(আমার এই গল্পের সাথে যদি কারো জীবন বা জীবনের কিছু অংশ মিলে যায় তবে সেটা ব্যাখ্যা করার দ্বায় অবশ্যই আমার ।)
রেণু বেগমের দিনটা শুরু হয় মহা ব্যাস্ততার সাথে । তবে তার ব্যাস্ততার কারণ তার স্বামী বা তার ছেলে মেয়েরা কেউ নয় । তিনি তার সংসারে কারো ধার ধারেননা । প্রতি সকালে তার ধরা বাধা কিছু কাজ থাকে । কাজগুলো করে দেয় রহিমা বুয়া । এ পযর্ন্ত কোনদিন ই রহিমার কাজ তার পছন্দ হয়নি । আজো এর ব্যাতিক্রম ঘটেনি । রহিমাকে বলা হয়েছিলো গোলাপের টবের আগাছাগুলো তুলে ফেলার জন্যে । রহিমা আগাছা তুলেছে ঠিকই কিন্তু টবের মাটি সমান করে দেয়নি । এই নিয়েই এই সাত সকালে রেণু বেগম আর রহিমার মধ্যে তুমুল লেগে গেছে । রেনু বেগম যত জোরে চিৎকার করছেন রহিমা তার চেয়েও তিনগুন জোরে চিৎকার করছে । এ বাড়ির নিত্য নিয়ম অনুসারে এই চিতকারেই বাড়ির আর সকলের ঘুম ভাঙে ।
মজনু সাহেব অফিস যাবার জন্য ঘটনাটা ঠিক তখনি ঘটলো তার চশমার ফ্রেম থেকে একটা গ্লাস খুলে পড়ে গেলো । তিনি বড়ই অস্বস্তিতে পড়লেন । কারণ চশমা ছাড়া অফিসে যাওয়ার কোনো মানে হয়না । চশমা ছাড়া তিনি কোনো কাজ করতে পারেননা । আবার নতুন গ্লাস নিয়ে অফিস যেতে অনেক দেরী হয়ে যাবে । কোনো মতেই দেরী করা যাবেনা । মজনু সাহেবের অফিসে নতুন বস এসেছেন । দেখতে চেংড়া টাইপ তবে খুব রাগী । ইতিমধ্যে দুই জনকে বরখাস্তও করেছেন । নাস্তা করতে বসে মজনু সাহেব ঠিক করলেন আগে অফিসেই যাবেন । তারপর কি হবে দেখা যাবে ।
এ বাড়িতে মজনু সাহেবের কোনো ভূমিকা নেই । মাসের শুরুতে বেতনের সব টাকা তাকে তুলে দিতে হয় রেনু বেগমের হাতে । তার থেকে তিনি কিছু পকেট খরচ হিসেবে পান । এ বাড়ির কোনো কর্তা নেই । কর্তী আছে ।
রিমি এবার ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে । এ বাড়িতে সে সবার ছোট । তার বড় বোন রিফাত এবার অনার্স ফাইন্যাল দিবে । আর বড় ভাই রিমন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বাসায় বসে আছে । রিমির মেজাজ প্রতি সকালেই খারাপ থাকে । কেনো থাকে তার কোনো কারণ নেই । রাগটা সে ঝারে ভার্সিটিতে গিয়ে যে কারো ওপর । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আজ তার ভার্সিটি নেই । এখন তার মেজাজ খারাপ লাগছে ভির্সিটির ওপর । যে করেই হোক মেজাজ ভালো করতে হবে । টেলিফোনে নীতুকে ঝারলেও অবশ্য কাজ হয় । রিমি গেলো টেলিফোন করতে ।
ঘরে ঢুকেই রেণু দেখলো রিফাত পড়তে বসেছে । বেশ আয়োজন করে সুর করে পড়া । রেণুর বড় অসহ্য লাগে । সাত সকালে উঠে পড়তে বসবে স্কুল কলজের ছেলে মেয়েরা । ভার্সিটিতে পড়ার কোনো নিয়ম কানুন থাকবেনা । ইচ্ছে হলে পড়লাম না ইচ্ছে হলে নাই । অথচ তার এই মেয়ে এখনো স্কুল কলেজের ঐ নিয়ম ছেড়ে উঠতে পারেনি । অসহ্য!!
রিফাত,
হ্যা মা । কিছু বলবে ?
একটু বারান্দায় আয় তো ।
পারবোনা মা । পরশু হতে আমার পরীক্ষা । আমাকে বিরক্ত করোনা ।
তুই শুনবিনা ?
উহু । কাজ থাকলে অন্য কাউকে বলো ।
রেণু কিছু বললেননা । বের হয়ে যেতে যেতে ভাবলেন এ বাড়িতে কি তার কর্তিত্ব কমে যাচ্ছে??
রিমনরা কয়েক বন্ধু মিলে দার্জিলিং যাবার প্ল্যান করেছে । প্ল্যানটা বয়স আবশ্য প্রায় দেড় বছর । সকল প্রস্তুতি শেষ । সব ঠিক থাকলে আগামী বৃহস্পতিবার ওরা রওনা দিবে । প্রথমে ট্রেনে করে কলকাতা । তারপর সেখান থেকে দার্জিলিং । আজ শনিবার । হাতে মাত্র কয়েকটা দিন । রিফাত বের হতে যাচ্ছিলো । মেইন গেট খুলতেই দেখলো তার বয়সী কোট টাই পড়া এক সুদর্শন ছেলে তার সামনে । ছেলেটা বললো,
কিরে রিমন কেমন আছিস ?
ভালো । আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলামনা !!
ছেলেটা হাসলো । হাসিটা খুব পরিচিত লাগলো রিমনের ।
আরে আমি তারেক । চিনতে পারছিস ?
রিমন চিনতে পারছে । তারেক । মাঝারি উচ্চতার লম্বা টিঙটিঙে একটা ছেলে । রিমনের কলেজের ভালো বন্ধুদের মাঝে একজন । ভার্সিটিতে ওঠার পর ও আমেরিকায় চলে যায় । তারপর অনেকদিন আর কোনো খোজ নেই ওর । কিছুদিন আগে কলেজ রিইউনিয়নের দিন রিমন শোনে যে তারেক আমেরিকার কোনো এক ভার্সিটিতে লেকচারার পদে আছে । ব্যাস এই পর্যন্তই । সেই তারেক যে আজ তার বাসায় আসবে সেটা কে জানতো । তাছাড়া সেই তারেক আর এই তারেকের মধ্যে বিশাল পার্থক্য ।
কিরে বাসায় নিয়ে যাবিনা নাকি ?
চিন্তা কেটে গেলো রিমনের । সে অতি ব্যস্ত ভঙ্গিতে তারেককে বাসার ভেতরে নিয়ে গেলো ।
রিমির ঝগড়াটা শুরু না হতেই রেণু তাকে ডাকলেন । রিমি দিগুন মেজাজ করে উঠে গেলো । আজকের দিনটা মনে হয় বড়ই খারাপ তার জন্যে ।
তোর ভাইয়ার এক বন্ধু এসেছে । যা এই নাস্তাটা তোর ভাইয়ার ঘরে দিয়ে আয় ।
রহিমা কই মা ? তাকে দিয়ে পাঠাও ।
রহিমাকে বাজার পাঠিয়েছি আমি । তুই যা ।
রিমির মেজাজ তিনগুন খারাপ হলো । দানে দানে তিন দান । দানে দানে তিন মেজাজ । রিমির ইচ্ছে হলো ভাইয়ার বন্ধুর সাথে ভয়ঙ্কর কিছু করতে । সেটা কি তা সে জানেনা । সে নাস্তা নিয়ে এগিয়ে গেলো রিমনের রুমের দিকে । বলা যায়না আজ সে ভয়ঙ্কর কিছু করেও ফেলতে পারে ।
মজনু সাহেব আজ একটু দেরী করে ফেলেছেন । তিনি বাসায় ফেরেন ৭ টার মধ্যেই । আজ ৮টা ৩০ বেজে গেছে । চশমার গ্লাস লাগাতে গিয়েই এই দেরী হয়েছে । অবশ্য তার জন্যে কোনো সমস্যা নেই । বাসার কেউ তার জন্যে কখনো চিন্তা করবেনা । শুধু রেণু তার স্বভাব মতো চেচামেচি করবে ।
মজনু সাহেব ড্রয়িং রুমে ঢুকেই থতমত খেয়ে গেলেন । ড্রয়িং রুমে ৭ ৮ জন অপরিচিত মানুষ বসে আছে । সবাই তার দিকে তাকালো । একটা সুন্দর মতো ছেলে দাড়িয়ে তাকে সালাম দিলো । ছেলেটিকে তার খুব পরিচিত মনে হলো । মজনু সাহেবের মনে হলো তিনি ভুল বাড়ীতে ঢুকে পরেছেন । তিনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
দুঃখিত !! আমি মনে হয় ভুল বাড়ীতে ঢুকে পড়েছি । বলেই তিনি বের হয়ে যেতে উদ্যত হলেন ঠিক তখনই পেছন থেকে কে যেনো তাকে বাবা বলে ডাক দিলো । তিনি ফিরে দেখলেন । এই ছেলেটিকে খুব বেশি চেনা লাগছে ।
বাবা এদিকে শোনো তো জলদি ।
মজনু সাহেব ছেলেটিকে চিনলেন । তার ছেলে রিমন । কিন্তু রিমন এই বাড়িতে কি করছে তিনি ভেবে পেলেননা । রিমন কাছে এসে মজনু সাহেবকে টেনে অন্য ঘরে নিয়ে গেলো ।
রিমন মজনু সাহেবকে আসল ঘটনা বুঝিয়ে বললো । ঘটনার সার সংক্ষেপ হচ্ছে, তিনি অফিসে যাবার পর রিমনের কলেজের বন্ধু তারেক বাসায় এসেছিলো । তারেক আমেরিকায় থাকে এবং ওখানে একটা ইউনিভার্সিটির লেকচারার । তো ওরা গল্প করার সময়ে রিমি নাস্তা নিয়ে ঢোকে । রিমিকে দেখে তারেকের খুব পছন্দ হয়ে যায় । যেহেতু আগামী সপ্তাহেই তারেক আমেরিকা ফিরে যাবে তাই ও যে করেই হোক আজ ই রিমিকে বিয়ে করবে । এবং এবারেই সে রিমিকে নিয়ে আমেরিকা যাবে । তারেক সেই সকাল থেকেই এ বাড়িতে বসে আছে । রেনু খুব আনন্দ সহকারেই মত দিয়েছে আর রিমি প্রথমে কিছুতেই রাজী না হলেও বিকেলের দিকে রাজি হয়েছে যদিও সে এখনও কাদছে । তারেক সন্ধার দিকে তার পক্ষের মুরুব্বিদের ডেকে এনেছে । আজ রাতেই বিয়ে হবে । রিমি চাইলে আজ ওদের সাথে যাবে যদি না চায় তবে একেবারে আমেরিকা যাবার দিন তারেকের সাথে যাবে । মজনু সাহেব তারেককে চেনেন ভালো করেই । রিমনের সাথে অনেকবার এসেছে এ বাড়িতে । তিনিও আর আপত্তি করলেননা ।
রাত ১২ টায় রিমির বিয়ে হয়ে গেলো । রিমি বাড়ীতেই থেকে গেলো । তারেককেও থেকে যেতে বলা হলো । তারেকের বাবা মা কেউই বেচে নেই । সে উঠেছে তার চাচার বাসায় । তাই সে ও আর আপত্তি করলোনা । সেও থেকে গেলো রিমিদের বাসায় ।
মজনু সাহেবের আজ অফিসে মন বসছেনা একেবেরেই । গত রবিবার তার পরিবারে সবাই ছিলো । আজও রবিবার । কিন্তু আজ দুজন মানুষ তার পরিবারে নেই । রিমন ফোনে জানিয়েছে যে সে দার্জিলিং পৌছেছে গতকাল বিকেলে । আর তারেক রিমিকে নিয়ে কাল রাত ২ টা ৩০ এর ফ্লাইটে আমেরিকা রওনা দিয়েছে । যদিও তার পরিবারে তিনি মোটামুটি নিঃস্বঙ্গ মানুষ । তবুও তার কেমন জানি লাগছে । ঠিক এই মুহুর্তেই মজনু সাহেবের কাছে একটা ফোন এলো । তিনি হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে শোনা গেলো,
আপনি কি রিমনের বাবা মজনু সাহেব বলছেন?
জ্বী । আপনি কে বলছেন ?
আমি দার্জিলিং থেকে শফিক বলছি । রিমনের সাথে আমার আগে থেকেই পরিচয় আছে । রিমন আপনার একটা ভিজিটিং কার্ড আমাকে দিয়েছিলো । সেখান থেকেই নাম্বার নিয়ে ফোন করলাম ।
ব্যাপার কি বলুনতো ?
একটা দুঃসংবাদ আছে । রিমনরা আজ সকালে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলো । গাড়িটি খাদে পড়ে যায় । ওদের খোজা সম্ভব নয় । আমাদের মনে হয় ওরা আর কেউ বেচে নেই ।
মজনু সাহেব কি শুনছেন বুঝতে পারছেননা । নিস্তব্ধের মতো টেলিফোন কানে ধরে আছেন । ওপাশ থেকে বলা হচ্ছে,
দেখুন মন শক্ত করুন । হ্যালো হ্যালো ! আপনি কি আমার কথা শুনতে পারছেন ? হ্যালো !!
মজনু সাহেব টেলিফোন রেখে দিয়ে উঠে দাড়ালেন । তিনি গেলেন তার বস আশফাক আহমেদের রুমে ।
স্যার আসবো ?
আরে মজনু সাহেব আসুন আসুন । বসুন ।
মজনু সাহেব বসলেন ।
তারপর ? কি খবর বলুন তো ?
স্যার আজ একটু ছুটি লাগবে ।
কেনো ? গত সপ্তাহেই তো আপনি দুই দিন ছুটি নিয়েছেন ।
স্যার একটু আগে দার্জিলিং থেকে আমাকে ফোন করে জানালো যে আমার ছেলে আর তার বন্ধুরা গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলো । গাড়ি খাদে পরে গেছে । যিনি ফোন করেছিলেন তিনি বললেন ওরা কেউ বেচে নেই । তাই স্যার বাড়ি চলে যেতে ইচ্ছে করছে ।
আশফাক সাহেব কি বলবেন বুঝলেননা । শুধু বললেন,
ঠিক আছে মজনু সাহেব আজ তাহলে আপনি চলে যান । তারপর আপনার যেদিন ইচ্ছে হবে আসবেন । কেমন?
মজনু সাহেব অফিস থেকে বের হয়ে গেলেন । তবে বাড়ি গেলেননা । তিনি পার্কে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকলেন ।
মজনু সাহেব বাড়ি গেলেন রাতে । কাপড় ছেড়ে তিনি গেলেন রিমনের রুমে । রিমনের ঘরটার দিকে তাকালেন । টেবিলের ওপর সাদা মলাটের একটা ডায়েরী রাখা । মজনু সাহেব ডায়েরী নিয়ে পাতা ওল্টালেন । ঠিক মাঝের পাতায় রিমনের হাতের লিখা..
“এই সময়ের কোনো এক মূহুর্তে ঝুম বৃষ্টি নামবে । একেবারে ক্যাটস এন্ড ডগস । যেনো শহরের রাজপথে পানি লেগে যায় । আমি প্রথমে ছাতা মাথায় দাড়িয়ে থাকবো এই উথাল পাথাল বৃষ্টিতে । তারপর এক দমকা হাওয়া আসবে । আমি ছাতা ঐ দমকা হাওয়ায় উরিয়ে দেবো । ততক্ষনে আমার জমে থাকা যত কষ্ট সব বেরিয়ে আসতে চাইবে । আমি তখন চিৎকার করে কাদবো । আমার কান্না ছাপিয়ে একটানা কান্নার সুরে বৃষ্টি পড়ে যাবে । আমার চোখের জল বৃষ্টির জলে মিশে যাবে । একে আর করা যাবেনা । একসময় বৃষ্টি থেমে যাবে । আমার চোখের জল মিশে থাকা পানি বাষ্পায়িত হয়ে মেঘ হবে । সেই মেঘ হতে আবার বৃষ্টি হবে । হয়তো এখানে বা অন্য কোথাও । কিংবা হয়তো বৃষ্টি ঝড়বে আমার মতো কোনো ছায়া মানবীর উপরে । আমি ছায়া মানব । আমার বাবার মতো...”
এটুকু পড়তেই রিফাত এসে দাড়ালো মজনু সাহেবের পাশে । মজনু সাহেব আর থাকতে পারলেননা । হাউমাউ করে কেদে পড়লেন মেয়ের কাছে । রিফাত অবাক হয়ে গেলো । সে শুধু বলতে লাগলো কি হয়েছে বাবা...???
রিমনদের বাড়ী বদলে গেছে অনেক । সাত সকালে এখন আর রহিমার সাথে ঝগড়া করেননা রেনু । সারাদিন চুপচাপ বসে থাকেন ।
রিফাত অনার্সে সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে । ও এখন নিজের ঘর থেকে বের হয়না তেমন একটা । মাঝে মাঝে রিমি ফোন করলে কথা বলে । রিমি প্রায়ই বাড়ি আসতে চায় । কান্নাকাটি করে । আমেরিকা তার ভালোলাগেনা একেবারেই ।
মজনু সাহেব অফিস থেকে ফিরেন রাত করে । ফিরে এসে রোজ ই তিনি বসে থাকেন রিমনের ঘরে । তারপর গভীর রাতে উঠে ঘুমুতে যান । কোনো কোনো দিন গভীর রাত্রে বাড়ীর সবাইকে ডেকে তুলে বলেন রিমন এসেছে । তিনি ছুটে গিয়ে দড়জা খুলে দেন । তিনি এখনও মনে করেন রিমন বেচে আছে । যে কোনো রাত্রে সে ফিরে আসবে । কিন্তু বাস্তবে কি আর কখনও রিমন ফিরে আসে...!
__একজন পরিব্রাজক
ফেসবুক: http://www.facebook.com/ekjon.poribrajok/

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




