
হকিং তার A Brief History of Time-এ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন The Grand Unified Theory (প্রধান চারটি মৌলিক ফোর্সের ইউনিফাইড কাঠামো) দ্বারা একদিন মানুষকে ব্যাখ্যা করা যাবে ঠিক নিউটনিয়ান বস্তুর গতির মতনই। তবে ব্যাপারটি করতে হয়তো আরো মিলিয়ন মিলিয়ন বছর লেগে যাবে। ষাটের দশকেরপ্রোগ্রাম এলিজা (Eliza) এক্ষেত্রে স্মরণীয়। সাইকোলজিস্ট ড. এলিজা যখন প্রথম বেরিয়েছিল তখন এটি কী-বোর্ড থেকে ইনপুট নিয়ে মানুষের সাথে কথা বলতে পারতো টেক্সট্ আউটপুট দিয়ে।
দু:খের ব্যাপার হল, প্রোগ্রামটি ফান করে ছাড়া হলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মহিলা প্রতিদিন এলিজার সাথে কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন এলিজা রক্তমাংসের মানুষ। তারপর যখন একদিন তিনি জানলেন, এটি জাস্ট একটি প্রোগ্রাম তখন প্রচন্ড ক্রুদ্ধ আর হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। এলিজার জাভা ভার্সন নেটে এইচটিএমএলে এমবেডেড পাওয়া যায়।

সেই ভার্সনটা মডিফাই করে এলিজাকে নিজের মনমত বানাতে গিয়ে প্রথম আমারও মনে হয় আসলে মানুষের মস্তিষ্কের নিউরোসাইকোলজিক্যাল রেন্সপন্সিব সিস্টেমটা আসলে ড. এলিজার মতনই একটি প্রোগ্রাম, তবে অতি-জটিল প্রসেসিং এবং ডেটাবেইজ প্রোগ্রামের সমন্বয় যার পরবর্তী আচরণ একদিন নিউটনিয়ান পদার্থবিজ্ঞানের মতই ব্যাখ্যা করা যাবে (কী ভয়ঙ্কর তাই না!)। কারণ ড. এলিজা ইনপুট টেক্সট্ অ্যানালাইজ করে বেশ কয়েকটি উত্তর থেকে একটি উত্তর বেছে নিত, অথবা তার ডিকশনারীতে রাখা ওয়ার্ড ইংলিশ গ্রামাটিক্যাল সিস্টেম অনুসরণ করে সাজিয়ে সেনটেন্স তৈরি করতো।
রিপিটেশনের উত্তর, বিরক্তির পরিবর্তে অবাক হওয়া, নেগেটিভ ওয়ার্ড ইউজ করলে নানানরকম প্রতিক্রিয়া- ইত্যাদি নানান ফাংশন এলিজার অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রচন্ড জটিল এবং বর্তমানের সাপেক্ষে প্রায়-ব্যাখ্যাতীত একটা পথে মানুষও কি তাই করে না? তবে আমি মনে করি, এলিজার প্রোগ্রামিং কোড যদি একটি সন্তোষজনক লেভেল পর্যন্ত জটিল করা যায় তবে মানুষ ও কম্পিউটারের মাঝে পার্থক্য ঘোচানোর সমস্যাটির সমাধান হবে। এ প্রসঙ্গে টিউরিং টেস্টের কথা বাদ দিলে চলে না।
একজন মানুষকে একটি ঘরে তিনটি কম্পিউটারের সাথে যোগাযোগ করতে দেয়া হবে। এই তিনটি কম্পিউটারের দু'টির সামনে থাকবে দুই জন মানুষ, বাকি যেকোন একটিতে থাকবে এলিজার মতন কোন একটি ইন্টার-অ্যাকটিভ প্রোগ্রাম। মানুষটি তিনটি কম্পিউটারের সাথে লিখে যোগাযোগ করবে। বিভিন্ন টপিকসের উপর কথা বলার পর যদি সে বুঝতে না পারে যে তিনটি কম্পিউটারেরএকটি থেকে তার সাথে যোগাযোগ করেছিল জাস্ট একটি প্রোগ্রাম তাহলে ধরে নিতে হবে কম্পিউটার আর মানবমস্তিষ্কের পার্থক্য ঘুচে গেছে। অবশ্য এখানে মানুষটির বুদ্ধিমত্তার উপরও পরীক্ষাটির সাফল্য নির্ভর করার ব্যাপার আছে। তবে আজ পর্যন্ত কোন প্রোগ্রামই এ পরীক্ষায় উৎরাতে পারেনি।

সাইন্স ফিকশনগুলো মানুষের আবেগ-অনুভব, মানুষ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পার্থক্য নিয়ে বেশ আলোচনা করেছে। জাফর ইকবালের অধিকাংশ বইতেই এ মানবিক অনুভবের মধ্যকার সংকট তুলে ধরা হয়। প্রকৃতিবিজ্ঞানীর চোখে সংকটটা অনেকটা এরকম-- ব্যক্তি-আমিটার দু:খ-কষ্ট, অনুভব- সবইতো মস্তিষ্কের রাসায়নিক কৌশলমাত্র! তাই নয় কি? শিশু যখন পৃথিবীতে আসে তখন তার মস্তিষ্ক অগঠিত বিধায় বেশি অনুভবের সাথে সে পরিচিত ছিল না। কান্নাই ছিল তার একমাত্র সম্বল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নানান ধরনের অনুভূতির সাথে তাকে পরিচিত করালোটা কে? অনুকরণ বা সামাজীকিকরণ প্রক্রিয়া।
স্পিলবার্গ এআই (AI) ছবিটিতে দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন এই ব্যাপারটি। তার ছবিটি দেখলে যে কেউই স্বীকার করতে বাধ্য হবে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাথে মানুষের পার্থক্য জৈবিক দিক দিয়েই। ম্যাট্রিক্সেও এই ব্যাপারগুলো দুর্দান্তভাবে তুলে আনা হয়েছে। ভাববাদীদের সাথে তর্ক বাদ দিলে সবই আসলে জৈবিক অথবা বৈদ্যুতিক ইমপালস।
খৃষ্টধর্মকে শক্তি ভিতের উপর দাঁড় করানোর জন্য বিশপ বার্কলে যে থিওরি নিয়ে আসেন তার সাথে ম্যাট্রিক্সের প্রচুর সাযুজ্য আছে। ভাবুনতো- আমি তাই, যা আমার মস্তিষ্কে আছে। সুতরাং, একজন ফুটবলারের দক্ষতা আসলে পাঁয়ে নয়- মস্তিষ্কে। একই কারণে যাকে আমি ভালোবাসি তার প্রতি আমি অনুভূতিশুন্য হয়ে পড়বো যখন রোড-অ্যাক্সিডেন্টে আমার সমস্ত স্মৃতিশক্তি আমি হারিয়ে ফেলবো যদিও সস্তা বাংলা চলচ্চিত্র বাদে বাস্তবে এটা খুবই কম ঘটে। কিন্তু তারপরও আমরা ভাবতে বাধ্য হই যে,স্মৃতিশক্তি হারানো মানেটা কি? তারমানে স্মৃতিগুলোই কি আমি? স্মৃতি যখন নেই তখন "আমি"-টা কোথায়? কোথাও নেই! শিক্ষক আসার আগে ব্ল্যাকবোর্ড যেরকম শুন্য থাকে, সেই শুন্য ব্ল্যাঙ্ক মস্তিষ্ক সদ্যজাত শিশুর; সময়, পরিবেশ, মানুষ, অভিজ্ঞতার আঁচড় পড়তে পড়তে সে হয়ে উঠে সামাজিক জীব।
আমার সমস্ত "স্মৃতি" নিয়েই "আমি" গঠিত, যা আমি অর্জন করে এসেছি কিংবা সঞ্চয় করেছি চারিপাশে থেকে জন্মলগ্ন থেকে। এই স্মৃতিগুলোর স্থানে যদি অন্য স্মৃতি রিপ্লেস করা যায় তবে "আমি"-টাও কি পরিবর্তন হবে না? মানতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য।
সমস্যা হল, হকিংরা সমস্যায় পড়েছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা তত্ত্বে এসে। ক্ষুদ্র স্তরে বস্তুর আচরণ অবশ্যই ম্যাক্রোওয়ার্ল্ডের মতন অতি-সরল নয়। ফলে আসে সম্ভাব্যতার সূত্র, যে সম্ভাব্যতার কারণে একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জের মধ্যে বস্তুর পরবর্তী অবস্থান ভ্যারি করে, তাকে কোন একটি ফিক্সড্ স্থানে পাবার নিশ্চয়তা সম্পূর্ণ নাকচ হয়ে যায়। তাহলে আমরাইবা কিভাবে মানবমস্তিষ্কের নিউরন ও সাইন্যাপসের গভীরে গিয়ে লক্ষ্য-কোটি-বিলিয়ন কণিকাগুলোর নেক্সট আচরণ ব্যাখ্যা করবো? এ ব্যাপারটি হকিংকে বেশ ভাবিয়েছে, মৃত্যুর আগে এর কোন সমাধান দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

তবে মানুষ আশাবাদী হতে পারে এই অর্থে যে সভ্যতার ইতিহাসের গ্রাফ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মানুষ ব্যাখ্যাযোগ্য হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। আমার নীতি-নৈতিকতা, অন্যের জন্য সহানুভূতি- এসবই কি কিছু অতি-জটিল সমীকরণ দ্বারা ব্যাখ্যাযোগ্য যা একসময় আমিই বুঝে যাবো? হকিং নিজেও বিভ্রান্তিতে পড়ে যান : বিভ্রান্তিটা হল এই যে, দা গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিওরি বলে যে, "আপনি আপ্নার নিজের দিকেই তাকাবেন!" মানুষকে যতই না রহস্যময় ভাবুন সময়ই যতই পেরোচ্ছে ততই কি আপনি বড় হওয়ার সাথে সাথে উপলব্ধি জ্ঞানের বিস্তৃতির সাথে অনুভব করেন না যে, প্রতিটি মানুষই আসলে ব্যাখ্যাযোগ্য সরল প্রাণীমাত্র? এ হল পাশ্চাত্য জ্ঞানের অনুভব-উপলব্ধি।

আবার মানবিক মানুষের জায়গায় পাশ্চাত্যের এই নৈর্ব্যক্তিক যৌক্তিক যান্ত্রিক মানুষকে স্থান দিতেও কেন যেন বাঁধে "মানুষ" হিসেবে তাই না? পাশ্চাত্যের প্রাচ্যের মতন হৃদয়বৃত্তি নাই,তারা মানুষকে লজিক ও বুদ্ধিবৃত্তির সর্বোচ্চ রূপ ভাবতে ভাবতে মানবিক মানুষকে হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণেই ইয়স্তেন গার্ডারের ভাষায় সোফির জগতে মানুষ শেষপর্যন্ত হয়ে উঠে নক্ষত্রচূর্ণ। কার্ল সাগানরা নক্ষত্রচূর্ণের বেশি কোন তাৎপর্যই মানুষকে দিতে রাজি নয়। পশ্চিমা বৌদ্ধিক জগতে এই একই সমস্যা যার পুরো বিপরীতে দাঁড়িয়ে লালন ঘোষণা করেন, মানুষ অপার সম্ভাবনাসময়...
"অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই,
বুঝি মানুষের উত্তর কিছুই নাই!"
কিন্তু প্রাচ্যের সমস্যা হল- ধর্মতত্ত্ব, কুসংস্কার আর নানান অপবিশ্বাস একে আষ্ঠেপৃষ্ঠে মুড়েরেখেছে। কিন্তু তারপরও আশাবাদী হওয়া যায় কারণে প্রাচ্যের সম্ভাবনা এখনও রয়ে গিয়েছে। তার সামনে এখনও সুযোগ আছে নিজস্ব ধর্মতত্ত্বের উন্নতি করেপরবর্তী দর্শন বা তত্ত্ব হাজির করার যেহেতু তার মানবিক মন এখনও বেঁচে আছে। ফলে মানুষকে একটি অতি উন্নত সুপার-কম্পিউটারের মতন ব্যাখ্যা করা যাবে কি যাবে না- এ নির্ভর করছে মানুষের মন আর হৃদয়-বৃত্তিকে প্রাচ্য কোন মডিফাইড রূপে ভবিষ্যতে সম্ভাবনাময় করে তুলবে তার উপর।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



