকোঠার প্রেম- ১৩

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৫


দিন দিন শুভ্র যেন পরম নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা শেষ। পড়ালেখাও নেই, চাকুরীও নেই আর চাকুরীর জন্য তাড়াও নেই তার মাঝে। যদি বলি শুভ্র কি করবে এবার? সে বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগ্ন দেহের অপূর্ব সৌন্দর্যতা বুঝেন না! বলাৎকার বুঝেন?

লিখেছেন মুজিব রহমান, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:৩৫


শৈল্পিক প্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নগ্নতাকে৷ ইউরোপে অন্ধকার যুগ কাটিয়ে রেনেসাঁ নিয়ে এসেছিল আধুনিক ও সভ্য ইউরোপ৷ রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরা দেদারছেই এঁকেছেন শৈল্পিক নগ্ন ছবি৷... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নবীকে ব্যঙ্গ করার সঠিক শাস্তি সে ফরাসি শিক্ষক কি পেয়েছে?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৫৩



গত কয়েকদিন আগে ফ্রান্সে কি হয়েছিল? একজন শিক্ষক ক্লাসে আমাদের নবীর ব্যঙ্গচিত্র দেখিয়েছিলেন, বলা হয়েছিল তার উদ্দেশ্যে ছিল বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে বুঝানো। এটার পর এক মুসলিম যুবক তার ধর্মীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবি ও পাঠক

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:৩১

কবিদের কাজ কবিরা করেন
কবিতা লেখেন তাই
ভেতরে হয়ত মানিক রতন
কিবা ধুলোবালিছাই

জহু্রি চেনেন জহর, তেমনি
সোনার পাঠক হলে
ধুলোবালিছাই ছড়ানো পথেও
মাটি ফুঁড়ে সোনা ফলে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

***

স্বরচিত কবিতাটির ছন্দ-বিশ্লেষণ

শুরুতেই সংক্ষেপে ছন্দের প্রকারভেদ জেনে নিই। ছন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় খাবার সমূহ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৩:৩৪



আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যেসব খাবার গ্রহণ করেছেন, তা ছিল সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। নবীজি (সা.) মোরগ, লাউ, জলপাই, সামুদ্রিক মাছ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×