ইউক্রেন আজ আক্রান্ত, বিবৃতিতে দাবি রাষ্ট্রদূতের
সম্প্রতি ইউক্রেনের অচলাবস্থার প্রেক্ষিতে কিয়েভের অবস্থান তুলে ধরে একটি বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউক্রেনের অনাবাসী রাষ্ট্রদূত ওলেকসান্দার শেভচেঙ্কো। বিবৃতিতে রুশ আগ্রাসনের সম্মুখে ইউক্রেন আজ আক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছেন রাষ্ট্রদূত শেভচেঙ্কো।
‘বিবৃতির উদ্দেশ্য সম্প্রতি ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ক্রেমলিনের নির্মম হস্তক্ষেপের বিষয়ে রাশিয়ার অভাবনীয় মিথ্যাচার ও প্রচারণার জবাব দেয়া।
তাদের প্রথম মিথ্যা অভিযোগ হলো ইউক্রেনের বর্তমান সরকার অবৈধ। কিন্তু সত্য হলো এই যে, টানা তিন মাসের জনবিক্ষোভ ও শতাধিক মানুষের মৃত্যুর প্রেক্ষিতে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ, বিরোধী নেতারা এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা অচলাবস্থা নিরসণে একটি সমঝোতায় পৌঁছান। সমঝোতা অনুযায়ী ২০০৪ সালের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খর্ব করার কথা ছিলো।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ এই সমঝোতা চুক্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং এতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। অবশেষে জনবিক্ষোভের মুখে ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাংবিধানিকভাবে দেশের দায়িত্ব বর্তায় ইউক্রেনের পার্লামেন্টের ওপর।
ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী যদি প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে অপারগ হন তবে তার দায়িত্ব চালিয়ে যাবে পার্লামেন্টের স্পিকার। পরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৫ মে।
এ পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে প্রধানমন্ত্রী আরসেনি ইয়াতসেনিয়াকের নেতৃত্বে ইউক্রেনে একটি বৈধ সরকার গঠন হয়। এ সরকার পার্লামেন্টে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন পায়।
তাই ইউক্রেনে অভ্যুত্থান হয়েছে এ রকম তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং পার্লামেন্ট এক্ষেত্রে বৈধ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছে।
এছাড়া রাজধানী কিয়েভের প্রতিবাদকারীদের ‘কিয়েভের ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে অভিহিত করে রুশ প্রচারণা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা।
পক্ষান্তরে ইউক্রেনের ক্রিমিয়ায় ক্রেমলিনের পদক্ষেপ অস্ট্রিয়ায় হিটলারের অসৎউস এবং চেকোস্লোভিকিয়ায় আগ্রাসনের সঙ্গেই তুলনীয়। আগ্রাসন চালানোর অজুহাত হিসেবে হিটলার ওই সব স্থানে বসবাস করা জার্মান সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার ধুয়ো তুলেছিলেন।
অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানবাধিকারের বৈশ্বিক ঘোষণার তৃতীয় প্যারায় সুস্পষ্টভাবে উদ্ধৃত আছে। তাছাড়া ইউক্রেনের প্রতিবাদ বিক্ষোভে সমাজের সবস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
একই সঙ্গে কিয়েভের আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ময়দানে ডানপন্থি দলগুলোর তৎপরতা ও সরকারে তাদের প্রভাবের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, শুধুমাত্র ময়দানের সেলফ ডিফেন্স বাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে ডানপন্থি রাজনৈতিক কর্মীরা। আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিলো সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে।
বর্তমান সরকার ইউক্রেনের ডানপন্থি স্ভোবোদা পার্টির মাত্র দুই জন মন্ত্রী রয়েছেন। কিন্তু ২০১২ সালের নির্বাচনেও তারা ১০.৪ শতাংশ আসন লাভ করেন।
তুলনামূলকভাবে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে ২৬.৬ শতাংশ, অস্ট্রিয়ায় ২০.৫ শতাংশ, ফিনল্যান্ডে ১৯.১ শতাংশ এমনকি রাশিয়াতেও ১১.৭ শতাংশ আসন লাভ করে ডানপন্থিরা।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তৃতীয় অপপ্রচার হলো গণভোটের মাধ্যমে ক্রিমিয়া রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
মার্চ মাসের ২৭ তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১শ’ সদস্য রাষ্ট্র ইউক্রেনের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে মত দেয়। পাশাপাশি ক্রিমিয়ার তথাকথিত গণভোটকে প্রত্যাখ্যান করে।
অথচ তথাকথিত এ গণভোটের পর রাশিয়ার সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করা হয় যে, ৮৩ শতাংশ ক্রিমিয়ান নাগরিক গণভোটে অংশ নিয়ে তাদের ৯৭ শতাংশ রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্তির পক্ষে মত দেয়।
পক্ষান্তরে ক্রিমিয়ার আদিবাসী তাতারদের রাজনৈতিক সংগঠন মজলিশ এ নির্বাচন বয়কট করে জানায়, তথাকথিত নির্বাচনে মাত্র ৩৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।এমনকি এসব ভোটারের অর্ধেকই রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
এমনকি রাশিয়ার মানবাধিকার কর্মীদের তরফে ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোতেও ভোটের হার ৩০-৫০ শতাংশ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
সাধারণত আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী কোনো জাতি গণভোট দাবি করতে পারে তখনই যদি তারা ওই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা হন কিংবা তাদের ভুখণ্ড জোরপূর্বক কোনো দেশ দখল করে রাখে।কিন্তু জাতিগত রুশরা ক্রিমিয়ার আদি বাসিন্দা নয়।
ক্রিমিয়ার ১২ শতাংশ বাসিন্দা আদিবাসী তাতার এ গণভোট বয়কট করেছেন। এছাড়া কোনো ধরনের নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের উপস্থিতি ছাড়াই রুশ অস্ত্রের মুখে অনুষ্ঠিত হয় এ নির্বাচন।
এমনকি গণভোটের প্রাক্কালে ক্রিমিয়ায় জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ মিশনকে ক্রিমিয়া ছাড়তে বাধ্য করা হয়। জাতিসংঘের বিশেষ দূত রবার্ট সেরিও তার শান্তিরক্ষী মিশন বন্ধ করে ৫ মার্চ ক্রিমিয়া ত্যাগ করেন।
ইউক্রেনের গণবিক্ষোভ চলাকালে ইউক্রেন কিংবা ক্রিমিয়ার একজন জাতিগত রুশের ওপরও হামলা চালানো হয়নি। পক্ষান্তরে ক্রিমিয়া দখলের পর ইউক্রেনপন্থি রাজনৈতিক কর্মী এবং ক্রিমিয়ার আদিবাসিন্দা তাতারদের ওপর চালানো হয় অসংখ্য হামলা।
এমনকি গণভোটের বিরুদ্ধে নিজের মনোভাব প্রকাশ করায় একজনকে জনসম্মুখে পিটিয়ে হত্যা কর হয়। নিরপেক্ষ গণমাধ্যমকে করা হয় হয়রানি।অনেক ক্ষেত্রে অপহরণ ও মারধরের ঘটনাও ঘটে।
১৭ এপ্রিল রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেও স্বীকার করেন যে ক্রিমিয়ার তথাকথিত রুশপন্থি সেলফ ডিফেন্স ফোর্সকে সহায়তা করেছে রাশিয়ার সামরিক সদস্যরা। যদিও এর আগে তিনি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছিলেন।
ঠিক একই ভাবে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে রাশিয়ার বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা।
এভাবে ইউক্রেন ও ক্রিমিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাশিয়া সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।
ক্রিমিয়ায় হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে রাশিয়া কসোভার উদাহরণ দিলেও রাশিয়া নিজেই কসোভাকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাছাড়া কসোভায় সেখানকার আদি বাসিন্দারা স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছিলো। জবাবে তাদের বিরুদ্ধে জাতিগত দমনাভিযান চালানো হয়।
অথচ ক্রিমিয়ায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সবচেয়ে বড় কথা তথাকথিত ওই গণভোটের পর ক্রিমিয়ার আদিবাসিন্দা মুসলিম সংখ্যালঘু তাতাররা বর্তমানে সেখানে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
১৯৪৪ সালে তাদের ক্রিমিয়া থেকে মধ্য এশিয়ায় নির্বাসনে পাঠায় সাবেক সোভিয়েত শাসক স্টালিন। ইউক্রেনের স্বাধীনতা লাভের পর তাদের ক্রিমিয়ায় ফেরত আসতে উৎসাহ দেয়া হয়। ফলে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ৬৬ হাজার জাতিগত তাতার ক্রিমিয়ায় ফেরত আসেন।
তাদের ৮৫ শতাংশকেই জমি বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া খোলা হয় ১৫টি স্কুল এবং তৈরি হয় ৩২৪টি মসজিদ।
এছাড়া ইউক্রেনের অধীনে ক্রিমিয়ার ১৬ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন তাতার। অথচ জোরপূর্বক ক্রিমিয়া দখলের পর সেখানে এখন তাদের আওয়াজকে দমন করা হচ্ছে।
তাদের রাজনৈতিক সংগঠন তাতার মজলিশের চেয়ারম্যান মোস্তফা জেমিলেভের ওপর ৫ বছরের জন্য ক্রিমিয়ায় প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপ কর হয়েছে।
পাশাপাশি গত ৬ মে মজলিশের সদস্য আব্দুর রহমান এগিজকে রুশপন্থি তথাকথিত সেলফ ডিফেন্স সদস্যরা মারাত্মকভাবে পিটিয়ে আহত করে।
এ পরিস্থিতিতে এটা সুস্পষ্ট যে বর্তমানে ইউক্রেনই আক্রান্ত। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলো ইউক্রেনের অভ্যন্তরে রুশ মদদে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাচ্ছে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সমাধানের যে কোনো আলোচনার প্রতি অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছে তারা।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ইউক্রেন স্বেচ্ছায় তাদের হাতে থাকা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পরমাণু অস্ত্রভান্ডার নষ্ট করে ফেলেছিলো। সে সময় রাশিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তরফে আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো যে কোনো পরিস্থিতিতে তারা ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বজায় রাখবে।
অথচ রাশিয়ার নির্মম আগ্রাসন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির শিথিলতার সুযোগে আজ ইউক্রেন আক্রান্ত।
এ ঘটনা বিশ্বের ছোটো ছোটো দেশগুলোর প্রতি পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর তরফে আশঙ্কার বার্তাই পৌঁছে দেবে।
তবে আমরা আমাদের নৈতিক সমর্থন দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী আমাদের শুভানাধ্যায়ীদের প্রতি ধন্যবাদ জানাই।
ইউক্রেন শান্তি চায়, লড়াই চায় না। তবে এমনকি পরমাণু শক্তিধর প্রতিপক্ষের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে লড়তেও তারা প্রস্তুত।
বিশ্বের শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সকলের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আসুন ঐক্যবদ্ধ হই, অখণ্ড ইউক্রেনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হই।
[আমরা রক্তদিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি্। আমরা সকল স্বৈরাচার, সাম্রাজ্যবাদ আর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে। জাতিগত ভাবে আক্রান্ত ইউক্রেনের বিষয়টি তাই মনে দাগ কেটে গেল। তাই পুরোটা কপি-পেষ্ট হলেও তথ্য এবং সূত্র হিসাবেও রেখে দেওয়া জরুরী মনে হল। ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


