একটা সময় ছিল আমার জীবনে যখন ঈদ মানে ছিল “এলো খুশির ঈদ”
অন্য সবার মত আমিও ঈদ পালন করতাম মহা সমারোহে। নতুন জামা, জুতা এমনকি মাঝে মাঝে নতুন কলম। আগের দিন রাতে ঘরের সবার সাথে ঘর ঝাট দিতাম, গোছাতাম, দোকানে গিয়ে এটাসেটা কিনতাম আমার মায়ের লিস্ট মোতাবেক। সকালে উঠে বাথরুমে লাইন ধরতাম (আমাদের বাথরুম ছিল একটা), যখন দু’বাথরুমের ঘরে আসলাম তখনো লাইন ধরতে হত আমাকে, ছোট ছিলামতো সবার (এখনো তাই-ই আছি)। পাশের মসজিদের মাইকে শোনা যেত ঈদ মুবারাক, ঈদ মুবারাক, ঈদ মুবারাক। চারদিকে কেমন একটা পবিত্র আভা। আশেপাশের অমুসলিম প্রতিবেশীরাও অপেক্ষায় থাকতো কখন আমাদের নামাজ শেষ হবে, নামাজ শেষ হলে তাঁরা আমাদের বাসায় আসবেন, আমাদেরকে নিয়ে যাবেন তাঁদের বাসায় ঈদের সেমাই খাওয়াতে। আগের বছরের পাঞ্জাবিটা পরে নামাজ পড়তে যেতাম, আর নামাজ পড়ে এসে নতুনটা পরতাম। প্রতিবার ঈদের নামাজ পড়ার সময় ভুল করতাম, আশেপাশে কোনা মেরে দেখতাম কখন নিয়ত বাঁধছে, কখন হাত ছাড়ছে, কখন রুকুতে যাচ্ছে। হা হা হা! এসে মা-কে সালাম আর উনার বানানো খাবার খেতাম। আমরা ভাইরা কোন ঈদে কোলাকুলি করতামনা, কখনো করিনি। হাসিঠাট্টা করতাম নিয়মিত কিন্তু কোন ঈদে কোলাকুলি করা হয়নি। কোথায় যেন একটা অস্বস্তি লাগতো। এরপর বাকি সবার ঈদ যেমন কাটতো আমাদেরও তেমনি। মেহমান সামলাও, এদিক সেদিক যাও। আমার বাবা বেঁচে থাকা অবস্থায় ঈদ অবশ্য অন্যরকম ছিলো, সে গল্প নাহয় অন্যদিন করবো। যখন থেকে প্রেমে পড়লাম তখন থেকে ঈদের ধরন পুরাই পালটে গেলো। বাসার সবার অগোচরে আর একটা মানুষকে নিয়ে ঈদের দিন সুখানুভূতি, তার জন্য বখশিস এর টাকা জমানো, আমার মায়ের জন্য জামা কেনার সময় তার টাকা দিয়ে কেনা, ঈদের দিন তাকে দেখতে না পারার চাপা কষ্ট, আবার হুট করে দেখা হয়ে গেলে আনন্দ, খুনসুটি, ঝগড়া এসব। সামনের কোন এক ঈদে একসাথে তাকে নিয়ে কাটানোর স্বপ্ন চোখে ঝিলিক খেলতো প্রতি ঈদেই। শুধু ভাবতাম বাসার মানুষগুলোর সাথে আরো একজন থাকবে আমার সাথে ঈদে! কেমন হবে তখন ঈদগুলো ঐ মানুষটা সহ!!! শুধু ভাবতাম আর ভাবতাম। এবং এখনো ভেবেই যাচ্ছি। কারণ- সে এখন আর আমার জীবনে নেই। তাকে ভালবাসার পর থেকে কখনো নিজের টাকা দিয়ে পাঞ্জাবি কিনিনি ঈদে বা বৈশাখে বা যে কোন উৎসবে। পাঞ্জাবি পাওয়ার পর আমি খুশি হতাম খুব আবার তার টাকা খরচ হল বলে তাকে বকাও দিতাম, ভালবাসার বকা। সে আমাকে বলতো আমি কিছুইতো দিতে পারছিনা, অন্যরা কতকিছু দেয় নিজের ভালোবাসার মানুষকে। আর বলতো যখন একসাথে ঘর করবো তখন আরো বেশী বেশী দিবো! ঘর- হায়রে ঘর! আমি তাকে ছাড়া কোন ঈদ বা কোরবান বা যেকোন উৎসব ভাবতে পারতামনা, পারিনি, পারছিনা, পারবোনা। গত বছর ঈদের দিনের কোন স্মৃতি নেই আমার। আবোল তাবোল বকে আর কান্না করে কাটিয়েছিলাম সারাদিন এটুক মনে আছে। আর একটা স্মৃতি আছে ওটা আমার একান্ত দুঃখের তাই বলছিনা। না ঈদে এখন আর কিছু কেনা হয়না, কারো জন্যই না। এখন সকাল হলেই শুনিনা ঈদ মুবারাক, ঈদ মুবারাক। ঈদ নিয়ে কোন আগ্রহ আমার নেই। এই ৩০-৩১ বছরের জীবনটা বড্ড বোঝা হয়ে গেছে। বিচ্ছেদের পর সবচে’ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় নাকি ছেলেরা। আমিতো পারছিনা। এতো এতো সময় কেটে গেলো, তাও পারছিনা। আমার সময় কাটানোর মতো কিছু নেই, তার স্মৃতি ছাড়া। ইচ্ছা করেই পরিবার থেকে দূরে আছি, বাংলাদেশের একটা জেলায় পড়ে আছি আমার প্রাণের শহর ছেড়ে, আমার মা-ভাই ছেড়ে। তাদের সাথে ঈদ করার ইচ্ছাও জাগেনা। একা একা শুয়ে আছি, কাল ঈদের দিন এভাবেই থাকবো হয়তো বা একটু হেঁটে আসবো। ভালোবাসা এমন এক শক্তি, হয় জয় ঘটায় নয়তো ক্ষয়। আমার ক্ষেত্রে ক্ষয়টাই ঘটলো। জীবনটা ক্ষয়ে যাচ্ছে দিন দিন, সবার অলক্ষ্যে, অগোচরে, আমার পরিবারের অজান্তে। জানিনা কি হবে, এই বয়সে এসেও নিজেকে সামলাতে, গোছাতে পারছিনা সে চলে যাওয়ার এতোদিন পরও। এ জীবনটা আর টানতে পারছিনা। ক্ষয়ে যাচ্ছি। একটাই শুধু আনন্দ যে তার জন্য নিজেকে ক্ষয় করতে পারছি। প্রতি মুহূর্তে তার স্মৃতি, কণ্ঠস্বর, কথা আমার হৃদয়, হাড়-মাংস, মগজ চিবিয়ে খাচ্ছে। খুব অগোছালো লিখছি, অনেকদিন পর লিখতে বসলাম তাই। সবার ঈদের দিনে নিজের কতগুলো ফালতু কথা বলে সবার সময় নষ্ট করার জন্য খারাপও লাগছে। কিন্তু কি করবো? পান-সিগারেট-মদ কিছুই খাইনা, কিছু একটাতো করতে হবে। তাই লিখতে বসলাম। সবাইকে ঈদ এর শুভেচ্ছা। বিরক্ত হলেও কেউ আমাকে গালি দিয়েননা প্লিস, গালি নেয়ার মত অবস্থা নাই। আর লিখতেও পারছিনা, চোখ ঘোলা হয়ে গেছে।
পুনশ্চঃ – আমার জীবনের সব উৎসব নিয়ে তুমি চলে গেছো তারপরও তোমাকে অনেক অনেক অনেক ভালবাসি। কীভাবে যে ভালোবাসি, কীভাবে!!!!!!!!!!!!!!!!!
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০১৫ ভোর ৫:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




